‘বাহের দেশ’-এর ঐতিহ্য কি শুধুই অতীত?

আধুনিকতা ও প্রমিতকরণের দাপটে বিপন্ন উত্তরের লোকভাষা

প্রতিনিধি, গাইবান্ধা

উত্তরের জনপদ মানেই ‘বাহের দেশ’। ‘বাহে’ শব্দটি এই অঞ্চলের মানুষের পারস্পরিক সম্মান, স্নেহ ও আন্তরিকতার এক অনন্য প্রতীক। একসময় ‘মফিজ’, ‘হ্যামাক-তামাক’ বা ‘মোক’-এর মতো শব্দগুলোই ছিল রংপুর বিভাগের মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আধুনিকতা, নগরায়ণ ও তথ্যপ্রযুক্তির প্রবল দাপটে আজ জৌলুস হারাচ্ছে উত্তরাঞ্চলের এই সমৃদ্ধ আঞ্চলিক ভাষা। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে প্রমিত বাংলার চর্চা বাড়লেও, নিজের অজান্তেই শেকড়ের ভাষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের মানুষ।

ভাওয়াইয়া গানের সুর কিংবা গ্রামীণ যাত্রাপালায় এখন আর আগের মতো এই মাটির ভাষার দাপট দেখা যায় না। উল্টো, ‘স্মার্ট’ হওয়ার দৌড়ে নিজস্ব আঞ্চলিকতাকে অনেকেই এখন ‘ক্ষ্যাত’ বা সেকেলে মনে করছেন।

শেকড় থেকে দূরে তরুণ প্রজন্ম সময়ের পরিক্রমায় আঞ্চলিক ভাষার চর্চা কতটা কমেছে, তার বাস্তব চিত্র মেলে গাইবান্ধা ও রংপুরের তরুণদের মাঝে। গাইবান্ধা জেলা সদরের রামচন্দ্রপুর গ্রামের আঁখি আক্তার (ছদ্মনাম) ঢাকায় একটি বেসরকারি সংস্থায় ‘কমিউনিকেশন অফিসার’ পদে নিয়োগ সাক্ষাৎকারে নিজের আঞ্চলিক ভাষায় একটি বাক্যও সঠিকভাবে বলতে পারেননি। রংপুরের তরুণ প্রকৌশলী জামিলুর রহমানেরও একই অভিজ্ঞতা। শেকড়ের ভাষা আজ তাদের কাছেই যেন অচেনা। শুধু তরুণ প্রজন্ম নয়; কৃষক, শ্রমিক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও স্মার্টফোন আর সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে ‘স্ট্যান্ডার্ড’ হওয়ার প্রবণতা আঞ্চলিক স্বকীয়তাকে গ্রাস করছে।

বৈচিত্র্যময় উত্তরের রসবোধ ও ভাষার রূপ উত্তরের এই জনপদের ভাষা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও রসবোধ সম্পন্ন। জেলাভেদে এই ভাষার টান ও শব্দচয়নে চমৎকার ভিন্নতা রয়েছে:

রংপুর: এখানকার ভাষায় আন্তরিকতার ছোঁয়া প্রবল। যেমন, প্রমিত বাংলায় যাকে বলা হয়-“এক ব্যক্তির দুটি পুত্র ছিল। ছোট ছেলে তার বাবাকে বলল, বাবা আমাকে আমার টাকার ভাগ দাও। ওই কথায় তিনি তাদের মধ্যে সব ভাগ করে দিলেন।” রংপুরের আঞ্চলিকতায় তা হয়ে যায়- “একনা মাইনসের দুই কনা ব্যাটা আছিন। তা ছোটকনা উয়ার বাপক কইল, বা মোগ পইসা কড়ির ভাগ দেও। ওই কতাতে তাঁয় উমার ঘরক সব বাটি দিল।”

কুড়িগ্রাম: জীবন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে এখানকার ভাষায়। বয়োজ্যেষ্ঠদের আক্ষেপের সুরে বলতে শোনা যায়- “আগাত আছিনু মল্লেও মাও, এ্যালা গবর ফ্যালাও আর ভাত খাও” (অর্থাৎ, আগে খুব আদরের ছিলাম, এখন কদর কমেছে)।

গাইবান্ধা: এখানকার ভাষায় রয়েছে কাব্যিক প্রেমের নিবেদন ও ভৌগোলিক ভিন্নতা। যেমন-“যেদিন মুই তোমাক পথম দেকচোম, সেইদিন থাইকাই মুই তোমাক ভালোবেসি ফেলাচোম...”। উন্নয়ন গবেষক ও সমাজ সংগঠক এম. আবদুস সালাম জানান, গাইবান্ধায় ভাষাগত দুটি রূপ আছে। সমতলে ছেলে সন্তানকে ‘ব্যাটা ছাওয়া’, রাস্তাকে ‘ঘাটা’ এবং কেমন আছেন বোঝাতে ‘ক্যাংকা আছেন বাহে?’ বলা হয়। অন্যদিকে চরাঞ্চলের মানুষ কোথায় যাবেন বোঝাতে বলেন ‘কোনে যাইবা’।

লালমনিরহাট: এখানকার বাসিন্দা মোস্তাফিজার রহমান সাজু মিয়ার মতে, লালমনিরহাটে ধ্বনিতাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণে ‘ল’ ধ্বনিটি ‘ন’ হিসেবে উচ্চারিত হওয়ার প্রবণতা বেশি (যেমন: লাল-নাল, লাউ-নাউ)। প্রচলিত বাক্যে শোনা যায়- “দেওয়ানীর ব্যাটা হটো তো অমপুর যাই, হামার একনা মোকদ্দমা আছে।”

শিক্ষাবিদ ও লেখক মাজহারউল মান্নানের মতে, আঞ্চলিক ভাষা বিলুপ্তির পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। কর্মসংস্থান ও স্থানান্তর এর মধ্যে অন্যতম; মানুষ কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ায় প্রমিত ভাষা শিখতে বাধ্য হচ্ছেন। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রভাব ও বন্ধুদের চাপে তরুণরা আঞ্চলিক ভাষা এড়িয়ে চলছেন। অনেক ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বললে চাকরির মৌখিক পরীক্ষাতেও বাদ পড়ার ঝুঁকি থাকে। সেই সাথে আঞ্চলিক ভাষায় লেখালেখি ও প্রকাশনা কমে যাওয়ায় এর যথাযথ সংরক্ষণ হচ্ছে না।

হুমকির মুখে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাও শুধু বাংলা আঞ্চলিক ভাষাই নয়, বিপন্ন হয়ে পড়েছে এই অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাও। সাঁওতাল আদিবাসী নেতা বার্নাবাস টুডু আক্ষেপ করে বলেন, “পাঠ্যবই বা চর্চা কেন্দ্র না থাকায় নতুন প্রজন্মের সাঁওতাল শিশুরা তাদের নিজস্ব ভাষা ভুলতে বসেছে, যা অত্যন্ত শঙ্কার।”

ভাষার এই পরিবর্তন নিয়ে শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ জহুরুল কাইয়ুম বলেন, “ভাষার কথ্যরূপ পরিবর্তন হতে কমপক্ষে তিন দশক সময় লাগে। এ কারণেই আঞ্চলিক ভাষার প্রচলন আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে।” আরেক শিক্ষাবিদ ফখরুল আলম বেঞ্জুর মতে, “ভাষার পরিবর্তন স্বাভাবিক। কিন্তু ‘অমপুর’ (রংপুর) বা ‘অক্ত’ (রক্ত)-র মতো নিজস্ব উচ্চারণ হারিয়ে গেলে স্বকীয়তা নষ্ট হবে। আমরা স্ট্যান্ডার্ড বাংলা শিখব, কিন্তু শেকড় ভুলে নয়।”

গীতিকার কে এম সম্রাট মনে করেন, নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্যতা কমলেও গ্রামাঞ্চলে এখনো ভাওয়াইয়া বা আঞ্চলিক গানের কদর রয়েছে, যা ধরে রাখা জরুরি। তরুণ লেখক রিয়াদ হাসানের কথায়, “ভাষা সর্বজনীন হওয়া প্রয়োজন ঠিকই, কিন্তু আঞ্চলিক ভাষার চর্চা আমাদের সংস্কৃতিরই অংশ ও পরিচয়।”

ভাষা মানুষের প্রাণ, সংস্কৃতির বাহন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উত্তরের মানুষ তাদের আঞ্চলিক ভাষা রক্ষার দাবি জানিয়েছেন। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আঞ্চলিক বাক্য, কবিতা, ছড়া, লোকসংগীত এবং আদিবাসী ভাষা সংরক্ষণের ব্যবস্থা না নিলে অচিরেই ‘বাহের দেশের’ এই মধুর ভাষা কেবল ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি