image

কুড়িগ্রামে জাপার ঘাঁটিতে জামায়াতের জয়-জয়কার

প্রতিনিধি, কুড়িগ্রাম

কুড়িগ্রামে ৪টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ৩টিতে জামায়াতে ইসলামী এবং অপরটিতে তাদের জোট-সমর্থিত ১১-দলীয় জোটের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী বিজয় লাভ করেছেন। জাপার ঘাঁটি বলে বিবেচিত এই ৪টি আসনেই বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের চরম ভরাডুবি হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে ঠেলাঠেলি, অবিশ্বাস ও কোন্দলের কারণেই এই ভরাডুবি। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের ফলাফলে নারী ভোটারদের উপস্থিতি এই পার্থক্য গড়ে তুলেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার অন্নপূর্ণা দেবনাথ স্বাক্ষরিত ফলাফল শীটে দেখা যায় এবারে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন কুড়িগ্রাম-২ আসন থেকে এনসিপির প্রার্থী মো. আতিকুর রহমান (ড. আতিক মোজাহিদ) তিনি ১ লক্ষ ৮০ হাজার ৫২৬ ভোট পেয়েছেন। ৪টি আসনে ২৮জন প্রার্থীর মধ্যে সবচেয়ে কম ভোট পেয়েছেন কুড়িগ্রাম-৪ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ থেকে শেখ মোহাম্মদ আব্দুল খালেক পেয়েছেন ২০১ ভোট। নির্বাচনে বেশি ভোটে জয়লাভ করেছেন কুড়িগ্রাম-৩ আসন থেকে জামায়াত প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী। তিনি বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী তাসভীর উল ইসলামকে ২৮ হাজার ৫৭৮ ভোটে পরাজিত করেছেন। এছাড়া কুড়িগ্রাম-২ ও কুড়িগ্রাম-৩ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মো. সাফিউর রহমান হাঁস প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দুটি আসনে যথাক্রমে ৩১৪ এবং ২৩৯ ভোট পেয়েছেন। দুটি আসন থেকে তার মোট প্রাপ্ত ভোট ৫৫৩টি।

সার্বিকভাবে ৪টি সংসদীয় আসনের মধ্যে মোট ২৮জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এরমধ্যে কুড়িগ্রাম-১ আসন থেকে ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এরমধ্যে জামায়াত প্রার্থী মো. আনোয়ারুল ইসলাম দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে ১ লক্ষ ৪১ হাজার ৯০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রার্থী বিএনপির সাইফুর রহমান রানা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১ লক্ষ ২৩ হাজার ৬৫ ভোট। জামায়াত প্রার্থী ১৮ হাজার ৬৫টি ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। এই আসনে জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৫০ হাজার ৭২৭ ভোট, বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. হারিসুল বারী হাত পাখা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৩৮ হাজার ৮০৭ ভোট, জাকের পার্টির আব্দুল হাই গোলাপ ফুল প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ২ হাজার ৯০৭ ভোট এবং গণঅধিকার পরিষদ প্রার্থী বিন ইয়ামীন মোল্লা জামায়াত প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সড়ে দাঁড়ালেও তিনি ট্রাক প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ২৩১ ভোট।

কুড়িগ্রাম-২ আসন থেকে ৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এরমধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থী মো. আতিকুর রহমান (ড. আতিক মোজাহিদ) শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে ১ লক্ষ ৮০ হাজার ৫২৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রার্থী বিএনপির সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১ লক্ষ ৭১ হাজার ৪০৫ ভোট। ড. আতিক মোজাহিদ ৯ হাজার ১২১ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। এই আসনে বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী নুর বখত হাত পাখা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ২৪ হাজার ৮২৯ ভোট, জাতীয় পার্টির প্রার্থী পনির উদ্দিন আহমেদ লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১৩ হাজার ৮৪৬ ভোট, নাগরিক ঐক্যের প্রার্থী মুহাম্মদ আব্দুস সালাম কেটলি প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১ হাজার ১শ ভোট, এবি পার্টির মো. নজরুল ইসলাম খান ঈগল প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৯০৪ ভোট, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির নুর মোহাম্মদ কাস্তে প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৬৫৭ ভোট এবং স্বতন্ত্রী প্রার্থী মো. সাফিউর রহমান হাঁস প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৩১৪ ভোট।

কুড়িগ্রাম-৩ আসন থেকে ৬জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এরমধ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে ১ লক্ষ ৭ হাজার ৯৩০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রার্থী বিএনপি’র তাসভীর উল ইসলাম ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৩৫২ ভোট। ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী ২৮ হাজার ৫৭৮ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। এই আসনে বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ডা. আক্কাছ আলী সরকার হাত পাখা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৫৭৮ ভোট, জাতীয় পার্টির প্রার্থী আব্দুস সোবহান লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ২ হাজার ১১২ভোট, গণঅধিকার পরিষদের সরকার মো. নুরে এরশাদ সিদ্দিকী শেষ মুহুর্তে নির্বাচন থেকে সড়ে দাঁড়ানোর কথা বললেও তার ট্রাক প্রতীকে ভোট পরেছে ৫৯৯টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. সাফিউর রহমান হাঁস প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ২৩৯ ভোট।

