দীর্ঘদিন ধরে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েও কুষ্টিয়া শহর ও শহরতলীর মানুষ বালুবাহী ট্রাকের ধুলোদূষণ থেকে মুক্তি পাননি। শুষ্ক মৌসুমে প্রতিদিন শত শত বালুবাহী বড় ট্রাক ও ড্রাম ট্রাক চলাচলের কারণে ধুলোদূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এ জটিল সংকট থেকে কবে মুক্তি মিলবে—এ প্রশ্ন এখন শহরবাসীর। জানা গেছে, ড্রাম ট্রাক সংশ্লিষ্ট সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যাও কম নয়।
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা ও সদর উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা নদী থেকে উত্তোলিত বালি ড্রাম ট্রাক ও করিমনযোগে খোলা অবস্থায় পরিবহন করায় শহরজুড়ে চরম ধুলোদূষণ দেখা দিয়েছে। বালুবাহী অধিকাংশ গাড়িতে ত্রিপল ব্যবহার না করায় বাতাসে বালি উড়ে বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়কঘেঁষা এলাকা দিন-রাত ধুলায় ঢেকে যাচ্ছে। কুষ্টিয়ার বালি জেলার চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি যশোর, খুলনাসহ কয়েকটি জেলায় সরবরাহ করা হয়। লবণাক্ততার কারণে খুলনা বিভাগের কয়েকটি জেলার নির্মাণকাজে কুষ্টিয়ার পদ্মা নদীর বালির ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে।
ধুলোবালিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীরা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সকালবেলা ড্রাম ট্রাক চলাচলের সময় ধুলো মুখে ঢুকে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। শহরতলীর যুগিয়া এলাকার বাসিন্দারা জানান, সারাদিন বালুবাহী ভারী ট্রাক চলাচলের কারণে রাস্তার অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। ফলে শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে; এমনকি মুমূর্ষু রোগী পরিবহন করাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগে ভুগছেন।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. হোসেন ইমাম জানান, খোলা ট্রাকে বালি পরিবহনের ফলে সৃষ্ট ধুলা এবং ত্রুটিপূর্ণ গাড়ির কালো ধোঁয়া মানুষের শ্বাসতন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, ফুসফুসের রোগ, এমনকি ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তার মতে, এসব দূষিত কণা রক্তের মাধ্যমে লিভার, কিডনি ও প্রজননতন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে প্রভাব ফেলতে পারে, যা হেপাটাইটিস, কিডনি রোগ, বন্ধ্যত্ব ও গর্ভপাতের মতো জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি চোখের প্রদাহ ও দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কুষ্টিয়া কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক হাবিবুল বাসার জানান, বালু পরিবহনের বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০২২ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ড যৌথভাবে কাজ করছে, যাতে খোলা অবস্থায় বালি পরিবহন বন্ধ করা যায় এবং নিয়ম মেনে পরিবহন নিশ্চিত হয়।
ট্রাফিক পুলিশের এক ইন্সপেক্টর জানান, বালুবাহী ড্রাম ট্রাকগুলো বৈধভাবে রেজিস্ট্রেশনকৃত এবং বালু উত্তোলন সরকার অনুমোদিত টেন্ডারের মাধ্যমে হওয়ায় কাগজে-কলমে সরাসরি অবৈধ বলা কঠিন। তবে তিনি স্বীকার করেন, শহরের ভেতরে মালবাহী যানবাহনের চলাচলে সময়সীমা নির্ধারিত থাকলেও অনেকে নিয়ম ভেঙে খোলা ও অরক্ষিতভাবে বালি বহন করছে, যা আইনত দণ্ডনীয় এবং জনদুর্ভোগের অন্যতম কারণ।
সমাজসেবক ও কুষ্টিয়া আলাউদ্দিন আহমেদ টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষ শেখ মো. শাহিনুল আলম সংবাদ ডিজিটালকে বলেন, পুলিশ ও জেলা প্রশাসন চেষ্টা করছে বললেও বিভিন্ন ফোরাম, আইন-শৃঙ্খলা কমিটির বৈঠক এবং পত্রপত্রিকায় ধারাবাহিক লেখালেখির পরও বাস্তবে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। তার অভিযোগ, বিষয়টি অত্যন্ত জটিল না হলেও প্রশাসনের আন্তরিকতার ঘাটতি এবং অদৃশ্য প্রভাব বা উদাসীনতার কারণে খোলা ট্রাকে বালি পরিবহন বন্ধ হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ সড়কের দুপাশে প্রতিদিন যে পরিমাণ বালি ট্রাক থেকে উড়ে এসে জমা হয়, তার পরিমাণ কয়েক ট্রাকের সমান। অধ্যক্ষ শাহিনুল আলমের মতে, কুষ্টিয়ায় বালুবাহী ট্রাকের কারণে সৃষ্ট ধুলোদূষণ শুধু পরিবেশ নয়, জনস্বাস্থ্য ও সড়ক নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ জটিল সমস্যা থেকে দ্রুত মুক্তি পেতে কুষ্টিয়াবাসী কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়েছেন।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ইকবাল হোসেন জানিয়েছেন, বালুবাহী ট্রাকের কারণে শহরবাসীর দুর্ভোগ ও পরিবেশদূষণের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ে বৈঠক করে সুনির্দিষ্ট অভিযানের পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রতিটি বালুবাহী ড্রাম ট্রাকের রেজিস্ট্রেশন যাচাই করা হবে। অনিয়ম পেলে গাড়ির মালিকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং জনউপদ্রব সংক্রান্ত আইন প্রয়োগ করা হবে। অদূর ভবিষ্যতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নগর-মহানগর: বসন্তের আকাশ হঠাৎ অন্ধকার, মনে বিষণ্ণতার ছায়া
সারাদেশ: কুষ্টিয়ায় সড়কে ধুলোদূষণ, বাতাসে বিষ