খুলনায় তারেক রহমান
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘দেশের নারী সমাজকে যারা অসম্মান করে এবং কুরুচিপূর্ণ ভাষায় গালি দেয়, তারা আর যাই হোক- দেশদরদী বা জনদরদী হতে পারে না’। তিনি বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে মা-বোনদের ঘরের মধ্যে বন্দি করতে চায়। তাদের কর্মসংস্থান নিয়ে কলঙ্কজনক মন্তব্য করে। যারা নিজেদের দলের নারী কর্মীদেরই সম্মান দিতে পারে না, তাদের কাছে দেশের মানুষ নিরাপদ নয়।’
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) খুলনার খালিশপুরে প্রভাতি স্কুল মাঠে আয়োজিত বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিএনপি চেয়ারম্যান মঞ্চে উঠলে নেতা-কর্মী-সমর্থকরা করতালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানায়। তারেক রহমান হাত নেড়ে সমর্থকদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। বিএনপি প্রধান খুলনায় সবশেষ ২০০৫ সালের ২৩ মার্চ ইউনিয়ন প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন।
সাম্প্রতিক এক রাজনৈতিক নেতার মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, একজন নেতা পরিষ্কারভাবে বলেছেন তারা নারীর নেতৃত্বে বিশ্বাস করেন না। কর্মজীবী মা-বোনদের নিয়ে তিনি যে শব্দ ব্যবহার করেছেন, তা এই সমাজের জন্য কলঙ্কস্বরূপ। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প থেকে শুরু করে প্রতিটি পরিবারে নারীরা আজ আয়ের হাল ধরেছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। অথচ একটি দল তাদের অপমান করছে।
বিএনপি চেয়ারম্যান সেই দলের দিকে ইঙ্গিত করে আরও বলেন, ‘তারা বলে ইসলাম কায়েম করবে, অথচ আমাদের নবী (সা.)-এর স্ত্রী বিবি খাদিজা (রা.) নিজেও একজন ব্যবসায়ী ও কর্মমুখী নারী ছিলেন। এই দলটির পূর্বসূরিরা ১৯৭১ সালেও মা-বোনদের অসম্মানিত করেছিল। এদের কাছে দেশের মানুষ বা নারী সমাজ কখনোই নিরাপদ হতে পারে না।’
প্রতিপক্ষ দলের নেতার বিতর্কিত মন্তব্যের পর আইডি হ্যাক হওয়ার অজুহাতকে মিথ্যাচার হিসেবে দাবি করে তারেক রহমান বলেন, ‘তীব্র সমালোচনার মুখে তারা এখন বলছে আইডি হ্যাক হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এটি অসম্ভব। একটি রাজনৈতিক দলের সিনিয়র নেতা নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে এভাবে মিথ্যা বলছেন। যারা অবলীলায় মিথ্যা বলে, তারা কখনোই দেশের মঙ্গল করতে পারে না। তারা শুধু নিজেদের স্বার্থ বোঝে এবং ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে।’
নারী সমাজকে স্বাবলম্বী করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রতিটি গৃহিণী ও মায়ের কাছে আমরা ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পৌঁছে দেব। এর মাধ্যমে নারীরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন, কাউকে তাদের মুখাপেক্ষী হতে হবে না।
বিএনপির শীর্ষ নেতা বলেন, ‘খালেদা জিয়ার সরকার নারী শিক্ষাকে অবৈতনিক করেছিলেন যাতে এই বিশাল জনশক্তি আলোকিত হতে পারে। আমরা সেই ধারা বজায় রেখে দেশকে পুনর্গঠন করতে চাই।’
বিগত ১৬ বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘বিগত পনেরো-ষোলো বছর বাংলাদেশের মানুষ ভোটের অধিকার পায়নি। মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারেনি। কেউ কথা বলতে চাইলে তাকে রাতের আঁধারে গুম বা খুন করা হয়েছে। বহু নেতাকর্মী গায়েবি মামলার শিকার হয়েছেন। অবশেষে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে দল-মত নির্বিশেষে মানুষ রাজপথে নেমে স্বৈরাচারকে বিদায় করেছে।’
খুলনাকে মৃত শিল্প নগরী হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দেন, ‘বিএনপি সরকার গঠন করলে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে শিল্প নগরীকে পুনরায় জীবিত করা হবে। এখানে তরুণদের জন্য আইটি পার্ক ও নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। ’এছাড়া খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার কৃষক ভাইদের জন্য ‘কৃষি কার্ড’ প্রবর্তনের ঘোষণাও দেন তিনি। বক্তব্যের শেষে তিনি উপস্থিত জনতাকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘যারা আপনাদের অপমান করে, তাদের জবাব দেওয়ার সময় এসেছে। ১২ তারিখ ব্যালটের মাধ্যমে আপনারা আপনাদের অধিকার ফিরে পাবেন ইনশাআল্লাহ।’
বক্তব্যের মাঝেই তিনি খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের ধানের শীষের ১৪টি আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন। সকাল থেকে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে খালিশপুরের প্রভাতি স্কুল মাঠে নেতাকর্মীরা সমবেত হতে থাকেন। নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন প্রার্থীর প্ল্যাকার্ড ও ধানের শীষ হাতে নিয়ে স্লোগান দেন, ‘ভোট দিব কিসে, ধানের শীষে’। তাদের সঙ্গে রয়েছে বাদ্যযন্ত্রের দল।
কোরআন ও গীতাপাঠের মধ্য দিয়ে বেলা ১১টায় সমাবেশের কার্যক্রম শুরু হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনা। খুলনার জনসভা শেষে দুপুর ১টায় খুলনা থেকে হেলিকপ্টারে যশোরের উদ্দেশে রওনা হন তারেক রহমান। দুপুর পৌনে ২টায় নতুন উপশহরে বিরামপুর আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে নির্বাচনি জনসভায় তার যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। সেখানকার জনসভা শেষে বিএনপি নেতা হেলিকপ্টার যোগে ঢাকায় ফিরবেন।