image

চকরিয়ায় রোজা ঘিরে বাজারে বেড়েছে কাঁচামরিচ লেবু শসার অস্বাভাবিক দাম

প্রতিনিধি, চকরিয়া (কক্সবাজার)

মাহে রমজান শুরু হয়েছে বুধবার রাতে সেহরির মাধ্যমে। একদিন আগে মঙ্গলবারও কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে কাঁচা মরিচ লেবু শসাসহ রকমারি সবজি এবং নিত্যপণ্যের বাজার অনেকটা স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু গত বুধবার সকালে পাল্টে গেছে বাজারের চিত্র। দিগুণ দাম বেড়েছে ইফতারির অন্যতম অনুষঙ্গ কাঁচা মরিচ লেবু শসার। একইসঙ্গে মাছ সবজির বাজারেও বেড়েছে দাম।

রোজার মাসে প্রতিটি পরিবারে খরচ এমনিতেই বেশি থাকে, তার ওপর মাছ সবজি ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাবার কারণে ক্রেতা সাধারণ প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রোজার সেহরি ইফতার উপলক্ষে পরিবারের জন্য মাছ মাংস, সবজি ও নিত্যপণ্যের মালামাল সওদা করতে উপজেলা সদরের সোসাইটি বাজারসহ বিভিন্ন হাটবাজারে ক্রেতা সাধারণের ব্যাপক সমাগম ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে প্রতিটি বাজারের মজুদ পন্য বিক্রি বেড়ে যায়। আর তাতে কতিপয় ব্যবসায়ীরা কাচামাল ও নিত্যপন্য বিক্রিতে গলাকাটা বাণিজ্য শুরু করে দেন।

এভাবে মাত্র একদিনের ব্যবধানে বাজারে কাঁচামাল ও নিত্যপণ্যের দোকানে বেড়েছে দ্রব্যমূল্য। অনেক পণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। আবার সবজির দাম বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। এতে দাম নিয়ে চরম ভোগান্তি ও বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।

বুধবার বিকালে চকরিয়া উপজেলা সদরের সোসাইটি কাঁচা বাজারে একটি দেশীয় কাগজি লেবু বিক্রি করা হয় ২০ টাকা দামে, শসার দামও সেঞ্চুরি হাকিয়েছে। তবে হাইব্রিড জাতের শসা কেজি ৮৫-৯০ টাকা দামে বিক্রি করছে দোকানীরা।

প্রতিবছরই পবিত্র রমজান মাসে উপজেলা বেশিরভাগ হাটবাজারে নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দ্রব্যমূল্যের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে ক্রেতাদের অধিক চাহিদা এবং বাজারে পণ্যের জোগান কম থাকাকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

বুধবার সকাল থেকে রাত অবধি চকরিয়া উপজেলা সদরের বাণিজ্যিক জনপদ চিরিঙ্গা সোসাইটি এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে মানুষের ঢল নামে। বিশেষ করে মুদি ও সবজির দোকানে ছিল অতিরিক্ত ভিড়। ক্রেতা সাধারণ আগেভাগেই ইফতার ও সেহরির সামগ্রী সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

রমজান ঘিরে পরিবারের জন্য সারা মাসের বাজার এক দিনেই করতে এসেছেন অনেক ক্রেতা। যার ফলে বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি এবং যোগান কমায় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চকরিয়া পৌরশহরের মুদি দোকান ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে খেজুর মানভেদে প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছোলা ৮৫ থেকে ৯৫ টাকা, বেসন ৯৫ টাকা, মুড়ি ৭০ টাকা, সয়াবিন তেল ১৯৬ টাকা, চিনি ১১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। যা গত বছরের তুলনায় খুব একটা বেশি বাড়েনি বলে জানাচ্ছেন ক্রেতারা।

এদিকে প্রকারভেদে একটি দেশীয় কলা ১৫ থেকে ২০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। সবজির বাজারেও একই অবস্থা। কয়েক দিনের ব্যবধানে বেশকিছু সবজির দাম বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। সপ্তাহ আগেও শসা ছিল ৫০ টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ১২০ টাকা। বেগুন ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৬০ টাকা, টমেটো ৪০ টাকা থেকে ৬০ টাকা, একজোড়া লেবু ২০ টাকা থেকে বেড়ে ৪০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। পেঁয়াজ ৫০ টাকা থেকে ৬০ টাকা, রসুন ১৮০ টাকা এবং কাঁচা মরিচ ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১২০- টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

সোসাইটি কাঁচা বাজারে যেকোনো জাতের এক কেজি মাছ বুধবার বিক্রি করা হয়েছে ১ হাজার টাকার উপরে। দেশীয় কোরাল মাছ বিক্রি করা হচ্ছে ছোট সাইজের ৮০০ টাকা, বড় সাইজের ১ হাজার থেকে ১২ শত টাকা দামে। এক কেজি দেশীয় বাটা মাছ ৮০০ টাকা, দাতিনা মাছ ৭০০ টাকা, গলদা চিংড়ি ১১ শত টাকা, বাগদা চিংড়ি ৮৫০-৯০০ টাকা দামে। একইভাবে সামুদ্রিক মাছ ইলিশ, রুপচাঁদা মাছ বিক্রি হচ্ছে ক্রেতা সাধারণের নাগালের বাইরে।

রমজান মাস আগমনে হঠাৎ করে কাঁচা বাজারের দ্রব্যমূল্য এমন অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে ক্রেতাদের মাঝে দেখা গেছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। হঠাৎ পন্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ক্রেতারা। আবার অনেকে পণ্যের দাম আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় একদিনেই পুরো মাসের বাজার করে নিচ্ছেন।

দোকানিরা বলছেন, রমজানকে ঘিরে পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং সরবরাহ কিছুটা কম থাকায় দাম বেড়েছে। তাদের দাবি, পাইকারি বাজারেই পণ্যের দাম বেশি থাকায় খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়ছে। এছাড়া পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভর পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিও বাজার অস্থিরতার কারণ বলে জানান তারা।

অন্যদিকে ক্রেতারা বলছেন, হঠাৎ করেই মাছ ও সবজির দাম বেড়ে যাওয়ায় অল্প আয়ের পরিবার গুলোর জন্য রমজানের বাজার সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

চকরিয়া উপজেলা ভোক্তা অধিকার পরিষদের সভাপতি সাংবাদিক মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, রমজান মাসে চাহিদা বাড়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী চক্র অতিরিক্ত লাভের আশায় মাছ সবজি থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের প্রতিটি আইটেমের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এই প্রবণতা দীর্ঘ সময় ধরে চলছে।

তিনি বলেন, শুধু রমজান মাস না, বছরে বারোমাস নিত্যপন্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে একটি শৃঙ্খলা প্রয়োজন। সেইজন্য আমরা চকরিয়া উপজেলা প্রশাসন এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

সোসাইটি কাঁচা বাজারের সবজি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ বাদশা মিয়া বলেন, রমজানের আগে সবজির দাম তুলনামূলক কম থাকায় বিক্রি ভালো ছিল। কিন্তু রোজা উপলক্ষে বাজারে সবজির দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন বিক্রি কমে গেছে। আগে কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি করা হলেও বর্তমানে তা ১২০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে পণ্য কিনতে হওয়ায় বাধ্য হয়ে খুচরা বাজারেও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। পণ্যের দাম কম থাকলে ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ে এবং বিক্রিও ভালো হয়।

চকরিয়া কিচেন মার্কেটের পাইকারী আড়তদার ফরিদুল আলম সওদাগর বলেন, রমজানকে কেন্দ্র করে বাজারে সবজির চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেকগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে কাঁচা মরিচ, শসা, টমেটো, বেগুন ও লেবুর চাহিদা বেশি থাকায় পাইকারি বাজারেই দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের সবজি মোকাম থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। আমরা বেশি দামে কিনলে স্বাভাবিকভাবেই খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছেও বেশি দামে বিক্রি করতে হয়।

মুদি দোকানি চকরিয়া বিমানবন্দর রোড ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি মো. নুরুল আবছার বলেন, রমজান উপলক্ষে মুদি দোকানের পণ্যের দাম খুব একটা বাড়েনি। গতবছর রমজান মাসের তুলনায় এ বছর পণ্যের দাম বরং কিছুটা কম। গত বছর ছোলা ১১০ টাকা কেজি বিক্রি হলেও এ বছর বিক্রি হচ্ছে ৮৫-৯৫ টাকা কেজি। গত বছর চিনি ১৩০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে এ বছর ১১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

কাঁচামাল আড়ৎ সমিতির নেতা চকরিয়া পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর এম নুরুস শফি বলেন, রমজান মাসে বাজারে সবজির চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু সেই অনুপাতে বাজারে পর্যাপ্ত সবজির যোগান নেই। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং পাইকারি পর্যায়ে সরবরাহ সংকটের কারণে বাজারে পণ্যের চাপ তৈরি হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা ইচ্ছাকৃতভাবে দাম বাড়াই না। চাহিদা বেশি আর সরবরাহ কম থাকলে স্বাভাবিকভাবেই দামের ওপর প্রভাব পড়ে। তবে পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ নিশ্চিত হলে দামও ধীরে ধীরে কমে যাবে।

এবিষয়ে চকরিয়া উপজেলার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সহকারী কমিশনার রুপায়ন দেব বলেন, রমজান মাস উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বাজার মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। সবধরনের পন্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে আমরা সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অনুরোধ জানিয়েছি। এরপরও বাজারে পণ্যের সংকট তৈরি করে অস্থিরতা করলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

জনসাধারণের সুবিধার্থে নিয়মিত বাজার মনিটরিং অব্যাহত থাকবে। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অসাধু ব্যবসায়ীদের জেল-জরিমানা করা হবে।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

» আধুনিকতা ও প্রমিতকরণের দাপটে বিপন্ন উত্তরের লোকভাষা

সম্প্রতি