image
রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ): বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলায় পানি নষ্ট হয়ে গেছে -সংবাদ

দখল-দূষণে বিপর্যস্ত শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী, বিপর্যস্ত জনজীবন

সংবাদদাতা, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)

নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার পাশ দিয়ে প্রবাহিত শীতলক্ষ্যা নদী ও বালু নদী দিন দিন মারাত্মক দূষণের কবলে পড়ছে। শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, ট্যানারি ও ডাইং কারখানার রাসায়নিক পদার্থ, অবৈধ পয়ঃনিষ্কাশন লাইন এবং প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন কঠিন বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলার ফলে দুই নদীর পানির গুণগত মান ভয়াবহভাবে অবনতি ঘটেছে। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে নদী দুটি কার্যত প্রাণহীন জলধারায় পরিণত হবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শীতলক্ষ্যার বিভিন্ন অংশে পানির রং কালচে হয়ে গেছে এবং তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। নদীর তীরে জমে থাকা বর্জ্যের স্তূপ থেকে নির্গত দুর্গন্ধে আশপাশের পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছে। একই চিত্র বালু নদীতেও লক্ষ্য করা গেছে। কোথাও কোথাও পানির উপরিভাগে তেলের আস্তরণ ভেসে থাকতে দেখা যায়। শিল্পাঞ্চল সংলগ্ন এলাকায় দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার জেলেরা জানান, আগের মতো মাছ আর পাওয়া যায় না। একসময় শীতলক্ষ্যায় দেশি প্রজাতির নানা মাছ মিললেও এখন তা প্রায় বিলুপ্তির পথে। তাদের ভাষ্য, পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় মাছ টিকে থাকতে পারছে না। বালু নদীর তীরবর্তী বাসিন্দারাও একই অভিযোগ করেন। বর্ষা ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময় পানির প্রবাহ কম থাকায় দূষণের প্রভাব আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পকারখানায় ইটিপি (ঊভভষঁবহঃ ঞৎবধঃসবহঃ চষধহঃ) স্থাপন বাধ্যতামূলক হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা নিয়মিত চালু রাখা হয় না। ফলে অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়ে মিশছে। নদীর তীর দখল ও অবৈধ স্থাপনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, দূষিত নদীর পানি কৃষিকাজে ব্যবহার করলে মাটি ও ফসলেও ক্ষতিকর উপাদান জমা হতে পারে। এছাড়া নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারীদের মধ্যে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট ও পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। অনেকেই দৈনন্দিন কাজে নদীর পানি ব্যবহার করায় স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা বলছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেই হবে না; প্রয়োজন নিয়মিত মনিটরিং, কঠোর নজরদারি এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ। নদী রক্ষায় প্রশাসন, শিল্পমালিক ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। একই সঙ্গে অবৈধ পয়ঃনিষ্কাশন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ইটিপি চালু রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নদীর পানির মান পর্যবেক্ষণেও বিশেষ টিম কাজ করছে বলে দাবি তাদের। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কঠোর বাস্তবায়ন ছাড়া এই সংকট নিরসন সম্ভব নয়। শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী শুধু জলধারা নয়Ñএগুলো দেশের পরিবেশ, অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো এই নদীগুলোকে শুধু ইতিহাসের পাতাতেই খুঁজে পাবে।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি