image
ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

ভাঙ্গুড়ায় অবহেলায় হিন্দুদের শ্মশান

প্রতিনিধি, ভাঙ্গুড়া (পাবনা)

পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার দিয়ারপাড়া এলাকায় ডোম, মুচি ও মেথর গোত্রভুক্ত নিম্ন বর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য নির্ধারিত শ্মশানটি দীর্ঘদিন ধরে চরম অবহেলা ও জাতিভিত্তিক বৈষম্যের শিকার হয়ে আছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের বাধার কারণে তারা কেন্দ্রীয় শ্মশানে মরদেহ দাহের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে একই ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুর পরেও মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।

সরেজমিন দেখা যায়, দিয়ারপাড়া এলাকার শ্মশানটি দীর্ঘদিন ধরে অযত্নে পড়ে রয়েছে। শ্মশানের চারপাশে কোনো বাউন্ডারি ওয়াল নেই, নেই স্থায়ী দাহস্থল কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থা। দাহস্থলজুড়ে ঝোপঝাড় ও আবর্জনা জমে আছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, দাহকাজ শেষে মরদেহের অবশিষ্টাংশ কিংবা মাটিচাপা দেয়া অংশ অনেক সময় কুকুর ও শেয়ালে টেনে নিয়ে যায়। এতে মৃতের স্বজনদের চরম মানসিক যন্ত্রণা ও অপমানের মধ্য দিয়ে শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে হয়।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলো জানান, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা সামাজিক অবহেলা, পেশাগত বৈষম্য ও দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করে আসছেন। জীবিত অবস্থায় নানা কষ্ট সহ্য করলেও মৃত্যুর পর অন্তত সম্মানজনক ও নিরাপদ শেষকৃত্যের প্রত্যাশা করেন তারা। কিন্তু বাস্তবে সেই ন্যূনতম মানবিক অধিকারও নিশ্চিত হচ্ছে না।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, উচ্চবর্ণের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি সামাজিক ক্ষমতা ও প্রভাব খাটিয়ে ডোম, মুচি ও মেথর গোত্রভুক্ত হিন্দুদের শ্মশান ব্যবহারে বাধা দিয়ে আসছেন। একই সঙ্গে শ্মশান উন্নয়ন কার্যক্রমেও তারা নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ২০১৯-২০ অর্থবছরে নি¤œবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের আবেদনের পর সরকারিভাবে শ্মশান উন্নয়নের জন্য প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ওই অর্থ দিয়ে বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের কথা থাকলেও বাস্তবে কোনো কাজই হয়নি। বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার না করে একটি মহল তা আত্মসাৎ করেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগী মতিলাল দাস বলেন, একই ধর্মের মানুষ হয়েও আমাদের মরদেহ উচ্চবর্ণের শ্মশানে নিতে দেওয়া হয় না। বাধ্য হয়ে এই অনিরাপদ শ্মশানেই দাহ করতে হয়, যেখানে ন্যূনতম পরিবেশ নেই।

স্থানীয় বাসিন্দা ঝন্টু দাস জানান, শ্মশানটি বহু বছর ধরে এমন অবস্থায় পড়ে আছে। বর্ষাকালে কাদা-পানিতে দাহকাজ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। উন্নয়নের জন্য টাকা বরাদ্দের কথা শুনলেও কোনো কাজ চোখে পড়েনি।

আরেক ভুক্তভোগী শুটকা দাস বলেন, জীবনভর অবহেলা সহ্য করেছি। মৃত্যুর পর অন্তত সম্মান পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখানেও আমাদের সঙ্গে বৈষম্য করা হচ্ছে। প্রশাসনের কাছে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাই।

নি¤œবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের শ্মশান কমিটির সভাপতি রঞ্জন দাস বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমরা অবহেলার মধ্যে আছি। শ্মশানে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। দাহের পর মরদেহের অবশিষ্টাংশ পশুতে টেনে নিয়ে যায়। জীবিত অবস্থায় বৈষম্য সহ্য করলেও মৃত্যুর পর অন্তত মরদেহের সম্মান চাই।

শ্মশানের সাধারণ সম্পাদক মানিক দাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা ডোম, মুচি ও মেথর মানুষ সমাজের অবহেলিত পেশায় কাজ করে জীবন চালাই।

জীবিত অবস্থায় অবহেলা সহ্য করেই বেঁচে আছি। কিন্তু মৃত্যুর পরেও যদি মরদেহের মর্যাদা না থাকে, তাহলে রাষ্ট্র ও সমাজ কিসের জন্য?

অভিযোগের বিষয়ে ভাঙ্গুড়া কেন্দ্রীয় শ্মশানের সভাপতি সংগীত কুমার পাল বলেন, মরদেহ দাহে বাধা দেওয়া হয়—এমন অভিযোগ সঠিক নয়। আর ২০১৯-২০ অর্থবছরের বরাদ্দের বিষয়ে আমার কোনো তথ্য জানা নেই।

এ বিষয়ে ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপস পাল বলেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।

অনিয়ম বা বৈষম্যের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

» বাগেরহাটে নির্বাচনে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা শহরতলী থেকে ককটেল উদ্ধার

সম্প্রতি