image
কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) : উপজেলার দাসেরগাঁও বিখ্যাত বিন্নি ধানের খইয়ের জন্য

দাসেরগাঁওয়ের বিন্নি খইয়ের ঐতিহ্য আজও অম্লান

প্রতিনিধি, কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ)

কটিয়াদী উপজেলার দাসেরগাঁও বিখ্যাত বিন্নি ধানের খইয়ের জন্য। এখানকার বিন্নি ধানের খইয়ের ঐতিহ্য শতবর্ষের। বংশ পরস্পরায় আজও এ গ্রামের প্রায় দেড়শতাধিক পরিবার বিন্নি ধান চাষ এবং এ ধান থেকে খই তৈরির পেশার সঙ্গে জড়িত। একটা সময় ছিল গ্রামবাংলায় অতিথি আপ্যায়নের মূল উপকরণ ছিল বিন্নি খই। এখনও হালকা খাবার হিসেবে চিড়া-মুড়ি-খইয়ের চল আছে। তবে চিড়া-মুড়ির মতো হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় না বিন্নি খই। এক্ষেত্রে বিন্নি ধানের খইয়ের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের প্রত্যন্ত জনপদ দাসেরগাঁওয়ের মানুষ। প্রতি বছর শীত-বসন্ত এলেই দাসেরগাঁওয়ের চিত্র বদলে যায়। এখন এলাকার ঘরে ঘরে চলছে বিন্নি খই তৈরির ধুম। এবার মুনাফার আশা দেখছেন খই ব্যবসায়ীরা। তাই জোর কদমে চলছে খই তৈরির কাজ। স্থানীয়দের কথায় শীতের শুরু থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্ত গ্রামগঞ্জে চলে নানা ধরনের মেলা। এই সময়টাই মূলত বিন্নি খই ভাজার মৌসুম। এই সময়ে একেকটি পরিবার ১০০ মণের ওপর বিন্নি খই ভাজতে পারে। বর্তমানে প্রতি মণ বিন্নি খই বিক্রি হচ্ছে ১৩-১৪ হাজার টাকা দরে। সে হিসাবে ১৮-২০ কোটি টাকার বিন্নি খই এই গ্রাম থেকে সিলেট, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা এসে কিনে নিয়ে যাবেন বলে আশা করছেন তারা। এ বিন্নি পাড়ি দেয় বিদেশেও। তবে সেগুলো ব্যক্তিগত উদ্যোগে, প্রবাসীরা নিয়ে যান প্রিয়জনদের জন্য। একসময় উপজেলার উঁচু জমিতে প্রচুর পরিমাণে বিন্নি ধান চাষ হতো। বর্তমানে উফশী ও বিভিন্ন ধানের প্রভাবে বিন্নি আবাদ প্রায় হারিয়ে গেলেও দাসেরগাঁওয়ের কৃষকরা এ ধানের আবাদ ধরে রেখেছেন। যদিও অন্য জাতের তুলনায় বিন্নি ধানের ফলন কম হয়। প্রতি বিঘায় ৬-৮ মণ ধান হয়ে থাকে। ফলে এ ধানের দামও বেশি।

বর্তমানে এ ধানের দাম মান ভেদে সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকা মণ। বিন্নি খইয়ের চাহিদার তুলনায় এ অঞ্চলের উৎপাদিত ধানের জোগানও কম। তাই এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বিন্নি ধান কিনতে হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। সরেজমিনে দাসেরগাঁও গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, এলাকার নারীরা নিপুণ হাতে ভেজে চলছেন বিন্নি ধানের খই। বসে নেই স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা। কথা হয় ষাটোর্ধ্ব মল্লিকা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ৪০ বছর আগে শাশুড়ির কাছ থেকে বিন্নি খই তৈরি শিখেছিলেন। বর্তমানে আমার ছেলের বউ ও নাতি-নাতনিরা আমাকে সাহায্য করে। এভাবে বংশ পরস্পরায় চলে আসছে বিন্নি খই তৈরির ধারাটি। তিনি জানালেন বিন্নি খই তৈরির কৌশল। প্রথমে কাঁচা ধানকে ৫-৭ দিন রোদে শুকিয়ে তা থেকে চাল করা হয়। সেই চাল কয়েকবার ভালো করে ধুয়ে সুতি কাপড়ের সাহায্যে শুকানো হয়। এরপর মাটির চুলায় লোহার কড়াইয়ে বালু দিয়ে তা উত্তপ্ত করা হয়। বালু গরম হলে এর মধ্যে

বিন্নি চাল দিয়ে বাঁশের কাঠির ঝাঁটা দিয়ে নাড়তে হয়। নাড়ার একপর্যায়ে তৈরি হয় বিন্নি খই। অন্য ধানের খই আগুনের তাপে ধান ফেটে তৈরি হয়। কিন্তু বিন্নি খই চাল ভেজে তৈরি করা হয়। এই খই আকারে ছোট, রং ধবধবে সাদা। মুখে দিলে গলে যায়, স্বাদেও অতুলনীয়।

গ্রামের বাসিন্দা জয়নাল মিয়া, আব্দুল ছালামসহ অনেকে জানান, বিন্নি খই তৈরি তাদের মূল পেশা। আনন্দবাজার থেকে এই গ্রামে যাওয়ার গ্রামীণ রাস্তাটি কাঁচা হওয়াই বৃষ্টি হলে পানি জমে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফলে বিন্নি খই বাজারজাতকরণেও সমস্যা হয়। তাই সরকারের কাছে এ অঞ্চলের বিন্নি খইয়ের ঐতিহ্যকে বাঁচানোর জন্য রাস্তাটি পাকাকরণসহ সুদবিহীন ঋণ সহায়তার আবেদন করেন তারা। পাইকার জুয়েল মিয়া ও মাজু মিয়া বলেন, এখানকার বিন্নি খইয়ের খুব চাহিদা রয়েছে। এই খই নিয়ে আমরা দেশের বিভিন্ন বাজার ও মেলায় বিক্রি করি। এতে ভালো লাভ হয়। বনগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন বলেন, এখানকার বিন্নি ধানের খইয়ের সুনাম রয়েছে সারাদেশে। গ্রামীণ রাস্তাটি সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। কটিয়াদী উপজেলা ইউনিয়ন পরিষদ ঐক্য ফোরাম সাধারণ সম্পাদক ও জালালপুর ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল আলম বলেন, উপজেলার দাসেরগাঁওয়ের বিন্নি ধানের খইয়ের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে। এনজিও, ব্যাংক বা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে এই পেশার সঙ্গে জড়িতদের সহজশর্তে ঋণ পাইয়ে দেয়া যায় কিনা, সে ব্যাপারে সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করব।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

» ১৫ বন্দর কর্মীর বদলি প্রত্যাহার না হলে ফের আন্দোলন

» মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বইছে ৪ জেলায়

» গয়াবাড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজ ডিমলায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান বন্ধ রেখে সাংবাদিক সম্মেলন

» ডিমলায় প্রশাসনিক ক্ষমতা পেলেন প্যানেল চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান মাসুদ

সম্প্রতি