কুড়িগ্রাম-৪ আসন থেকে ৭জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এরমধ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. মোস্তাফিজুর রহমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে ১ লক্ষ ৮ হাজার ২১০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রার্থী বিএনপি’র মো. আজিজুর রহমান ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৮৪ হাজার ৪২৩ ভোট। মোস্তাফিজুর রহমান ২৩ হাজার ৭৮৭ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। এই আসনে সাবেক চিলমারী উপজেলা চেয়ারম্যান মো. রুকুনুজ্জামান স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বালতি প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ২০ হাজার ৯০২ ভোট, বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. হাফিজুর রহমান হাত পাখা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৬ হাজার ২৩১ ভোট, জাতীয় পার্টির প্রার্থী কে এম ফজলুল হক লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ২ হাজার ১৮০ভোট, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) পার্টির রাজু আহমেদ কাঁচি প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৩২০ ভোট এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ’র প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ আব্দুল খালেক মই প্রতীক নিয়ে সর্বনি¤œ ভোট পেয়েছেন ২০১টি।

নির্বাচনের শুরু থেকেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি কুড়িগ্রাম-১, কুড়িগ্রাম-২ ও কুড়িগ্রাম-৩ আসনে ইতিবাচক ফলাফল করবে বলে মনে করা হচ্ছিল। এছাড়াও কুড়িগ্রাম-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও সেখানে বিএনপি ভালো করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছিল। অপরদিকে কুড়িগ্রাম-১ আসনে জাতীয় পার্টির সাবেক ৫ বারের এমপি এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান ত্রিমূখী লড়াইয়ে এগিয়ে থাকবেন বলে মনে করা হলেও সব হিসেব নিকেশ পাল্টে দিয়েছে ভোটাররা। বিশেষ করে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কুড়িগ্রামে ৪টি আসনের মধ্যে ৩টি আসনে বিএনপি প্রার্থী পরাজিত হলেও কুড়িগ্রাম-২ আসনে বিজয়ী হবে বলে বিএনপি কর্মী-সমর্থকরা চ্যালেঞ্জ করলেও সাধারণ মানুষের ভোট সব হিসাবনিকাশ পাল্টে দিয়েছে। জাতীয় পার্টি ও আ’লীগের ঘাঁটি বলে বিবেচিত কুড়িগ্রামের ৪টি আসনেই মানুষ জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীকে তাদের সমর্থন জানিয়েছেন। এই ফলাফল নিয়ে অনেক চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ করা হলেও বিএনপির পরাজয়ের জন্য দলীয় কোন্দলকে দায়ি করা হচ্ছে। অপরদিকে নির্বাচনে ভোটারদের কাছে অন্য প্রার্থীদের মতো স্বাভাবিক পরিবেশ না পাওয়া এবং রক্তচক্ষু ও ভয়ভীতির কারণে জাতীয় পার্টির ভরাডুবি হয়েছে বলে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা দাবি করেছেন। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের পাশাপাশি ভালো ফলাফল করেছে বিএনপিও। তারা এর আগে এই আসনগুলো থেকে ব্যক্তিগতভাবে এত ভোট সংগ্রহ করতে পারেননি। সেদিক থেকে এখানে বিএনপির ভোটব্যাংকও বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন অপেক্ষা বিরোধী চেয়ারে বসে পিছিয়ে পরা কুড়িগ্রাম জেলার জন্য বিজয়ী জামায়াত ও এনসিপি সাংসদরা বিএনপি সরকারের কাছ থেকে কতটুকু সহায়তা পান এবং সেটি দিয়ে কতটুকুই বা উন্নয়ন করতে পারেন পিছিয়ে পড়া এই জেলাবাসীর জন্য।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

» বাগেরহাটে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় ৩৫ জন আহত, ২০ বসতবাড়ি ভাঙচুর

» ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয়টি আসনে ৫টিতে বিএনপি ও জোট, ১টিতে স্বতন্ত্র জয়ী

» কুমিল্লার ৮টি আসনেই বিএনপির চমক

» কেশবপুরে ৪৭ বছরেও হারানো আসন উদ্ধার করতে পারেনি বিএনপি

» খুলনায় ৪টিতে বিএনপি, দুটিতে জামায়াত বিজয়ী, হেভিওয়েট দুই প্রার্থীর পরাজয়

সম্প্রতি