খেজুরের কাঁচারস ও বাদুড়ে খাওয়া আধাফল না খাওয়ার পরামর্শ: ডা. শারমিন
নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) তথ্য মতে, গত জানুয়ারি মাসে দেশের উত্তরাঞ্চল নওগাঁয় এক নারী এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
শনিবার, (০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) রাতে মহাখালী রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ভাইরোলজি বিভাগের ডা. শারমিন সুলতানা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, একজনই আক্রান্ত হয়েছে, একজনই মারা গেছেন।
বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয়। সম্প্রতি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও দুই জনের শরীরে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরে সতর্কতা ও স্ক্রিনিং জোরদার করা হয়েছে।
মৃত ওই নারীর বয়স ছিল ৪৫-৫০ বছরের মধ্যে। গত ২১ জানুয়ারি তার শরীরে নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ দেখা দেয়। যার মধ্যে ছিল জ্বর, মাথাব্যথা, অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ, মানসিক বিভ্রান্তি এবং খিঁচুনি। লক্ষণ দেখা দেয়ার এক সপ্তাহ পর তিনি মারা যান এবং পরের দিন তার নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়।
তদন্তে জানা গেছে, ওই নারীর কোনো বিদেশ ভ্রমণের ইতিহাস ছিল না। তবে তিনি কাঁচা খেজুরের রস পান করেছিলেন।
আক্রান্ত নারীর সংস্পর্শে আসা ৩৫ জন ব্যক্তিকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। তবে পরীক্ষায় তাদের সবার ফলাফল নেগেটিভ এসেছে এবং এখন পর্যন্ত নতুন কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি।
নিপাহ ভাইরাস মূলত সংক্রমিত বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়ায়, বিশেষ করে বাদুড় লালা বা মলত্যাগের মাধ্যমে ফলমূল বা রস দূষিত করলে তা থেকে মানুষ আক্রান্ত হয়। আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, তবে এটি খুব সহজে একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে ছড়ায় না।
এর আগে গত ৭ জানুয়ারি ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. শারমিন সুলতানা নিপা ভাইরাসের ঝুঁকি নিয়ে এক মতবিনিময় সভা শেষে জানিয়েছেন, নিপা একটি জুনোটিক রোগ।
এই রোগের বাহক বাদুড়। এটি বাদুর থেকে এই রোগ মানুষে ছড়ায়। বাদুরের মুখের লালা-বা মলমূত্র খেজুরের রস বা তালের রসে এবং আধা খাওয়া ফল ইত্যাদির মাধ্যমে নিপা ভাইরাস ছড়াতে পারে। এই রোগের প্রধান লক্ষণ সমূহ হলো- জ্বরসহ মাথাব্যাথা, খিঁচুনি, অজ্ঞান হওয়া, মানসিক অবস্থান পরিবর্তন (আবোল-তাবল বলা বা ভুল বলা)। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট হয়।
মানুষের মধ্যে এই সংক্রমণ প্রথম শনাক্ত হয় মালয়েশিয়ায় ১৯৯৮ সালে। বাংলাদেশে ২০০১ সাল থেকে প্রায় প্রতি বছর রোগের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশে এই রোগে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর হার শতকরা প্রায় ৭২ ভাগের বেশি।
বাংলাদেশে নিপা ভাইরাসের বিস্তার এবং ঝুঁকি নিরুপণের জন্য মহাখালী রোগততত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) আইসিডিডিআর,বি ২০০৬ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে দেশের ১৬টি সরকারি হাসপাতালে সার্ভিলেন্স কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
বাংলাদেশে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৩৪৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। যার মধ্যে ২৪৯ জন রোগী মারা গেছেন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত সব রোগী মারা গেছেন।
বাংলাদেশে শীত মৌসুমে ডিসেম্বর থেকে শুরু করে এপ্রিল মাস পর্যন্ত এ রোগের প্রাদুভাব দেখায়। সাধারণত খেজুরের কাঁচারস পানের মাধ্যমে এই ভাইরাস সংক্রমিত হয়। তবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো গ্রীষ্মকালে একজন নিপা রোগী শনাক্ত হয়েছে। আইইডিসিআরে নিপা ভাইরাস শনাক্ত করার জন্য আধুনিক ল্যাবরেটরির সুবিধা রয়েছে।
বিষেষজ্ঞরা বলেছেন, শীতের সময় খেজুরের কাঁচারসের মাধ্যমে মানবদেহে নিপা ভাইারাস সংক্রমিত হতে পারে। নিপা আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হার শতকরা ৭২ ভাগ। এরমধ্যে যারা বেঁচে থাকেন তাদের শরীরের তারা প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জীবনযাপন করতে হয়।
নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানো সর্বোপরি খেজুরের কাঁচারস না খাওয়ার জন্য জণগণকে উদ্বুদ্ধ করতে বলা হয়েছে।