জামালপুরের মাদারগঞ্জে অসংখ্য জলাভূমি এখন ফসলি জমিতে পরিণত হয়েছে। অনেক জলাভূমি ভরাট হয়ে গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি অবকাঠামো। এই সব জলাভূমি না থাকায় পরিবেশে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ, জলজ উদ্ভিদ, পাখিসহ নানা প্রাণী ও দেশীয় মৎস্যসম্পদ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই মাদারগঞ্জে ফুসফুস বলা হতো খরকা বিলকে। সেই বিলও ধ্বংস হয়েছে।
খরকা বিল : মাদারগঞ্জের পরিচতি ছিল ঐতিহ্যবাহী খরকাবিলে জন্য। এ বিলের সুন্দরর্য নষ্ট করেছে কচুরিপানা। হারিয়ে গেছে বিলে জীববৈচিত্র্য। কাকের চোখের মতো স্বচ্ছ জলরাশি ছিল, নজর করলে পানির নিচে সব জলজ উদ্ভিদ দেখা যেত। বিলে পানা জন্মে না, এটাই স্বাভাবিক। এই বিলটিও এর ব্যতিক্রম ছিলো না। কিন্তু কচুরিপানার কারনে খরকা বিলটি চেনায় দায় হয়ে পড়েছে।
এই বিলের ইতিহাস সু প্রাচীন। সেই যমুনা নদী আবিস্কিত হওয়ার সময় এই বিলটিও সৃষ্টি হয়েছে বলে ইতিহাস পাওয়া যায়। মি. রেলেন ছিলেন ইংরেজ জরিপকারী। তিনি বাংলা মুলুকে নদীর প্রথম মানচিত্র তৈরি করেন ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে। তাতে যমুনা নদীর কোনো অস্থিত্ব ছিল না। ওই মানচিত্রে ব্রহ্মপুত্র ও দাকোপা নদী নামের দুটি নদীর চিহ্ন দেখা য়্যায়। কিন্তু তার পর ১৭৮২ থেকে ১৭৮৭ সালের মধ্যে সংঘটিত ভূমিকম্প ও ভয়াবহ বন্যার ফলে ব্রহ্মপুত্রের তৎকালীন গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে বর্তমান কালের যমুনা নদীর সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে আরও একটি ইতিহাস পাওয়া যায় তা হলো, ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে উদ্ভূত যমুনা নদী একটি নৎধরফবফ ৎরাবৎ. এর অর্থ হলো, যমুনা একটি নদী নয় বরং একগুচ্ছ নদীর সমাহার (ঝুহপযৎড়হরুধঃরড়হ). ১৭৮৭ সালের আগে, যমুনার বুকে কোনো নদী ছিল না। জোনাই খাল নামে একটি ছোট্ট ¯্রােতধারা ছিল। খালটিকেই কোনো কোনো এলাকায় যমুনা বলে ডাকা হত বলে কতিপয় ঐতিহাসিকের দাবি। ১৭৬২ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে ব্রহ্মপুত্র নদের মূল¯্রােত পরিবর্তিত হয়ে এই খালটির ভেতর দিয়ে প্রবেশ করে। নাম হয় যমুনা। ১৭৮৭ সালে আরেকটি বড় বন্যায় তিস্তা নদীর একটি বড় ¯্রােত যমুনায় যোগ দেয়। ফলে, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, জোনাই খাল সবগুলোর ¯্রােত মিলে সুবিশাল নদী হিসেবে যমুনার আবির্ভাব ঘটে।
তবে এই নদীর সঙ্গে লোকজন পরিচিত হয় এই অঞ্চলের সংঘঠিত ফকির সন্নাসী বিদ্রোহের কারনে। কারন এই বিদ্রোহের সূত্রপাত ঘটে ১৭৬০ থেকে ১৮শ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত। এই সময়ের মাঝামাঝি সময় যমুনার চরাঞ্চলে সন্নাসীরা ঘাঁটি গড়ে তুলেন। তারা এই দুর্গম চরে বসে বসে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করতেন। এখানে ফকির সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক নেতা শাহ্ মাদার এর আগমন ঘটে। তার নাম অনুসারে মাদারগঞ্জের নামকরণ করা হয়। আরেকটা ঐতিহাসিক প্রমাণ মিলেছে এই বিলের পাশে গড়ে উঠা মৎস্যজীবীদের