চলতি শীত মৌসুমে ভোলার উপকূলে পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল কমে যাচ্ছে। পাখির বিচরণভূমিতে চাষাবাদ, চরগুলোতে মানুষের উপস্থিতি এবং শিকারের কারণে প্রতি বছর স্থান পরিবর্তন করছে অতিথি পাখি। কয়েক বছর আগে যেসব পাখির সংখ্যা হাজারের ওপর ছিল, এখন তা কয়েকশর মধ্যে চলে এসেছে। এতে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। উপকূলীয় এলাকায় পাখিশুমারি শেষে এসব তথ্য জানান শুমারিদলের সদস্য পর্বতারোহী এম এ মুহিত। এম এ মুহিত বলেন, একসময় ভোলার উপকূলীয় অঞ্চলে বার-হেডেড গুজ নামের পাখির সংখ্যা হাজারের ওপর দেখা যেত, এ বছর সেখানে দেখা গেছে মাত্র ২০-২৫টি।
এছাড়া খয়রা চখাচখি, গাঙচষা নামের পাখির সংখ্যাও হাজারের ঘর থেকে শতকের ঘরে নেমে এসেছে। কমে যাওয়া পাখির মধ্যে রয়েছে উত্তরে খুন্তেহাঁস, লেনজা হাঁস, ইউরেশিয়ান টিল, গ্যাডওয়াল ও সৈকত পাখি। পরিযায়ী পাখি হাঁড়গিলা আগে শত শত দেখা গেলেও এ বছর একটিও দেখা যায়নি। গত ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের রিচার্স কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ড. সায়াম ইউ চৌধুরীর নেতৃত্বে তাদের সাত সদস্যের একটি দল ভোলা সদর উপজেলার খেয়াঘাট থেকে ট্রলারে করে পাখিশুমারি শুরু করেন। আট দিনে তাঁরা ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও পটুয়াখালীর ৫৩টি চরে এ পাখি গণনা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। শীত মৌসুমে সাইবেরিয়া ও তিব্বতসহ উত্তরের বরফপ্রধান দেশগুলো বরফে ঢেকে থাকে। এ সময় সেখানকার পাখিদের খাদ্য সংকট দেখা দেয়। তাই খাবারের সন্ধানে বাংলাদেশের হাওর এবং উপকূল অঞ্চলে আসে বিপুল পরিযায়ী পাখি। এসব পাখির জন্য ভোলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ জেলা। শীতে এ জেলার চারদিকে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর অসংখ্য ডুবচরে এসব পরিযায়ী পাখি দল বেঁধে বিচরণ করে। বিস্তীর্ণ ডুবোচরগুলোতে পাখিরা খাবার আহরণ করে থাকে। শীত শেষে পুনরায় সেসব দেশে ফিরে যায়। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সদস্য এম এ মুহিত জানান, ২০০০ সাল থেকে ভোলার উপকূলীয় এলাকায় পাখিশুমারি দলের সঙ্গে পাখি গণনা করে আসছেন তিনি। খাদ্য সংকট ও নিরাপদ আবাসস্থলের কারণে গত ২৭ বছরে পর্যায়ক্রমে ভোলার উপকূলে এসব পরিযায়ী পখির সংখ্যা কমে আসছে, যা পরিবেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, কী কারণে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে, তা নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন। একটি দেশের প্রকৃতির স্বাস্থ্য কেমন- এটা নির্ভর করে পাখির সংখ্যার ওপর। প্রকৃতির স্বাস্থ্য ভালো থাকলে মানুষের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। পাখি হলো প্রকৃতির স্বাস্থ্য ভালো রাখার একটি উপাদান। তাই আমাদের ভালোর জন্য প্রকৃতিকে সুস্থ রাখতে হবে, আর পাখি প্রকৃতিরই একটি অংশ। এম এ মুহিত বলেন, সম্প্রতি দেখা গেছে ভোলার চরগুলোতে ব্যাপক তরমুজের আবাদ হয়েছে। পাখি কমে যাওয়ার এটিও একটি কারণ। তাই এসব পরিবেশবান্ধব পাখির বিচরণের জন্য আলাদা করে কিছু চর রেখে দিলে সেখানে পাখিরা বিচরণের সুযোগ পাবে। আর এতে আমাদের পরিবেশ ও কৃষি দুটিই রক্ষা হবে। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের রিসার্চ কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ড. সায়াম ইউ চৌধুরী জানান, এ বছর জরিপে উপকূলীয় মেঘনা মোহনার ৫৩টি স্থানে ৬৩ প্রজাতির ৪৭ হাজার ১৫৭টি জলপাখির অস্তিত্ব রেকর্ড করা হয়। সবচেয়ে বেশি প্রজাতি ছিল ইউরেশিয়ান উইজিওন, যার সংখ্যা ছয় হাজার ১২টি, ব্যাক-টেইলড গডউইট চার হাজার ৪৩৪টি এবং লেসার স্যান্ড পেল্লাভারের দেখা মিলেছে তিন হাজার ৯৬২টি।
