মতুর্জা আলী ও শামিম মিয়া দুজনই কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফুলছড়ি রেঞ্জের নাপিতখালী বনবিট ও চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়নের মেদাকচ্ছপিয়া বনবিটে কর্মরত রয়েছেন।
অভিযোগ উঠেছে, বন প্রহরী এই দুব্যক্তি (স্বঘোষিত) অতিরিক্ত পালন করছেন বিট কর্মকর্তার দায়িত্ব। তাদের দুজনের বিরুদ্ধে গাছ আটকের পর তা বিক্রি করে দেয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সুযোগে তারা এসব অপকর্ম চালিয়েছেন। তাদের ভূমিকা এ যেন রক্ষক-ই ভক্ষক। সম্প্রতি এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধানে নেমে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি বিকেলে চকরিয়া উপজেলার মেদাকচ্ছপিয়া গর্জনতলী গ্রাম এলাকায় গাছ কেটে দুর্বৃত্তরা পাচারের উদ্দেশ্য মজুত করে। বিষয়টি বিট কর্মকর্তা মুবিনুর রহমানকে জানানো হলে তিনি দ্রুত সময়ে বনপ্রহরী শামিম মিয়াকে ঘটনাস্থলে পাটান। একপর্যায়ে শামিম মিয়া তার নির্ধারিত (লাইন) দেয়া গাছ হওয়ায় ২/১ টুকরা রেখে বাকিগুলো ছাড় দেয়।
স্থানীয় কাঠ চোর চক্রের সদস্য ছৈয়দ ড্রাইভারের সঙ্গে শামিম মিয়া গাছ কেটে পাচারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে। রহস্যময় ব্যাপার হলো এতগুলো গাছ আটকের পরও সেদিন তা জানানো হয়নি ফুলছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তাকে। পরে সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারেন রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. কুদ্দুসুর রহমান। এভাবে গাছ জব্দের পর তা দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলেও জানান রেঞ্জ কর্মকর্তা।
একই সঙ্গে শামিম মিয়া মেদাকচ্ছপিয়া এলাকায় নতুন বসতি নির্মাণে সহযোগিতা করে আসছেন। সম্প্রতি সময়ে খুটাখালী ইউনিয়নের শান্তি বাজার এলাকার কবির আহমদের ছেলে প্রবাসী ফিরোজের পাকা ঘর তুলতে নিয়েছেন মোটা অংকের টাকা। ফিরোজ স্থানীয় মেম্বার ছৈয়দ হোছাইনের ভাগনি জামাতা। বর্তমানে কাজ চলছে ঐ মেম্বারের নেতৃত্বে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় সময় গাছ জব্দ করার পর নিজের সুবিধামতো সময়ে গাছ বিক্রি করেন বনপ্রহরী শামিম মিয়া। মেদাকচ্ছপিয়া বিট এলাকায় যা ওপেন সিক্রেট। এভাবে গত কয়েক মাসে লক্ষ টাকা হাতিয়েছেন বলেও দাবি স্থানীয়দের। পরে সাংবাদিকদের তৎপরতায় বন প্রহরী শামিম মিয়া নিজের অপকর্ম ঢাকতে কিছু কিছু বিট কার্যালয়ে নিয়ে রাখেন জব্দকৃত গাছ। যদিও এতসব অভিযোগের পরও নিজের অবস্থানে অনড় এই বনপ্রহরী। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি ছোট বিষয়গুলোকে বড় না করার অনুরোধ জানান।
একই অভিযোগ উঠেছে নাপিতখালী বিটের বনপ্রহরী মর্তুজা আলীর বিরুদ্ধে। বিট কর্মকর্তার দায়িত্ব হস্তান্তরের আগে দারুস সালাম মাদ্রাসার রোডে পাকা বিল্ডিং, ফকিরা বাজারের পশ্চিম পার্শ্বে পাহাড়ের টিলার মাটি কাটা, চ্যাম্পল বাগান রোডের মাথায় দোকান নির্মাণ, ফুটখালী থেকে রাতের আঁধারে বালি পাচার, সাহাব উদ্দিন মেম্বারের সামাজিক বনায়নের প্লট নামে পরিচিত এলাকায় মোটা অঙ্কের বিনিময়ে একাধিক ঘরবাড়ি তৈরি, হাকিম আলীর প্লটে ঘর নির্মাণ, নাপিতখালী অফিসের সামনে আরিফের বিল্ডিং নির্মাণ কাজে সরাসরি তিনি জড়িত রয়েছেন। তার এসব অপকর্মে স্থানীয় নুরুল হক প্রকাশ ডাম্পার নুরুল হকের জোগসাজশও রয়েছে।
এর আগে বনপ্রহরী মতুর্জা এক ব্যক্তির জিম্মায় বেশকিছু চোরাই গাছ রাখেন। সেই গাছ এখনও বন বিভাগ উদ্ধার করতে পারেনি। কীভাবে জিম্মায় দিলে বন বিভাগ গাছ উদ্ধারে ব্যর্থ হয় এবং কেন তার জিম্মায় জব্দকৃত গাছ রাখার প্রয়োজন পড়লো তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এভাবে একের পর এক অনিয়ম করে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন এই বনপ্রহরী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন প্রহরী মর্তুজার রাজশাহী জেলা শহরে রয়েছে আলিশান বাড়ি। জনশ্রুতি রয়েছে বনের টাকায় রাজবাড়ি। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মর্তুজা আলী বলেন, ত্রিশ বছর চাকরি জীবনে সবচেয়ে খারাপ পোস্টিং এ আছি। স্টেশন ছাড়া চাকরি করিনি। এখন বাড়ি থেকে টাকা এনে চলি। পাকা ঘর নির্মাণ, গাছ পাচার ও বালু পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করা হলে স্বশরীরে দেখা করার কথা বলে ফোন কেটে দেন। এ বন প্রহরীর বিরুদ্ধে চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী বিট কাম চেক স্টেশনে থাকা অবস্থায় রিজার্ভের সেগুন গাছ বিক্রিরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ওও বিটে কর্মরত থাকা অবস্থায় অনিয়মের কারণে বদলি হন।
দুই বনপ্রহরীর বিষয়ে ফুলছড়ি রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কুদ্দুসুর রহমান বলেন, এমন কিছু অভিযোগ আমার কাছেও এসেছে। কর্মস্থলে নতুন যোগদান করায় স্টাফদের নিয়ন্ত্রণে আনতে একটু সময় লাগছে।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মারুফ হোসেন বলেন, বিষয়গুলো জানা ছিল না। তবে তাদের বিরুদ্ধে যেহেতু অভিযোগ এসেছে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।