বসবাস। এই পাড়ায় বর্মণ, কৈবর্ত, দাস, হালদারা বাস করত। এই পাড়ার বাসিন্দা শিক্ষক চিন্তেশ্বর বর্মণের সঙ্গে বেশ কয়েক বছর আগে (তিনি প্রয়াত হওয়ার আগে) কথা হয়। তিনি জানিয়েছিলেন, মাদারগঞ্জে তারাই আদি বাসিন্দা। তার পূর্বপুরুষ নৌকা করে যমুনা নদীতে মাছ শিকার করতে এসে এই বিলের সন্ধ্যান পায়। প্রচুর মাছে ভরপুর ও অনেক উর্বর জমি পেয়ে তারা এখানে বসবাস করা শুরু করে। তিনি এই ঘটনাগুলো শুনেছিলেন তার পিতামোহ রজনী কান্ত হালদারের কাছে। তিনি জানিয়েছিলেন খরকা বিল ও যমুনা নদী প্রায় সমসময়িক সময়ের। খরকা বিলের নামটি মৎস্যজীবী দের দেয়া। মাছ ধরার এক প্রকার জালের নাম থেকে খরকা নামকরন করা হয়। এই হলো বিলের ইতিহাস। এত সুন্দর বিলের কারনে ১৯০৬ সালে মাদারগঞ্জ থানাভবন, প্রশাসনিক কার্য্যালয় গড়ে উঠে বিলের পাশে।
এই বিলের পরিধি ছিলো বিশাল। সুখগরী গ্রাম থেকে জোনাইল বাজারের পুর্ব পর্যন্ত। দক্ষীনে তারতাপাড়া। এতো বিশাল এলাকা বুকে গভীর জলরাশি নিয়ে ছিল। নানান মাছে ভরপুর ছিলো। চিতল, কালবাউশ, চাপিলা, চিংড়ি ছিলো প্রসিদ্ধ। গাবেরগ্রাম হাটখোলায় ঠাকুরবাড়ি বিশাল বটগাছে বিছিয়ে দেয়া শিকড়ে ছলছল করে স্বচ্ছ জলরাশির মৃদু শব্দ এখনও অনেকের কানে বাজে। ঘাটে বাঁধা ‘গয়না’ নৌকার (যাত্রীবাহী ছইওয়ালা বিশেষ ধরনের নৌকা) সারিএই দৃশ্য কি ভুলা যায়। এই বিলে মাছের সঙ্গে জলজ উদ্ভিদ খাওয়ার জন্য শীতকালে হাজার হাজার পরীযায়ী পাখি আসতো। পাখিদের কোলাহলে বিলটি মুখরিত ছিলো। এই মুগ্ধ হওয়া বিলটির মৃত্যু ঘটলো ১৯৮৮ সালে ভয়াবহ বন্যায়। ও ১৯৯০ সালে নদীভাঙনে যমুনার সঙ্গে বিলটির সংযোগ হলে বিলের গভীরতা কমে যায়। বিল ভরে যায় পলিমাটি তে। স্বচ্ছ জলের রং পরিবর্তন হয়। মাছের প্রজনন বন্ধ হয়ে যায়। দেশী মাছ বিলুপ্ত হয়। বিলের অস্তিত্ব হারিয়ে যায়। কচুরিপানায় ভরে যায় বিলটি। শেষ হয় বুক ভরে শ্বাস নেয়ার খরকা বিলের বিশুদ্ধ বাতাস।
চতলা বিল : জলজ উদ্ভিদ ও দেশীয় মাছ জলজপ্রাণীর এক অভয়াশ্রম ছিল চতলা বিল। এই বিলটি চতল নদীর নাম থেকে নামকরণ হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানন। আবার ইতিহাস খুঁজে জানা যায়, আসামের বরাক উপত্যকা কাছাড় জেলায় চাতলা বিল অবস্থিত চাতলা হাওরের চারিদিকে চা-বাগান মধ্যে তল অর্থ্যাৎ চা-তল, সেই চা-তল থেকেই সম্ভবত চাতলা নামকরণ হয়েছে। এই বিলের নাম নামকরণ থেকেই মাদারগঞ্জের চতলা বিলের নাম হয়েছে। এই জলাভূমিটি ছিল অতিথি পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। শীত মৌসুমে হাজার হাজার অতিথি পাখির বসবাস ছিল। নানা বর্ণের ও নানা জাতের অতিথি পাখি এখানে খাবার খেতো। এই এলাকার সৌখিন পাখি শিকারী ও পাখি বিশেষজ্ঞ প্রয়াত গোলাম সরোয়ার তালুকাদার আমাকে জানিয়েছিলেন, চতলা বিলে যে সমস্ত অতিথি পাখি আগমন করতো দেশের অন্য জলাভূমিতে তা আসতো করতো না। এই বিলের পরিবেশ ও জলজ উদ্ভিদগুলো পাখিদের পছন্দের ছিলো। তা ছাড়া এককালে বিলে পরিবেশের বন্ধু প্রচুর হিজল গাছ ছিল। নানা প্রাচীন গাছপালা অতিথি পাখিদের নিরাপত্তা দিতো। তাই সাইবেরীয় অঞ্চলসহ শীত প্রধান দেশ থেকে এই বিলে চোখা, রাজহাস, বালিহাস, লেঞ্জা, শামুখখোর, খয়রা, প্যালিক্যান জাতীয় অতিথি পাখির অভয়ারণ্য ছিল। গুনারীতলা ও জোড়খালী ইউনিয়ের বিশাল জায়গা নিয়ে এই বিল ছিলো। ১৯৮৮ সালে সর্বগ্রাসী যমুনা নদীর ভয়াবহ করাল ভাঙনে এই বিলের পাশে বিশাল জনবসতিপূর্ণ গ্রামগুলো ভেঙ্গে যায়।
