কখনো গর্জে ওঠা ঢল, কখনো বিস্তীর্ণ বালুচর, এভাবেই দুই রূপে দেখা দেয় মাতামুহুরী নদী। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার জনজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই নদী বর্ষা এলেই হয়ে ওঠে আতঙ্কের নাম। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে মুহূর্তে ভেঙে যায় ঘরবাড়ি, হারিয়ে যায় ফসলি জমি, বিলীন হয় বছরের পর বছর গড়ে উঠা স্থাপনা।
কিন্তু প্রকৃতির এই কঠোর রূপের বিপরীতে রয়েছে এক কোমল চিত্রও। শুষ্ক মৌসুমে একই নদী বদলে যায় আশীর্বাদে। জেগে ওঠা চরে সবুজের সমারোহ বাদাম, মরিচ, বিভিন্ন শাক-সবজি, তামাকসহ নানা ফসলের আবাদে ব্যস্ত হয়ে পড়েন কৃষকরা। জীবিকার নতুন সম্ভাবনায় মুখে ফোটে হাসি।
এদিকে, এ বছর ভ্রমণপিপাসুদের জন্য যুক্ত হয়েছে নতুন পর্যটন স্পট। চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের হাজিয়ান ও পৌরসভা দিগরপানখালীর ১ নম্বর বাঁধ এলাকায় সম্প্রতি নদীর ওপর নির্মিত অস্থায়ী কাঠের সাঁকো বদলে দিয়েছে পুরো দৃশ্যপট। একসময় যেখানে ছিল নির্জন নদী তীর, সেখানে এখন প্রতিদিন বিকেলে জমে ওঠে ভ্রমণপিপাসুদের মিলনমেলা।
শতশত নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী ভিড় করছেন কাঠের সাঁকো দেখতে। কেউ হাঁটছেন সাঁকোর ওপর দিয়ে, কেউ নদীর বুকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ভেসে বেড়াচ্ছেন, আবার কেউ সূর্যাস্তের রঙিন আকাশকে পেছনে রেখে তুলছেন স্মৃতির ছবি। নদীর পানিতে পা ভাসিয়ে দিয়ে উপভোগ করছেন নির্মল আনন্দ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, চকরিয়ায় বিনোদনের সুযোগ সীমিত। ফলে নদীর ওপর এই অস্থায়ী কাঠের সাঁকোই হয়ে উঠেছে স্বল্প ব্যয়ে আনন্দ পাওয়ার নতুন ঠিকানা।
দর্শনার্থীদের ভিড়ে নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী দোকানপাট। ঝালমুড়ি, ফুচকা-চটপটি, ভেলপুরি, আচার, চা ও কোমল পানীয়সহ সব মিলিয়ে জমজমাট পরিবেশ।
স্থানীয় বিক্রেতারা জানান, প্রতিদিন বিকেলে ভালো বিক্রি হচ্ছে। অনেকের সংসারে বাড়তি আয়ের উৎস তৈরি হয়েছে এই সাঁকোকে ঘিরেই।
ঘুরতে আসা পর্যটকরা চাইলে নৌকা ভ্রমণেরও সুযোগ রয়েছে। নৌকা ভ্রমণের জন্য প্রতিজনের কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে ৫০ টাকা। এতে নৌকার মালিক ও মাঝিরাও পাচ্ছেন বাড়তি আয়। স্বল্প সময়ে গড়ে ওঠা এই বিনোদনকেন্দ্র স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ফাঁসিয়াখালীর হাজিয়ান ও পৌরসভা ৯নং ওয়ার্ডের দিগরপানখালী ১ নম্বর বাঁধের পারাপার ঘাট প্রতি বছর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিলামে দেয়া হয়। চলতি বছরে ৩২ হাজার টাকায় এক বছরের জন্য ঘাটটির ইজারা নেন দুধু মিয়া।
আগে বর্ষা মৌসুমে পারাপারে ১০ টাকা এবং শুষ্ক মৌসুমে ৫ টাকা করে নেয়া হতো। গত মাসে স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি কুতুব উদ্দিন নিজ উদ্যোগে অস্থায়ী কাঠের সাঁকো নির্মাণ করেন। ইজারাদারের সম্ভাব্য ক্ষতি পুষিয়ে দিতে তিনি ১০ হাজার টাকা প্রদান করেছেন বলে জানান দুধু মিয়া। বর্তমানে সাঁকো দিয়ে সাধারণ মানুষ বিনামূল্যে চলাচল করছেন। তবে ভারী মালামাল পারাপারে নৌকা ব্যবহার করলে নির্ধারিত ভাড়া নেয়া হচ্ছে।
ঘাট ইজারাদাী দুধু মিয়া বলেন, মাতামুহুরী নদীর গতিপ্রকৃতি বোঝা কঠিন। কোন বছর কোনদিকে ভাঙবে তার নিশ্চয়তা নেই। বর্ষায় এটি অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়, আবার শুষ্ক মৌসুমে আশীর্বাদ। চরে ফসল হয়, মানুষ আয় করে। সাঁকোটি কয়েক মাস পর বর্ষার ঢলে তলিয়ে যাবে। কিন্তু এই অল্প সময়েই মানুষ যে আনন্দ পাচ্ছে, সেটাই বড় পাওয়া।
মাতামুহুরী নদী চকরিয়ার মানুষের জীবনে এক বৈপরীত্যের প্রতীক। একদিকে নদীভাঙনের দীর্ঘশ্বাস, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমের হাসি। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার রঙিন আকাশ দেখলে যেন ভুলে যেতে ইচ্ছে করে অতীতের ক্ষতি ও কষ্ট।
বর্ষা এলেই হয়তো আবার তাণ্ডব দেখাবে নদী। কাঠের সাঁকো ভেসে যাবে ঢলের পানিতে। তবুও এই স্বল্প সময়ের আনন্দ, এই মিলনমেলা, এই ক্ষুদ্র অর্থনীতির চাকা, সব মিলিয়ে মাতামুহুরী আবারও প্রমাণ করল, প্রকৃতি কখন কেড়ে নেয়, আবার কখন ফিরিয়ে দেয়।
অভিশপ্ত বলেই পরিচিত যে নদী, আজ সেই নদীর বুকেই বইছে আনন্দের বন্যা। চকরিয়ার মানুষ তাই ভয়কে সঙ্গী করেই খুঁজে নিচ্ছে বেঁচে থাকার গল্প, ভালোবাসার উপলক্ষ আর সাময়িক স্বস্তির হাসি।
অর্থ-বাণিজ্য: সোনার দাম ভরিতে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা বাড়লো
অর্থ-বাণিজ্য: টানা দরপতনেও বাজার মূলধন বাড়লো হাজার কোটি টাকা