দেশের ৫ জেলায় নির্বাচন পরবর্তী সংঘর্ষে অর্ধশত ব্যক্তি আহত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার, (১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) দুপুর পর্যন্ত ঝিনাইদহ, কিশোরগঞ্জ, মেহেরপুর, পটুয়াখালী ও দিনাজপুরে এসব ঘটনা ঘটে।
কিশোরগঞ্জ
শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে (নিকলী এবং বাজিতপুর উপজেলা) বিজয়ী প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান ও পরাজিত প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। বাজিতপুর উপজেলার হুমায়ুনপুর ইউনিয়নের হুমায়ুনপুর গ্রামের এ সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন। তাদের মধ্যে চারজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
শেখ মজিবুর রহমানের অনুসারী হিসেবে হুমায়ুনপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আ. রাশিদের পরিচিতি আছে। অন্যদিকে উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কাইয়ুম খান সৈয়দ এহসানুল হুদার সমর্থক। সকালে এই দুই নেতার অনুসারীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। বাজিতপুর থানার ওসি এস এম শহীদুল্লাহ জানান, সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। আহত চারজনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
মেহেরপুর
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় নির্বাচনী বিরোধের জেরে জামায়াতে ইসলামীর তিন কর্মীর ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। শুক্রবার সকালে উপজেলার জোড়পুকুরিয়া বাজারের একটি চায়ের দোকানে এ ঘটনা ঘটে। আহত ব্যক্তিরা হলেন জোড়পুকুরিয়া গ্রামের দুই ভাই উজ্জ্বল হোসেন (৩০) ও মাসুদ রানা (৪৫) এবং জুয়েল রানা (২৮)। উজ্জ্বলের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। অন্য দুইজন গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, সকালে ওই তিনজন জোড়পুকুরিয়া বাজারের একটি দোকানে চা পান করছিলেন। এ সময় স্থানীয় বিএনপি কর্মী মহিবুল, তার ছেলে রিপন, বেলু, সাহেবসহ কয়েকজন দেশি অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালান। পরে স্থানীয় লোকজন গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। আহত ব্যক্তিদের অভিযোগ, সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে মেহেরপুর-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নাজমুল হুদার পক্ষে কাজ করায় পরিকল্পিতভাবে তাদের ওপর এই হামলা চালানো হয়েছে।
গাংনী উপজেলা জামায়াতের মিডিয়া সেলের প্রধান মাহাবুব বলেন, সরকার গঠন নিয়ে নিশ্চিত হয়ে বিভিন্ন স্থানে তাদের নেতাকর্মীদের হুমকি দিচ্ছেন বিএনপি কর্মীরা। এ বিষয়ে গাংনী থানার ওসি উত্তম কুমার দাস বলেন, সহিংসতার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে।
মেহেরপুর-২
এ আসনে বিএনপি প্রার্থী আমজাদ হোসেনকে প্রায় ৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে জয়লাভ করেছেন জামায়াত জোটের প্রার্থী নাজমুল হুদা। এই জয়-পরাজয়কে কেন্দ্র করেই এলাকায় উভয় দলের কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ঝিনাইদহ
এ জেলায় ৫টি সহিংসতায় অন্তত ২৬ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্প, সমর্থকদের বাড়িঘর ও প্রেসক্লাবে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। শৈলকুপা, ঝিনাইদহ সদর, মহেশপুর ও কালীগঞ্জে এসব পাল্টাপাল্টি হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার ভাষ্য, শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে শৈলকুপা উপজেলার ত্রিবেনি ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামে বিএনপির নেতা মধু মোল্লা ও তপনের সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ১৩ জন আহত হন।
শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে কালীগঞ্জ শহরের নিমতলা বাসস্ট্যান্ডের বাজার রোডে ঝিনাইদহ-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলামের নির্বাচনী ক্যাম্পে হামলা পর ভাঙচুর করা হয়। এ সময় খোকন, ইভন ও জবেদ আলী নামের বিএনপির তিন নেতাকর্মীকে পিটিয়ে জখম করা হয়। তাদের মধ্যে জবেদকে যশোর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তিনি কালীগঞ্জ পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক।