এছাড়া ভোলার মনপুরার কাছে চর আতাউর, ভাসানচরের কাছে জৈজ্জার চর এবং আন্ডার চরে জলপাখির সর্বাধিক ঘনত্ব দেখা গেছে। চর আতাউরে ছয় হাজার ৪৭৯টি, জৈজ্জার চরে পাঁচ হাজার ৮১৪টি এবং আন্ডার চরে চার হাজার ৯৮৭টি পাখি ছিল। তুলনামূলকভাবে ২০২৫ সালের জরিপে ৪৮টি স্থানে ৬২ প্রজাতির প্রায় ৪৬ হাজার ১৫টি জলপাখি রেকর্ড করা হয়েছিল। ২০২৬ সালে রেকর্ড করা উচ্চতর সংখ্যা সম্ভবত জরিপের পরিধি বৃদ্ধি এবং জলপাখির সংখ্যার প্রাকৃতিক বার্ষিক তারতম্য উভয়ই প্রতিফলিত করে। পাখিশুমারি দলের সদস্য নাজিম উদ্দিন প্রিন্স জানান, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব, স্কোপ ফাউন্ডেশন এবং বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনালের যৌথ উদ্যোগে উপকূলীয় ৫৩ চরে এ বছর পাখি গণনা করা হয়েছে। গত ১১ জানুয়ারি ভোলার খেয়াঘাট থেকে একটি মাছধরার বড় ট্রলার নিয়ে যাত্রা শুরুকরা হয়। প্রায় ৫০০ কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিয়ে ১৮ জানুয়ারি সন্ধ্যায় পুনরায় একই স্থানে শুমারি কার্যক্রম শেষ হয়। নাজিম উদ্দিন বলেন, শুমারি অনুযায়ী গত বছরের তুলনায় এ বছর পাখির সংখ্যা প্রায় একই। তবে ভোলার পার্শ্ববর্তী চরে পাখির সংখ্য অনেক কমেছে। শিকারিদের উপদ্রবের পাশাপাশি নতুন করে যে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছি, তা হলো তরমুজ চাষ। ভোলার পার্শ্ববর্তী চরগুলোতে আগে অনেক শীতকালীন পরিযায়ী পাখি দেখতাম। কিন্তু তরমুজ চাষের কারণে এসব চরে পাখির সংখ্যা বেশ কমেছে। তবে কতটা কমেছে- সেই সংখ্যাটি এখন নির্ধারণ করা কঠিন। তিনি বলেন, তরমুজ চাষের ফলে এ অঞ্চলে পাখির আবাসস্থলের ক্ষতি হচ্ছে। তবে পাখিদের জন্য কিছু নির্দিষ্ট জায়গা রেখে যদি তরমুজ চাষ করা যায় তাহলে পাখিদের বিচরণে ক্ষতি হবে না। শুমারিদলের সদস্য মো. ফয়সাল জানান, পাখিশুমারি মূলত জলচর ও পরিযায়ী পাখিকেন্দ্রিক হয়ে থাকে। যেসব পাখি অন্য দেশ থেকে পরিযায়ন করে বাংলাদেশে আসে, সেসব পাখি নিয়েই এ জরিপ হয়ে থাকে। এসব পরিযায়ী পাখির বিষয়ে প্রতিবছর আমরা দেখি পাখি শিকার ও আবাসস্থল নষ্ট হওয়াসহ অনেক নেতিবাচক দিক দেখে থাকি। কিন্তু এবার নেতিবাচক দিকের মধ্যে একটি ইতিবাচক দিকও আমরা লক্ষ করেছি- মহিষের বাতানের রাখালদের সঙ্গে পাখিরা একসঙ্গে বসবাস করছে। এর দ্বারা এটি প্রমাণিত হয়, এখানে পাখি শিকার হচ্ছে না বা মানুষ পাখির উপদ্রবের কারণ হচ্ছে না। ফয়সাল বলেন, সারা দেশে যারা পাখির আবাসস্থলের কাছাকাছি বসবাস করে, এই উদাহরণটি তাদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারলে, তাদের মধ্যে এমন সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলে পাখিরা নিরাপদ থাকবে। পাখি আমাদের সম্পদ- এই ধারণা এবং পরিযায়ী পাখি বিচরণের ইতিবাচক দিকগুলো স্থানীয়দের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। শিকার বন্ধ ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষার পাশাপাশি মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হলে পরিযায়ী পাখি ও বন্যপ্রাণী রক্ষা করা আমাদের জন্য সহজ হবে। পাখি গণনা দলের সদস্য বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা ফা-তু-জো খালেক মিলা বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে কী পরিমাণ পরিযায়ী পাখি আসে এবং উপকূলীয় এলাকা এসব পাখির বিচরণের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রতি বছর এ জলচর পাখিশুমারি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কী পরিমাণ ও কোন কোন প্রজাতির পাখি আসছে, সেটি আমরা পর্যবেক্ষণ করে থাকি।
তিনি বলেন, এ বছর ৬৩ প্রজাতির মধ্যে একটি বিপন্ন প্রজাতির ইন্ডিয়ান স্কিমার বা দেশীয় গাঙচষা বেশ ভালো পরিমাণ দেখা গেছে। এসব পরিযায়ী পাখির জন্য কাদাজলের চরগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এসব চরে মানুষের আনাগোনা বাড়লে পাখির সংখ্যা কমে যায়। যেসব চরগুলো পাখির বিচরণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেসব চরে মানুষের যাতায়াত কমাতে বন অধিদপ্তর চেষ্টা করছে।