সোনাসহ মূল্যবান খনিজ সম্পদ পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন বিজ্ঞানীরা
দীর্ঘ ৬০ বছর পর রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার শানেরহাট ইউনিয়নের ছোট পাহাড়পুর গ্রামে দেশের প্রথম লোহার খনিতে কূপ খননের মাধ্যমে অনুসন্ধান কার্যক্রম গত শনিবার থেকে শুরু হয়েছে। খনিজ বিজ্ঞানীদের মতে, এ খনিতে লোহার পাশাপাশি তামা, নিকেল, ম্যাঙ্গানিজ এমনকি স্বর্ণ থাকারও সম্ভাবনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, ১৯৬৫ সালে পীরগঞ্জ উপজেলার শানেরহাট ও মিঠিপুর ইউনিয়নের ভেলামারী গ্রামে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের খনিজ সম্পদ বিভাগ প্রথম লোহার খনির প্রাথমিক সন্ধান পায়। সে সময় খনি চিহ্নিত করতে চারটি কূপ খনন করে কংক্রিটের ঢালাই দেয়া হয়, যা এখনও দৃশ্যমান রয়েছে।
তিনি আরও জানান, ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধের পর তৎকালীন সরকারের খনিজ সম্পদ বিভাগের একদল কর্মকর্তা স্যাটেলাইট চিত্র ও অন্য তথ্য বিশ্লেষণ করেন। পরে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন খনিজ বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে একটি দল ভেলামারী ও শানেরহাট গ্রামে এসে প্রায় ছয় বর্গকিলোমিটার এলাকা জরিপ করে সেখানে বিপুল পরিমাণ লোহাসহ অন্য মূল্যবান খনিজ সম্পদের মজুত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ওই সময় ভেলামারী গ্রামে সম্ভাব্য খনির উৎসস্থলে কংক্রিটের ঢালাই দিয়ে চিহ্নিত করে প্রাথমিক জরিপ কাজ সম্পন্ন করা হয়।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে খনি কার্যক্রম শুরু করার কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। অবশেষে দীর্ঘ ৬০ বছর পর ‘ভূতাত্ত্বিক খনন কূপ জিডিএইচ-৭৯/২৫’-এ গত শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।
উদ্বোধন শেষে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষ উদার; সৃষ্টিকর্তা এ অঞ্চলের মাটির নিচে খনিজ সম্পদ দিয়েছেন। এখানে যে খনিজ সম্পদ পাওয়া যাবে, তা উত্তোলনে সরকার সর্বাত্মক সহায়তা করবে। এটি কোনো সাধারণ বিষয় নয়, এটি জাতির দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। এই কূপ খননের মাধ্যমে আমরা বহুমূল্য খনিজ সম্পদ আহরণ করতে পারব, যা দেশের অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখবে।’তিনি জানান, বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর এ অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুল মান্নান জানান, ২০০০ সালে ‘জিডিএইচ-৫৪’ নামে একটি কূপ খনন করে ভূগর্ভস্থ অবস্থা যাচাই করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে মিঠিপুর ইউনিয়নের কাশিমপুর গ্রামে ‘জিডিএইচ-৭৮/২৩’ নামে আরেকটি কূপ খনন করা হয়, যেখানে কিছু খনিজ উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। চলতি বছর এক হাজার ২০০ মিটার পর্যন্ত খনন কার্যক্রম চালানো হবে বলেও জানান তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খনন শেষে যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে পর্যাপ্ত পরিমাণ খনিজ সম্পদ রয়েছে এবং তা উত্তোলনে আর্থিকভাবে লাভজনক হবে, তবে সরকারকে খনি উত্তোলনের সুপারিশ করা হবে। আর কী ধরনের খনিজ থাকতে পারে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ এলাকার বিজমেন্ট উচ্চ হওয়ায় এখানে লোহা, তামা, নিকেল, ম্যাঙ্গানিজ এমনকি স্বর্ণের মতো ধাতব খনিজ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিজ্ঞানীসহ খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে খনন কাজ শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এলাকায় ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলছে।
এ বিষয়ে পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. পপি খাতুন এবং শানেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেছবাহুর রহমান জানান, স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসী অনুসন্ধান কার্যক্রমে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।