একই পরিবারের একদল বেদে সম্প্রদায় অস্থায়ীভাবে ঝুপড়ি দিয়ে বাসা বেঁধেছে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার উজিরপুর নামক গ্রামের মূল রাস্তার পাশে। অস্থায়ীভাবে ঝুপড়ি ঘরে ঘুপটি মেরে বাসা বাঁধলেও আগের মতো রাতের বেলায় কুপি বাতি বা হ্যারিকেল জ্বলে না তাদের ঝুপড়িতে। ওদের জীবনে অন্য কোন আধুনিকতার ছোঁয়া না লাগলেও রাতের আঁধার দূর করতে ঝুপড়ি ঘরে শোভা পাচ্ছে আধুনিকতার সোলার বাতি।
এই বেদে পল্লীর ঝিনেদহ জেলাার কালিগজ্ঞ থানার কাশিপুর গ্রামের আশি বছরের বয়স্ক সর্দ্দার আমিরে হোসেন বলেন, অস্থায়ীভাবে ঝুপড়ি ঘরের পল্লীতে বর্তমানে যুগের আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। তাদের বহরে যোগ হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির তৈরি সোলার প্যানেলের বাতি। বিষয়টি নিয়ে সবার মাঝে কৌতুহলের শেষ নেই। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া বদলে দিয়েছে তাদের জীবনমান। স্মার্টফোনের ব্যবহার, ব্যাটারি দিয়ে খুপড়ি ঘরে সাউন্ড বক্স চালানো, আর সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার আলোকিত করছে তাদের অবহেলিত জীবনকে। অথচ একসময়ে চেরাগের (কুপির), হারিকেনের আলো ছিল মোদের একমাত্র ভরসা। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ১০টি ঝুপড়ির ঘরের ৪০ জন নারী-পুরুষ ও শিশুদের নিয়ে এই অস্থায়ী বেদে সদস্য বসবাস। আগের জীবনের চেয়ে বর্তমানে তাদের ভিতরে এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। দেশের বেদেরা মোট নয়টি শাখায় বিভক্ত। এগুলো হলো লাউয়ো বা বাবাজিয়া, চাপাইল্যা, বাজিকর, বেজ বা মিচ্ছিগিরি, গাইন, বান্দাইরা, মাল এবং সাপুড়িয়া। এরা সকলেই জমিতে পরিশ্রম করাকে অমর্যাদার কাজ বলে মনে করেন। এদের পেশা হলো চিকিৎসা ব্যবসা ও ওষুধ বিক্রি। হাটবাজারে সাপের খেলা দেখিয়ে ও নানা রকমের বুনো লতাপাতা আর শেকড় বাকড় এরা ভেষজ হিসেবে ব্যবহার করি।
এ পল্লীর বধূ শেফালি, রুনা, রেবেকা বলেন, মোর ঝবন সংগ্রামের জন্য গরোজ সকালে বের হয় রুটি রুজির জন্য। গ্রামের পথে প্রান্তে ডাক-হাঁক দিয়ে শিংগা লাগায়, নানা গাছ গাছালি দিয়ে নানা রোগের তাবিজ বানিয়ে বিক্রি করি। সারাদিন পায়ে হেঁটে যা আয় হয় তা দিয়ে চাল ডাল কিনেঝুপড়িতে ফিরি। প্রতিদিন এই ভাবে চলতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সৌর বিদ্যুৎতের সোলারটা বের হওয়ার পর আমরা অনেক কষ্ট করে কিনার পর আমরা সৌর বিদ্যুৎতের সোলার দিয়ে আমরা লাইট, ফ্যান, মোবাইল র্চাজসহ অনেক কাজেই ব্যবহার করতে পারছি। সোলার আসাতে আমাদের বেদে পল্লী জন্য অনেক উপকার হয়েছে। আগে অনেক কষ্টে চলছি কোন জায়গায় তেল পাওয়া গেছে, কোন জায়গায় তেল পাওয়া যায়নি। অনেক সময় আমরা হারিকেনের বাতি জ্বালিয়ে, কুপির বাতি জ্বালিয়ে চলছি। এখন সোলার বিদ্যুৎ আসার পর অনেক শান্তিতে আছি। এখন আগের চেয়ে গ্রামগঞ্জের মানুষ অনেক সচেতন যার কারণে বেদে পল্লীতে আগের মতো চিকিৎসা ব্যবসা ও ওষুধ বিক্রি করে বেশি আয় করা যায় না। গত দুই দশক আগেও আমাদের বেদেদের যে অবস্থা ছিল, আজ তা নেই। আধুনিকতার ছোঁয়া তাদের সমস্ত জীবন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে। গাছ-গাছালির তাবিজ বিক্রি করে দুই-তিনশ টাকা আয় হলেও বর্তমানে বাজারে সব জিনিসের যে, দাম চাল-ডাল কিনে ডাল-ভাত খেতেই শেষ হয়ে যায়, তাহলে দেশ ছেড়ে ভিনদেশে এসে আয় করমো কী আর খামু কী বলেন। এখন মেরা যাযাবর বৃত্তি পরিহার করে স্থায়ী বসতির চিন্তা শুরু করছি।
