সাতচল্লিশে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের বছর কয়েক পর পাকিস্তানের পূর্ব অংশ বাংলাদেশে স্বল্প শিক্ষিত সাধারণ মানুষ- বিশেষ করে শ্রমিক-কৃষক-সহ মধ্যবিত্ত শ্রেনীর শ্রমজীবী মানুষকে সংবাদপত্র পাঠে উদ্বুদ্ধ করার মানসিকতা নিয়ে দৈনিক সংবাদকে একটি আদর্শবাদী সংবাদপত্র হিসেবে দাঁড় করিয়ে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছিলেন আহমদুল কবির। আজ মঙ্গলবার ৩ ফেব্রুয়ারি সেই ক্ষণজন্মা সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব ও সেই সময়ে প্রগতিশীল রাজনীতির অন্যতম পুরোধা আহমদুল কবিরের ১০৪তম জন্মদিন।
দৈনিক সংবাদ-এর সেই প্রাণপুরুষ আহমদুল কবিরের ১০৪তম জন্মদিন উপলক্ষে তার (মনু মিয়া) স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে আজ তার গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর ঘোড়াশালে মিয়াবাড়িতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানমালায় রয়েছে, আহমদুল কবিরের কবরে পুস্পস্তক অর্পণ, বিভিন্ন স্কুলের মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান, এতিম শিক্ষার্থীদের নিয়ে জন্মদিনের কেক কাটা, আলোচনা সভা, দুস্তদের মধ্যে উন্নত খাবার বিতরণ, দিনব্যাপী কোরানখানি ও দেয়া মাহফিল।
পাকিস্তানের স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশ অঞ্চলের মানুষের পত্রিকা পাঠের চাহিদা মিটতো কলকাতা থেকে আসা সংবাদপত্র পাঠ করে। তাও আসতো ডাকে একদিন পর। সেই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য সেই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পুরান ঢাকার এক ব্যবসায়ী প্রকাশ করেছিলেন সংবাদ। পরে তা চলে আসে আহমদুল কবিরের হাতে। তার পরিচালনায় সেই পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগ থেকে দৈনিক সংবাদ আধুুনিক, প্রগতিশীল ও সাধারণ মানুষের খবর প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে নুতন আঙ্গিকে প্রকাশের নতুন যাত্রা শুরু হকরেছিল। তার চিন্তা-চেতনার হাত ধরেই ১৯৫৪ সালে আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রবীণ দৈনিক সংবাদপত্র- ‘সংবাদ’ নুতন আদর্শিক ধারা ও প্রগতিশীল মুক্তচিন্তার দৈনিক হিসেবে পাঠকসমাজকে আলোড়িত করেছিল।
আহমদুল কবির ছিলেন সংবাদের প্রধান সম্পাদক ও দেশের প্রগতিশীল ধারার রাজনীতির পুরোধা ব্যক্তিত। ১৯২৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর ঘোড়াশালের ঐতিহ্যবাহী মিয়া বাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মরহুম আবু ইউসুফ লুৎফুল কবির ছিলেন ঘোড়াশালের জমিদার। মায়ের নাম মরহুমা সুফিয়া খাতুন। ২০০৩ সালের ২৪ নভেম্বর কলকাতার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
আহমদুল কবির ছিলেন ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতা অঙ্গনের এক প্রতিভাদীপ্ত ব্যক্তিত্ব। আপসহীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জন্য পাকিস্তান আমল থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি ছিলেন একজন ভিন্নমাত্রার রাজনীতিক। মূলত তার রাজনৈতিক দর্শন ছিল এদেশের সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে কাজ করা। তদানীন্তন পাকিস্তানের রাজনীতিতে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল যে ধারা এদেশে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিপুল জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক চেতনাকে নাড়া দিয়েছিল, সেই একই ধারার পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন আহমদুল কবির। পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী রাজনীতির নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন আহমদুল কবির। দেশের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন আদর্শবান এবং নীতিনিষ্ঠ এক নেতা হিসেবে। তিনি সত্তরের দশকে গণতন্ত্রী পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। মৃত্যুকাল পর্যন্ত তিনি পার্টির সভাপতি ছিলেন।
আহমদুল কবির ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসুর প্রথম ভিপি। ১৯৬৫ সালে আহমদুল কবির ন্যাপের প্রার্থী হিসেবে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। সংবাদপত্রকে তিনি তার রাজনৈতিক আদর্শ প্রচার ও স্বকীয় প্রতিভা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন।
সাংবাদিকতায় তার অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল এবং বস্তুনিষ্ঠ চেতনার প্রতিরূপ হলো দৈনিক ‘সংবাদ’। দৈনিক সংবাদ-এ বস্তুনিষ্ঠ খবর ও মতামত প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেন। আমৃত্যু তিনি তার এই আদর্শ লালন করে গেছেন। কমনওয়েলথ প্রেস ইউনিয়নের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতির পদও অলংকৃত করেছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। আহমদুল কবির দেশের একজন বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তাও ছিলেন। এ দেশের শিল্প-বাণিজ্য প্রসারে তার সক্রিয় অবদান রয়েছে।
আহমদুল কবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ১৯৪৫-৪৬ সালে ডাকসুর প্রথম সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। এছাড়াও ১৯৪২-৪৩ সালে তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৫ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রার্থী হিসেবে তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে নরসিংদী-২ (পলাশ-শিবপুর) নির্বাচনী এলাকা থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে নরসিংদী-২ (পলাশ) নির্বাচনী এলাকা থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। আহমদুল কবির অর্থনীতিতে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করার পর রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ায় যোগদান করেন এবং ফরেন এক্সচেঞ্জ বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫০ সালে তিনি পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেন এবং ১৯৫১ সালে গ্যাটে সম্মেলনে যোগদান করেন। ১৯৫৪ সালে তিনি নিজের ব্যবসায় যোগদান করেন। আহমদুল কবির তদানীন্তন পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। দীর্ঘদিন তিনি কৃষক সমিতির কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। আশির দশকে তার নেতৃত্বে গণতন্ত্রী পার্টি গঠিত হয় এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি ছিলেন। ১৯৭০-১৯৮০ সাল পর্যন্ত সময়ে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান করেন। রোমে ফাও-এর কনফারেন্সে প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। ইইসি দেশগুলোতে তিনি বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান সরকার ‘সংবাদ’ অফিস পুড়িয়ে দেয় এবং আহমদুল কবিরকে গ্রেপ্তার করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সামরিক জান্তা সংবাদ প্রকাশের জন্য অনেক প্রলোভন দেখায়; কিন্তু আহমদুল কবির পত্রিকা প্রকাশ করেননি। স্বাধীনতার পরপরই তিনি জেল থেকে মুক্তিলাভ করেন এবং সংবাদ পুনঃপ্রকাশ করেন।
আহমদুল কবির ১৯৫৪ সালে সংবাদ’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে তিনি সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০১ সালে প্রধান সম্পাদক হন এবং আমৃত্যু এ দায়িত্ব পালন করে গেছেন। আহমদুল কবির স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়ে ও অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, গুণগ্রাহী ও রাজনৈতিক অনুসারী রেখে গেছেন। প্রয়াত আহমদুল কবিরের স্ত্রী লায়লা রহমান কবির দেশের একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। তার বড় ছেলে আলতামাশ কবির ‘সংবাদ’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সম্পাদক, দ্বিতীয় ছেলে আরদাশির কবির দেশের বিশিষ্ট চা ব্যবসায়ী এবং একমাত্র মেয়ে ব্যারিস্টার নিহাদ কবির সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত।