image

হেলিকপ্টারে চড়ে রাজনগরে চীনা কনে, সীমান্ত পেরিয়ে ভালোবাসার মিলনমেলা

প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল

মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার তারাপাশা টিকা পাড়া গ্রাম- সাধারণত শান্ত, নিরিবিলি। কিন্তু গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সেই গ্রামই পরিণত হয় উৎসবের জনপদে। আকাশে চক্কর দিতে থাকা একটি হেলিকপ্টার হঠাৎই কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। মুহূর্তের মধ্যে শত শত মানুষ ভিড় জমান। কারণ, সেই হেলিকপ্টারেই চড়ে বরের বাড়িতে আসছেন চীনের কনে।

চীনের সাংহাইয়ের বাসিন্দা ক্রিস হুই বাংলাদেশে এসেছেন রাজনগরের যুবক সুকান্ত সেনকে বিয়ে করতে। তারা প্রথমে বিমানযোগে ঢাকায় পৌঁছান। সেখান থেকে সরাসরি হেলিকপ্টারে করে নিজ গ্রাম তারাপাশা টিকা পাড়ায় কনেকে নিয়ে আসেন সুকান্ত। ব্যতিক্রমী এই আগমনে আত্মীয়স্বজনদের পাশাপাশি পুরো এলাকাতেই সৃষ্টি হয় আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও ব্যাপক কৌতূহল।

সুকান্ত সেন টিকরপাড়ার সেন বাড়ির প্রয়াত স্বপন কুমার সেন ও শিল্পী রানি সেনের ছেলে। ২০১৮ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি চীনে যান। সেখানে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করে চাকরিতে যোগ দেন। কয়েক বছর পর পরিচয় হয় ক্রিস হুইয়ের সঙ্গে। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে পারস্পরিক ভালো লাগা, বিশ্বাস ও বন্ধন। ২০২৩ সালে তারা একসঙ্গে ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে চীনে তাদের একটি কোম্পানি রয়েছে। দীর্ঘ সম্পর্কের পর ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি চীনে তাদের বিবাহের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়। এরপর পরিকল্পনা করা হয় বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক আয়োজনের। সেই পরিকল্পনারই অংশ হিসেবে হেলিকপ্টারে কনেকে বাড়িতে আনার আয়োজন।

সুকান্ত বলেন, “চীনে পড়াশোনা ও কাজের সময়ই আমাদের পরিচয়। ধীরে ধীরে সম্পর্ক গভীর হয়। আমরা একসঙ্গে ব্যবসা শুরু করি। বিয়ের রেজিস্ট্রেশন করার পর সিদ্ধান্ত নিই, দেশে গিয়ে পরিবার-পরিজন ও গ্রামের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে অনুষ্ঠান করব। কিছুটা ভিন্নতা আনতেই হেলিকপ্টারে আসার পরিকল্পনা করি। এতে আমার স্ত্রীও খুব আনন্দিত।”

বাংলাদেশে এসে নিজের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে ক্রিস হুই বলেন, “আজ আমার জীবনের একটি বিশেষ মুহূর্ত। আমি আমার স্বামীর সঙ্গে তার দেশে এসেছি। আমার মা-বাবা ও চাচাও সঙ্গে আছেন। এখানে এসে আমি খুবই উচ্ছ্বসিত। আমাদের ভালোবাসার গল্প অন্যদিন বলব।” বিদেশি কনেকে এক নজর দেখতে গ্রামের নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকেই মোবাইল ফোনে সেই মুহূর্ত ধারণ করেন। স্থানীয়রা জানান, তাদের এলাকায় এই প্রথম হেলিকপ্টার অবতরণ করেছে। ফলে ঘটনাটি স্বাভাবিকভাবেই সবার জন্য স্মরণীয় হয়ে উঠেছে।

বরের বাড়িতে ২১, ২২ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি তিন দিনব্যাপী বিয়ের আয়োজন রাখা হয়েছে। পুরো বাড়ি সাজানো হয়েছে বর্ণিল আলোকসজ্জা ও সাজসজ্জায়। আত্মীয়স্বজনদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও এই আয়োজন ঘিরে উচ্ছ্বসিত।

ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির দুই মানুষের মিলনে আয়োজিত এই বিয়ে যেন কেবল একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান নয়, বরং এক সামাজিক উৎসব। একদিকে বাঙালি ঐতিহ্য, অন্যদিকে চীনা সংস্কৃতির ছোঁয়া- সব মিলিয়ে রাজনগরের গ্রামটি এখন আন্তর্জাতিক আবহে মুখর।

বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা, প্রযুক্তি ও ব্যবসার প্রসারে দেশ-বিদেশের দূরত্ব কমে এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে সুকান্ত ও ক্রিসের সম্পর্ক এক নতুন প্রজন্মের বাস্তবতার প্রতিফলন। তাদের গল্প দেখিয়ে দেয়- ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা ভৌগোলিক সীমানা ভালোবাসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

রাজনগরের আকাশে ভেসে আসা সেই হেলিকপ্টার যেন শুধু এক কনেকেই নিয়ে আসেনি; নিয়ে এসেছে বিশ্বায়নের যুগে মানবিক সম্পর্কের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গ্রামবাসীর স্মৃতিতে এই দিনটি বহুদিন ধরে রয়ে যাবে—ভালোবাসা আর বৈচিত্র্যের এক অনন্য উদযাপন হিসেবে।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

» আধুনিকতা ও প্রমিতকরণের দাপটে বিপন্ন উত্তরের লোকভাষা

সম্প্রতি