নোয়াখালীর হাতিয়ার চানন্দী ইউনিয়নে এক গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগ ঘিরে দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগীর দাবি নির্বাচনে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ভোট দেয়ার জেরে তার ওপর হামলা ও যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছে। তবে অভিযুক্ত, প্রতিবেশী ও রাজনৈতিক পক্ষগুলোর বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। ফলে ঘটনাটি এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। নোয়াখালীর হাতিয়ায় শাপলা কলিতে ভোট দেয়ায় নির্যাতনের অভিযোগ করা নারীর নিরাপত্তায় বর্তমানে নোয়াখালী সরকারি ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে এখনো কোনো মামলা বা অভিযোগ দায়ের হয়নি। রোববার দুপুরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, হাসপাতালে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তায় একজন উপ-পরিদর্শক (এসআই) ও একজন সহকারী উপ-পরিদর্শকের (এএসআই) নেতৃত্বে সাত সদস্যের পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে এখনো কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। পেলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, উপ-পরিদর্শক (এসআই) সায়মার নেতৃত্বে একজন নারী এএসআই, দুইজন নারী কনস্টেবল ও তিনজন পুরুষ কনস্টেবল ভুক্তভোগীর পাশে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। এদিকে, এ ঘটনায় ১১ দলীয় জোট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ অভিযোগ করে বলেন, হাতিয়ায় একাধিক ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে এবং প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তিনি দ্রুত সেনাবাহিনী মোতায়েন ও অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানান। হাসপাতালে ওই নারীকে দেখতে এসে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবী করে এনসিপির ওই কেন্দ্রীয় নেতা হান্নান মাসউদ এমপি আরো জানান, প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে জাতির সামনে তুলে ধরা হোক। আমরা চাই প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করবে। তা নাহলে এর দায় দায়ীত্ব প্রশাসানকেই নিতে হবে। নোয়াখালী জেলা বিএনপির সদস্য আলা উদ্দিন জানান, ওই নারীকে দিয়ে মিথ্যা ধর্ষণের নাটক সাজিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচারের চেষ্টা করা হচ্ছে এবং এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি মহল বিএনপির মান সম্মান ক্ষুণœ করার চেষ্টা করছে। গুজবকারীদের চিহিৃত করে আইনের আওতায় আনারও দাবি জানান তিনি। হাতিয়া থেকে ধানের শীষ প্রতীকের বিএনপি প্রার্থী ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম দাবি করেন, খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ঘটনাটি সঠিক নয়। এটি একটি সাজানো ঘটনা। এদিকে গত শনিবার রাতে নোয়াখালী-৬, আসনে সংসদ সদস্য পদে বিজয়ী এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ ও নোয়াখালী-৪, আসনে দাঁড়িপাল্লার পরাজিত প্রার্থী জেলা জামায়াতের আমির ইসহাক খন্দকার ওই নারীকে হাসপাতালে দেখতে গেলে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ভুক্তভোগীর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন। এসময় ওই নারীকে দেখতে কেন্দ্রীয় নেতারা সোমবার, (১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) নোয়াখালী যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ভুক্তভোগীর সঙ্গে থাকা এনসিপির চানন্দি ইউনিয়ন ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রাণনাশের হুমকি পেয়ে ভুক্তভোগীর স্বামী হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপে পালিয়ে গেছে। তাকে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তিনি এলে মামলা দায়ের করবেন।নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ভুক্তভোগীকে আমরা পর্যাপ্ত চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু থানা বা কোর্ট থেকে কোনো নির্দেশনা না আসায় আমরা তার যেসব পরীক্ষা করা দরকার তা করতে পারছি না। উল্লেখ্য, হাতিয়ার চানন্দি ইউনিয়নের ৩২ বছর বয়সের ৩ সন্তানের জননী নলেরচর আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দা এক নারী দাবি করেন, নির্বাচনে শাপলা কলিতে ভোট দেওয়ায় গত শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাত ১১টায় স্থানীয় কয়েকজন যুবক তাকে ও তার স্বামীকে পিটিয়ে জখম করেন। এসময় তার স্বামীকে কক্ষে বেঁধে রেখে গোসলখানায় নিয়ে আবদুর রহমান নামে এক ব্যক্তি সহ আরো কয়েকজন ওই নারীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করেছেন।
পরে শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে তাকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। হাতিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার নুরুল আনোয়ার জানিয়েছেন, ঘটনাটি তদন্তাধীন। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না। পুলিশ জানিয়েছে, লিখিত অভিযোগ, মেডিকেল রিপোর্ট, সাক্ষ্য ও ঘটনার সময়কার তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন। জানান, ঘটনা তদন্ত পুলিশ নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে। প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি। এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে এখন সবার নজর তদন্তের ফলাফলের দিকে কারণ প্রমাণই বলবে, এটি নির্বাচনি প্রতিশোধের ঘটনা, নাকি রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত এক প্রচারণা। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার দাবী জেলাবাসীর। ঘটনাটি নিয়ে ওই এলাকাসহ দেশজুড়ে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল বলছে,অভিযোগের সত্যতা নিরূপণে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। নোয়াখালীর পুলিশ সুপার টিএম মোশারেফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।