যেখানে পাহাড় নদীর মিলন। মেঘ যখন পাহাড়ের নিচে কখনও উপরে। পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে শীলার উপর। ফসল যখন জুম। জলের উৎস যেখানে ঝরনা আর নদী ঝিরি। গিরিপথ দুর্গম। জুমে জুটে যাদের সারা বছরের খাদ্যের জোগান। আদা হলুদ ধান কুমড়া ভুটাসহ নানা ফসল সবজি আসে জুম থেকে। পানির চাহিদা মিটে ঝরনা থেকে। হাট বাজার দূর-দূরান্তে। হেঁটে মোটরসাইকেল কিংবা চান্দের গাড়িই ভরসা। পাহাড় পাড়ি দিতে লাঠি হাতে। বর্ষাকালে বেড়ে যায় কষ্টের মাত্রা। নদীর স্রোত বাড়ে প্রবল। পাশেই গড়ে ওঠা বসতিদের কষ্ট লাগাম বাড়তেই থাকে। জীবন-জীবিকা হয়ে কঠিন। বাড়িঘরগুলো কাঠের মাচার উপর স্থানীয় বসতিদের আদি ঐতিহ্যে তৈরি করা। এখানেই তাদের বসবাস। বংশপরম্পরায় বাস করছে মাচার ঘরেই। বলছিলাম বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার পাহাড়ি গ্রাম শীলবান্ধার কথা। বসতিরা নিজেদের পাহাড়ি বলে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যেবোধ করে। বসতিদের মধ্যে বৌদ্ধ মারমা তাজংগাসহ বিভিন্ন পাহাড়ি নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মানুষদের বসবাস। নিজেদের ঘর নিজেরাই তৈরি করে থাকে। তবে শুষ্ক মৌসুসেই তারা তাদের বাড়িঘর তৈরি করে থাকে। আবাসস্থল বানিয়ে নেয়। এমন চিত্র চোখে পড়ে শীলবান্ধা গ্রামে। কারো ঘর কাঠের খুঁটি, কারো সিমেন্টের খুঁটি। বেড়া চাটাই, কারো চালা টিনের, কারো ছনের। নিপুণভাবে তৈরিকৃত এসব ঘর দেখতে দারুণ শৈল্পিক মনে হয়। দেখতেও অনেকটা নান্দনিক। বৈচিত্র্যময় জীবনধারার বসতি ও গ্রাম নিয়ে কৌতূহল রয়েছে পর্যটকদের।
সরেজমিনে বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি জনপথে গিয়ে দেখা যায়, শীলবান্ধা গ্রামের চিত্র। জানা যায় তাদের জীবন জীবিকার গল্প। সকাল ১০টায় শহর থেকে বান্দরবানের পাহাড়ি পথে চলাচলের বাহন চান্দের গাড়িতে রওনা। আঁকাবাঁকা সড়ক। কোথাও উঁচু। কোথাও নিচু। কোথাও মেঘ পাহাড়ে মিলন মোহনা। নিচের নদীর পাশে পাহাড়ের ঢালুতে ঘর বাড়ি। কেউ লাকড়ি আনছে। কেউ তাঁত বুনছে। জুমের খেত দেখা যায় টিলা পাহাড়ে। এভাবে দেখতে দেখতে প্রায় আধা ঘণ্টা পথ মুড়িয়ে রোয়াংছড়ির তলা বাজার। পর্যটকরা পাহাড়ে যাওয়ার জুতা লাঠি কিনতে ব্যস্ত। পর্যটাদের আইডি কার্ড তালিকা করে গাইডদের হাতে দেয়। সেনা ক্যাপম্পের পাশ নিয়ে আবার ছুটে চলা। কিছুক্ষণ পর গাড়ি থেমে গেল। ড্রাইভার বলল সবাই নেমে যান। সাবধানে যাবেন। গাইডের কথা মেনে চলবেন। একা কোথাও যাওয়া যাবে না।