দামুড়হুদা সাহিত্য পরিষদের সভাপতি ইসমাইল হোসেন বলেন, তবে কিছুটা হলেও আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া এখন বদলে দিয়েছে বেদে পল্লীর জীবন। বেদে সম্প্রদায় নিয়ে রয়েছে নানা রহস্যময় কথা। এদের ইতিহাস খুঁজলে তেমন কোনো লিখিত দলিল পাওয়া যায় না। রহস্যময় তাদের এই জীবনধারা। যুগ যুগ ধরে বংশ-পরম্পরায় ঘিরে সাহিত্যিকরা তাদের সাহিত্যের বিকাশ ঘটিয়েছে, যা আমাদের বাঙালি লোকসাহিত্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মূলত এরা যাযাবর জাতি কিন্তু আশ্চর্য এক সত্য হলো এরা তাদের জীবনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তেমন কিছু ধারণা দিতে পারেনি। যুগ যুগ ধরে বংশপরস্পরায় দাদা-পরদাদা থেকে যা শোনে তা-ই তার বলেতে পারে। সময়ের প্রভাবে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগলেও বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় গোষ্ঠীভুক্ত হয়ে বাস করে এরা। বেদে নারীরা সমাজ মাতৃতান্ত্রিক বেদে নারীরা যথেষ্ট স্বাধীনতা ভোগ করে থাকে উপার্জন বিয়ে ও সন্তান প্রতিপালনে তারাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। বেদে পুরুষরা অলস হয়। কায়িক পরিশ্রমকে তার ঘৃণা করে। ফলে সংসারের ব্যয় নির্বাহরে জন্য বেদে মেয়েদেররই বের হতে হয়। তারা জীবনকে এক ঘরে রাখতে চায় না, প্রকৃতির ভালোবাসাকে স্বীকার করে। প্রকৃতির মাঝেই এরা জীবনের সন্ধান খোঁজে। বেদেদের এই সন্ধানই আমাদের লোকসাহিত্যেও অন্যতম উপজীবী অংশ বেদে সম্প্রদায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ও সমস্যা সংকুল হলো বেদে সম্প্রদায়ের জীবন। এরা মূলত আমাদের দেশে বাদিয়া বা বাইদ্যা নামে পরিচিত। ওরা একটি ভ্রাম্যমাণ জনগোষ্ঠী।
বেদে সম্প্রদায়ের দাবি তারা দেশের অন্যতম সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠী । সময়ের আবর্তের্ বেদে সমাজের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্দিন। তাদের নেই কোন শিক্ষা, নেই কোন কাজের বিশেষ যোগ্যতা। সমাজে শ্রেণি বিভাজন না থাকলেও বেদেদের দেখা হয় কিছুটা আলাদা চোখে। আর তাই সমাজের মূলস্রোতে মেশাটাও খুব একটা সহজ নয় তাদের জন্য। বেদেরা হারিয়ে গেলে বাংলাদেশের পুরাতন ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির একটি অংশ হারিয়ে যাবে। তারা যাযাবর একটি উপজাতি হলেও কোনভাবেই মূল বাঙালি সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাই যে কোন মূল্যে তাদেরকে নাগরিক সুযোগ সুবিধা দিতে সবাই কে এগিয়ে আসা উচিত।
সারাদেশ: কুষ্টিয়ায় সব ধরনের সবজির দাম কমেছে