নির্বাচনের পর কোথাও সম্প্রীতির আলিঙ্গন, কোথাও পুনর্গণনায় প্রশ্ন

জেলা বার্তা পরিবেশক, রাজশাহী

পোস্টার ছেঁড়া দেয়াল, মাইকের ঝড়, অভিযোগ প্রতিযোগিতার তপ্ত ভাষণ সবকিছুর শেষে রাজনীতির মঞ্চে দেখা গেল অন্য এক দৃশ্য। রাজশাহীর বিভিন্ন আসনে জয়-পরাজয়ের রেখা টানার পর প্রতিদ্বন্দ্বীরা হাত মেলালেন, কোলাকুলি করলেন, মিষ্টিমুখ করালেন। কোথাও বিজয়ে চলছে সম্প্রীতির আলিঙ্গন যেখানে রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে মানুষ কেবলই মানুষের হৃদয়ে আশ্রয় খুঁজছে। তপ্ত রোদে পুড়ে শীতল হওয়া মাটির মতো শান্ত সেই জনপদ। এই সৌহার্দের পাশাপাশি অপরদিকে ছিল অভিযোগ আর পুনর্গণনার আবেদনও। পরাজিত প্রার্থীদের আপত্তি, অনিয়মের অভিযোগ ও ফলাফল ঘিরে বিতর্ক মনে করিয়ে দেয় গণতন্ত্র শুধু উৎসব নয়, এটি জবাবদিহিরও পথ। আনন্দ ও সংশয়ের এই যুগল উপস্থিতিতেই রাজশাহীর নির্বাচনী অধ্যায় শেষ হলো; যেখানে একদিকে সম্প্রীতির আলিঙ্গন, অন্যদিকে ন্যায্যতার দাবিতে কড়া কণ্ঠ ।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই শেষে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এডভোকেট শফিকুল হক মিলন। তিনি শনিবার বেলা ১২টার দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে তার নিজ বাসায় সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় উভয়ে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করেন। সেইসঙ্গে তারা বেশ কিছুক্ষণ একসঙ্গে সময় কাটান এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এ সময়ে সংসদ সদস্য এডভোকেট শফিকুল হক মিলনকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান তিনি।

এ সময় উভয় নেতা একে অপরকে মিষ্টিমুখ করান এবং সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় করেন। স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা, পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে এ আসনে টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

এসময় জামায়াত নেতা অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, সংসদ সদস্য এডভোকেট শফিকুল হক মিলন তার ছোট ভাইয়ের মতো। দীর্ঘদিন তারা একসঙ্গে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন। নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকবেই। তিনি জনগণের রায়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাই রাজশাহী-৩ আসনের উন্নয়নে তিনি সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন।

বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এডভোকেট শফিকুল হক মিলন বলেন, নির্বাচন গণতন্ত্রের উৎসব। মতপার্থক্য থাকলেও সবার লক্ষ্য একটাই, জনগণের কল্যাণ। রাজশাহী-৩ আসনের উন্নয়নে সকলের মতামত ও সহযোগিতা নিয়ে কাজ করতে চান তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছে। জেলা ও মহানগরের আদলে রাজশাহী-৩ আসনের উন্নয়ন করা হবে। আবুল কালাম আজাদ দীর্ঘদিন হড়গ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। তারও কাজে অভিজ্ঞতা রয়েছে। এজন্য সবাইকে নিয়ে তিনি কাজ করতে চান। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এর নির্দেশনায় আগামী বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করবেন বলেও জানান তিনি।

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা এ ঘটনাকে ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। পবা উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘রাজনীতিতে সৌজন্য ও সহমর্মিতা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। এমন শুভেচ্ছা বিনিময় রাজনৈতিক সম্প্রীতির বার্তা বহন করে।’ এ সময়ে মোহনপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কাজিম উদ্দিন সরকার ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি মোজাদ্দেদ জামানী সুমন।

অপরদিকে, রাজশাহী-৫ (দুর্গাপুর-পুঠিয়া) আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর মনোনয়নে সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডলকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-র দলীয় প্রার্থী মাওলানা মনজুর রহমান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন নির্বাচন মনিটরিং কমিটির প্রধান মুহাম্মদ নুরুজ্জামান লিটন।

শনিবার আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডলকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান দলের জেলা ও স্থানীয় নেতারা।

উল্যেখ্য, সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন জামায়াত নেতা মাওলানা মনজুর রহমান। অপরদিকে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল। যদিও এই আসনে বিএনপির আরও দুইজন প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তবু ভোটের ব্যবধানে জামায়াতে ইসলামীর দলীয় প্রার্থী মাওলানা মনজুর রহমানই ছিলেন নবনির্বাচিত এমপির নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী। ভোটের অনুপাতে বিএনপির ওই দুই বিদ্রোহী প্রার্থী তার ধারেকাছেও ছিলেন না।

জামায়াতে ইসলামীর দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন প্রসঙ্গে জানা যায়, প্রথমে জেলা জামায়াতের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি নুরুজ্জামান লিটনকে মনোনয়ন দেয়া হলেও পরবর্তীতে সাংগঠনিক কারণ ও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে প্রার্থী পরিবর্তন করে মাওলানা মনজুর রহমানকে চূড়ান্ত করা হয়।

ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর সময় আরও উপস্থিত ছিলেন জেলা জামায়াতের শুরা ও কর্মপরিষদ সদস্য হাফিজুর রহমান ও মাওলানা আহমদ উল্লাহ, পুঠিয়া উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি অধ্যক্ষ আব্দুল মান্নান, পুঠিয়া পৌর জামায়াতের আমির ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক, সেক্রেটারি আব্দুল আহাদ মন্টু, পুঠিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের আমির অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ও সেক্রেটারি অধ্যক্ষ জুবায়ের মাসুমসহ স্থানীয় নেতারা।

সৌজন্য সাক্ষাতে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা রোধ এবং এলাকার শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হলে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল এতে সম্মতি জানান। পাশাপাশি তিনি আগামী দিনে এলাকার উন্নয়ন, শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন, হানাহানির রাজনীতি পরিহার এবং সামাজিক-রাজনৈতিক বিভেদ দূর করে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে একসঙ্গে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এদিকে, রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) আসন থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন রাজশাহী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরদিন সকাল থেকেই তার চারঘাট উপজেলার শলুয়া ইউনিয়নের বাসভবনে ভিড় করেন দুই উপজেলার হাজারো সমর্থক। ফুলের তোড়া ও মালা দিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানান ধানের শীষ প্রতীকের কর্মী-সমর্থকরা। তবে এ আসনের নির্বাচনে একটি ভিন্নধর্মী দৃশ্য নজর কাড়ে সবার। পরাজিত প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর অধ্যক্ষ নাজমুল হক বিজয়ী প্রার্থী আবু সাঈদ চাঁদের গলায় মালা পরিয়ে দেন এবং মুখে মিষ্টি তুলে দেন। চারঘাট-বাঘার সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ এ ঘটনাকে ইতিবাচক ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির দৃষ্টান্ত হিসেবে মন্তব্য করেছেন। এ দৃশ্যের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার রাতে ফলাফল ঘোষণার পর শুক্রবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আবু সাঈদ চাঁদের বাসভবনে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। সমর্থকদের অনেকেই তাকে আলিঙ্গন করেন। একের পর এক ফুলের মালা ও শুভেচ্ছায় সিক্ত হন নবনির্বাচিত এই সংসদ সদস্য। এর আগে নির্বাচনী জনসভায় আবু সাঈদ চাঁদ বলেন, নির্বাচিত হলে তার দলে চাঁদাবাজ ও মাদকসেবীদের স্থান হবে না এবং তিনি এলাকায় উন্নয়নে কাজ করবেন। তিনি দাবি করেন, বিগত সরকারের আমলে ছয় বছর কারাভোগ করেছেন এবং দলের জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে ব্যক্তিগত ক্ষতিও স্বীকার করেছেন। দল-মত নির্বিশেষে সকলের সমর্থন চেয়ে তিনি এলাকার মানুষের সেবা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) ও রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে পরাজিত বিএনপির দুই প্রার্থী ভোট পুনরায় গণনার দাবিতে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেছেন। রাজশাহী-১ আসনের প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন শুক্রবার রাতে এবং রাজশাহী-৪ আসনের ডিএমডি জিয়াউর রহমান শনিবার এ আবেদন করেন।

ডিএমডি জিয়াউর রহমান আবেদনে লেখেন, নির্বাচনে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম, ভোট কারচুপি ও প্রশাসনের কিছু অংশ ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের বিতর্কিত ফলাফল ঘোষণা করা হয়। অভিযোগে তিনি পোস্টাল ব্যালটে ভোট গণনাসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে অনিয়মের কথা তুলে ধরেন।

এছাড়া ভোটারদের মধ্যে ভীতি প্রদর্শনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লাঠিচার্জ করে জখম করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। তিনি দাবি করেন, প্রিজাইডিং অফিসারকে বের করে দিয়ে মনগড়াভাবে ফলাফল তৈরি করে তা প্রকাশ করা হয়েছে।

অপরদিকে রাজশাহী-১ আসনের বিএনপির পরাজিত প্রার্থী শরীফ উদ্দীন লিখিত আবেদনে বলেছেন, নির্বাচনে প্রায় ৮ হাজার ভোট বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। এত বিপুল সংখ্যক ভোট বাতিল হওয়ার পেছনে কী কারণ ছিল তা আমাদের কাছে অস্বাভাবিক ও প্রশ্নবিদ্ধ।

ভোটের দিন কিছু কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসারদের ভূমিকা ছিল স্পষ্টত পক্ষপাতদুষ্ট। একই ইউনিয়ন বা এলাকার অন্যান্য কেন্দ্রে আমরা বিপুল ভোটে জয়ী হলেও কয়েকটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে অস্বাভাবিকভাবে ফলাফল পরিবর্তিত হয়েছে। এতে নির্বাচনী ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর সুস্পষ্ট আলামত রয়েছে।’ আবেদন দুটি পেয়ে পরবর্তী করণীয় বিষয়ে নির্দেশনা চেয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার রাতেই নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিবের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন।

উল্যেখ্য, রাজশাহী ১ আসন (তানোর গোদাগাড়ী) থেকে ১ হাজার ৮৮৪ ভোটে পরাজিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী শরীফ উদ্দীন। এখানে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। অপরদিকে রাজশাহী- ৪ (বাগমারা মোহনপুর) আসন ৫ হাজার ৭৬৫ ভোটে জামায়াত প্রার্থী ডা. আব্দুল বারীর কাছে পরাজিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী ডিএমডি জিয়াউর রহমান। রাজশাহীর বাকি চারটি আসনে বিএনপির প্রার্থীরা জয়ী ।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

» বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বাগেরহাট

» রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় হত্যা মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা

সম্প্রতি