একই সময়ে সদর উপজেলার নলডঙ্গা ইউনিয়নের ভিটশ্বর গ্রামে কাপ পিরিচ প্রতীকের সমর্থকদের ওপর হামলা ও বাড়িঘর ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ উঠেছে ধানের শীষের সমর্থকদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় পাঁচজন আহত হন। সকালে কালীগঞ্জ উপজেলার কোলা বাজারের খালকুলা গ্রামে ধানের শীষ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ধানের শীষের সমর্থক রবিউল শেখ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর (কাপ পিরিচ) সমর্থক মোশারেফ শেখ ও ইব্রাহিম শেখ আহত হয়।
সকালে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার চণ্ডিপুর বাজারে আবদুল কুদ্দুস নামের এক জামায়াতের কর্মীকে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এর আগে ঝিনাইদহের প্রেসক্লাব মহেশপুর কার্যালয় ভাঙচুর চালায় দুর্বৃত্তরা। এদিন রাত ৯টার দিকে উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ের পাশেই অবস্থিত প্রেসক্লাব মহেশপুর কার্যালয়ে এ হামলা চালানো হয়। ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) শেখ বিল্লাল হোসেন জানান, যেসব স্থানে সহিংসতার ঘটেছে, সেসব জায়গায় পুলিশ ও সেনাবাহিনী পরিদর্শন করে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে।
# পটুয়াখালী
এ জেলার বাউফল উপজেলায় নির্বাচন-পরবর্তী পাল্টাপাল্টি হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার সকাল সোয়া ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত কালাইয়া বন্দর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এছাড়া সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আয়নাবাজ কালাইয়া গ্রামে রমিজ দরজি (৪০) নামের এক বিএনপি কর্মীর বসতঘরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে জামায়াতের সমর্থকদের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার ভাষ্য, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেয়ায় সকালে কালাইয়া গ্রামে শাহ আলম (৪৬) নামের এক ব্যবসায়ীর ওপর হামলা চালায় স্থানীয় যুবদলের একাধিক কর্মী। পরে তারা সেলিম (৫২) নামের এক কাঠ ব্যবসায়ীকে মারধর করেন। এরপর তারা যান উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক গাজী গিয়াস উদ্দিনের। খবর পেয়ে সেখানে এসে জামায়াতের স্থানীয় কর্মী-সমর্থকরা একত্র হয়ে গিয়াস উদ্দিনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মালামাল লুটপাট করেন।
এদিকে শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে কনকদিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম বীরপাশা খায়েরবাজার এলাকায় আলমগীর গাজী (৫৫) ও শাহাবুদ্দিন সরদার (৪৮) নামের দুই বিএনপির কর্মীকে পিটিয়ে জখমের অভিযোগ উঠেছে জামায়াত সমর্থকদের বিরুদ্ধে।
এছাড়া দুপুর ১টার দিকে কেশবপুর ইউনিয়নের মমিনপুর গ্রামে মো. ফিরোজ (৫৫) নামের জামায়াতের এক সমর্থককে পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করার ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে জামায়াতের বিজয়ী প্রার্থী শফিকুল ইসলাম (মাসুদ) বলেন, তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি পছন্দ করেন না। তার কোনো কর্মী-সমর্থক হামলা ও মারামারির ঘটনায় জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। বাউফল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আতিকুল ইসলাম বলেন, কয়েকটি জায়গায় হামলা, ভাঙচুর ও মারধরের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে।
# দিনাজপুর
এ জেলার বিরামপুর উপজেলায় ভোট গণনাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে চারজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং জামায়াতের এক নেতার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। ভোটের দিন বিকেল ও শুক্রবার সকালে বৈদাহার ও ধানঘরা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি নেতা ইব্রাহিম আলী (বাবু) ও জামায়াত কর্মী মিজানুর রহমান আছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং দুজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভোট গণনা বিলম্বকে কেন্দ্র করে দুইপক্ষের মধ্যে প্রথমে বাগবিতণ্ডা, পরে সংঘর্ষ হয়। পৃথকভাবে আবার হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিরামপুর থানার ওসি সাইফুল ইসলাম সরকার বলেন, দুই দিনে উভয়পক্ষের হামলায় আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এখনও কোনো পক্ষ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।