৫ মিনিট পাহাড়ের ঢাল নামতে নামতে চোখে পড়ে নদী। দুই পাড়ে ঘাড়া পাহাড়। মাঝখানে নদী। নদীর নাম শঙ্ঘ নদী। পানি কম। শুকনো শুকনো। সামান্য জল আছে। পাথরের উপর দিয়ে দিয়ে নদী হয়ে ওপারে গেলাম। পাশেই পাহাড়ি নারীরা পানি নিচ্ছে। কেউ গোসল করছে। কেউবা মাছ ধরছে এমন দৃশ্য দেখা গেল। নদীর কাছার বেয়ে উঠে পাওয়া গেল কয়েকটি বাড়ি মিলে একটি বসতি গ্রামের মতো। স্থানীয় জানালেন গ্রামটির নাম শীলবান্ধা। ১৫-২০টি বাড়ি দেখা গেলা নদীর তীরে, পাহাড়ের নিচে। উপরে বাড়ি ঘর দেখা গেল না। বাড়িগুলোতে নারীরা নিজেদের কাজ করছে। কেউ ঘর বানাচ্ছে। কেউ দোকান করছে। হাঁস-মুরগিও দেখা গেল। মাচার উপরে কাঠ বাঁশের সুন্দর ঘরগুলো যে কারও নজর কাড়ে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ির উপজেল অবস্থান। পাহাড়ি নদীর তীর এ গ্রামটি অবস্থিত। নদী দক্ষিণ-পশ্চিম সীমানা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। তাদের জীবনাচার যেমন পর্যটকদের আকর্ষণ করে, তেমনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও মোহিত করে তাদের। পর্যটকদের নজর কাড়ে রোয়াংছড়ির আলেক্ষ্যং ইউনিয়নে শীলবান্দা পাড়া গ্রামটি। অদূরে প্রাকৃতিক ঝিরি ঝরনার অপার সৌন্দর্যও দেখা যায় সহজেই। বান্দরবান সদর থেকে ২১ কি.মি দূরত্ব।.
রোয়াংছড়ি সদর থেকে ঘণ্টাখানেকের দূরত্বেই শীলবান্দা ঝরনার অবস্থান। প্রায় ৪০ ফুট উঁচু থেকে ঝরে পড়া জলের উচ্ছ্বাস মুগ্ধ করে পর্যটকদের। ঝোঁপ-জঙ্গলে বেষ্টিত এই ঝরনায় যেতে হয় দেড় কিলোমিটার পাহাড়ি পথ হেঁটে। বান্দরবান থেকে চান্দের গাড়িতে রোয়াংছড়ির কচ্ছপতলী বাজারে যেতে হবে।
কচ্ছপতলী বাজার থেকে ৩৫-৪০ মিনিট হাঁটলেই পৌঁছানো যাবে ঝরনায়। যাত্রা পথে চোখে পড়বে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দৃশ্য; সবুজ পাহাড় গ্রাম, ঝোঁপ-জঙ্গলের ভেতর দিয়ে গ্রামীণ পথ চলার পথ আসলেই মোহনীয়। শীতের সময় হেঁটে যাওয়া রাস্তাও ভালো থাকে। সেখানে যাওয়ার পথে উঁচু-নিচু পাহাড় বেয়ে উঠলে দেখা যায় রং-বেরঙের জলের রেখা।
শীলবান্ধা গ্রামের এক নারী জানালেন, তাদের গ্রামটি স্থানীয় কচ্ছপতলী ইউনিয়নে অবস্থিত। বান্দরবান শহর তাদের গ্রাম, নাফাখুম ও রেমাক্রীর চেয়ে দূরত্বও কম। অল্প সময়ে সহজে যাওয়া যায় এ পর্যটন স্পটে। দূরত্ব কম ও যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় প্রতিনিয়ত পর্যটকরা ছুটে যাচ্ছেন শীলবান্ধা ঝরনা ও দেবতাখুমের সৌন্দর্য দেখতে।
কয়েকজন নারী-পুরুষ বসতিরা জানালেন, তাদের পাহাড়িয়া এলাকায় কাঠের বা সিমেন্টের খুঁটির উপর মাচা দিয়ে ঘর বাঁধা হয়। বেড়া দেয়া বাঁশের চাটাই আর টিনের চালা। অনেকেই আবার ছনের ছাউনিও দিয়ে থাকে। তারা এভাবেই ঘর তৈরি করে বংশপরম্পরায় বসবাস করে আসছে।
ছবি- বান্দরবানের শীলবান্ধা গ্রামে মাচায় উপর ঘর বানিয়ে বসবাস করে স্থানীয়রা