ফলে নদীরপলি এসে বিলটিকে ভরাট করে দেয়। পাশাপাশী জমিতে ইরিবোরো চাষ শুরু হলে জমির মালিকরা নির্বিচারে জলাভূমি ভরাট করার প্রতিযোগীতায় নেমে পড়েন। ফলে বিলটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। এখন একটুও চিহ্ন নেই। বিলের বুকে ইটভাটা, ঘরবাড়ি গড়ে উঠায় মনেই হয় না এখানে একদা বিল ছিল।
এই চতলা বিলের আয়তন এতোটাই বৃহৎ ছিল বর্ষার রাতে জেলেরা নৌকার পথ হারয়ে ফেলত। শীত-গ্রীষ্মে লোকজন এই পথে গেলে দিক ভূলে যেত। এই পথভোলাকে এই অঞ্চলের লোকজন ‘কানাভোলা’ বলে আখ্যায়িত করত। এই বিলে শুস্ক মৌসুমে জলজ উদ্ভিদগুলো পচে গিয়ে এক প্রকার মিথেন গ্যাসে পরিনিত হয়ে বাতাসের সংস্পর্শে জ্বলে উঠতো। এই এলাকার লোকজন এটাকে আঞ্চলিক ভাষায় ‘ভূতের আগুন’ বলে চিনত। অনেকে রাত বিরাত এই পথে চলাচল করতো না। সুনীলের সেই তিন প্রহরের বিলের সমতুল্য এই বিশাল বিলটি এখন ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে।
চিড়াভিজা বিল : কথায় চিড়া না ভিজলেও এই বিলের স্বচ্ছ জলে চিড়া ভিজিয়ে অনায়াসে খাওয়া যেতো। এই থেকেই চিড়াভিজা বিলের নাম করণ। গুনারীতলা ও পৌর এলাকার কিছু অংশ নিয়ে কয়েকশ একরের এই চিড়াভিজা বিল গড়ে উঠেছিল। মূলত খরকাবিলের পূর্বের অংশই চিড়াভিজা বিল নামে পরিচিত। প্রায় কয়েকশ একর এলাকাজুড়ে এই বিলের অবস্থান। বিলে জলজ উদ্ভিদ, দেশীয় মাছ, নানান প্রাণবৈচিত্র্য ভরা এই বিল। এককালে দেশীয় মাছের অভয়াশ্রম ছিলো। বিলের
জায়গা অনেকাংশ দখল হয়ে গেছে। যমুনার ভাঙনে পলি পড়ে বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় বিলের অস্তিত্ব হারিয়ে গেছে।
বাঘাডোবা বিল : এই জলাশয়ে এককালে বাঘ ডুবছিল কি না তার ইতিহাস নেই। তবে জলাজঙ্গলে বেত গাছে ঘেরা এই জলাশয়ে নামলে গা ছম ছম করতো। কখন জঙ্গল থেকে বাঘ বের হয়। এরকম ঘটনা থেকেই এই জলাশয়ের নামকরণ হয়েছে বাঘাডোবা। পৌর এলাকার চর চাঁদপুরে এই জলাশয়ের অবস্থান ছিলো। সেটা এখন বিলুপ্ত। বিলের বুকে ধানের ক্ষেত। ঘরবাড়িতে ভরে গেছে। বর্ষায় কিছুটা পানি দেখা গেলেও শুস্ক মৌসুমে শুকিয়ে কাঠ। বিলে এককালে দেশীয় মাছ জলজ উদ্ভিদে ভরপুর ছিল। নানা পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল ছিলো। বক, মাছরাঙা, নিশিবক, মৎস্যভুক পাখিগুলোর অভয়ারণ্য। বিশেষ করে ডাহুক পাখিদের জন্য এই বিলের বিশেষত্ব ছিলো।
শুস্ক মৌসুমে এই বিলে বয়াৎ দিয়ে শত শত মানুষ মাছ ধরতো। এই সব দৃশ্য এখন শুধুই কল্পনা।
আন্তর্জাতিক: পশ্চিম তীরে বেদুইন সম্প্রদায়কে উচ্ছেদ করছে ইসরায়েল
আন্তর্জাতিক: ইউক্রেনে রাশিয়াকে পরাজিত করতে ব্যর্থ ইউরোপ: মেদভেদেভ
আন্তর্জাতিক: তুরস্কে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যু, আহত ৩০
অর্থ-বাণিজ্য: ১০০ টাকার প্রাইজবন্ডের ড্র
অর্থ-বাণিজ্য: চার মাস পর ডিএসইতে ৭০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন