একটা সময় ছিল, যখন শৈলমারি ও বুড়িভদ্রা ছিল প্রাণবন্ত, খরগ্রোতা নদী। রাতের শব্দে চারপাশ মুখরিত থাকত, নদীর কূলে কূলে কৃষকের স্বপ্ন ভেসে বেড়াত, কিশোররা মাছ ধরার ছিপ-জাল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত তীরে। আজ সেই নদী মৃতপ্রায়। ডুমুরিয়া থেকে কেশবপুরের মঙ্গলকোট অঞ্চল পর্যন্ত বুড়িভদ্রা নদীর এই করুণ পরিণতি চোখে দেখা যায় পানি নেই, রাত নেই, প্রাণ নেই। অন্যদিকে শৈলমারি নদীরও মরণঘণ্টা বেজে চলেছে।
শুধু স্মৃতির পাতায় বেঁচে আছে কিশোর বেলার সেই দীর্ঘ বাঁশের সাঁকো পারাপারের গল্প। এখন শুকনো নদীর বুকে কিশোররা মাছ ধরার জন্য বাঁধ দেয়। প্রকৃতির এক নীরব মৃত্যু আমরা অবলীলায় প্রত্যক্ষ করছি, অথচ তাতে আজ আর আমাদের মন ভারী হয় না।
নদীর নাব্যতা হারানোর এই চিত্র কেবল শৈলমারি-বুড়িভদ্রার গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের অধিকাংশ ছোট-বড় নদীর বাস্তবতা। নদী মরলে বর্ষায় জলাবদ্ধতা বাড়ে, কৃষি জমিতে পানি জমে থাকে, মানুষের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। ডুমুরিয়া আর বটিয়াঘাটা দুই উপজেলার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া শৈলমারি নদীটিও মৃতপ্রায়। প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা হাজার হাজার মানুষ পার হয় এই নদী। শৈলমারির কৈয়ার দক্ষিণ থেকে শরাফপুর পর্যন্ত পাঁচটি খেয়াঘাট রয়েছে, যা সরকারি ডাকে (টেন্ডার) কিনতে হয়। ইতোমধ্যে দুটি খেয়া বন্ধ হয়ে গেছে। তিনটি খেয়া চালু থাকলেও তা বন্ধ হবার উপক্রম। শুধু জোয়ারের সময় পারাপারের ব্যবস্থা থাকে। নদীতে ভাটা নামলে বাঁশের পাটাতন সাঁকোয় পার হতে হয়। তাতে জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে লোকজন পারাপার হচ্ছে। ডুমুরিয়ার শেষ প্রান্ত কেশবপুরের মঙ্গলকোট, গোলদারপাড়া অঞ্চলের মানুষ প্রতি বছর জলাবদ্ধতার কাছে হার মানছে। কারণ তাদের পানি সরবরাহের কোন ব্যবস্থা নেই। ওই অঞ্চলের নদী পুরোপুরি ভরাট হয়ে গেছে। অথচ এক সময় এই নদীই ছিল জীবন-জীবিকার প্রধান ভরসা। কৃষক, জেলে, মাঝি, ব্যবসায়ী- সবাই এই নদীর ওপর নির্ভরশীল ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্বার্থপর পরিকল্পনা, অপরিকল্পিত বাঁধ, দখল, দূষণ এবং কর্তৃত্বের লোভ বুড়িভদ্রার বুক চিরে তার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। একদিকে নদীর বুক শুকিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ভূমি খেকোদের লোভ বাড়ছে। পলি জমে যখন নদী সংকুচিত হয়, তখন দখলবাজেরা ওই স্থানকে ‘নিজস্ব জমি’ ভেবে দখলে নিচ্ছে। নদীর বুকে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ হচ্ছে। পরিবেশ বিজ্ঞানী আবুল কালাম আজাদ বলেন, এটি পরিবেশের জন্য ধ্বংসাত্মক, কৃষির জন্য ক্ষতিকর এবং জনজীবনের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছে। নদী শুধু পানি প্রবাহের নাম নয়, এটি একটি প্রাণব্যবস্থার কেন্দ্র। মাছ, পাখি, জলজ উদ্ভিদ, কৃষি, পরিবেশ- সবই নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠে। নদীর মৃত্যু মানে জীববৈচিত্র্যের মৃত্যু। প্রতিবেদক ঘুরে দেখেছেন, তারও ভয়ংকর পরিণতি হচ্ছে এই এলাকায় বসবাসরত মানুষের জীবনযাত্রায়।
সাবেক অধ্যাপক আব্দুল হাফিজ বলেন, আমরা হয়তো খুব স্বাভাবিকভাবে ভাবছি ‘নদী তো মরেই!’ কিন্তু কেউ ভাবছি না, নদী মরলে প্রকৃতপক্ষে আমাদের অস্তিত্বই সংকটে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি কিংবা খরার প্রকোপ সব কিছু আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে এই মৃত নদী। যার পরিণতির ফলাফল ভোগ করতে হচ্ছে ডুমুরিয়া এবং পার্শ্ববর্তী উপজেলা কেশবপুরের মানুষকে। গত বছর আকাশ বন্যায় ডুবে ছিল কেশবপুর, ডুমুরিয়ার মানুষ। ভুক্তভোগী এই অঞ্চলের মানুষেরা বলেন, শৈলমারি, বুড়িভদ্রা নদী জরুরি খনন কর্মসূচি শুরু করা প্রয়োজন। এবং সেই সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার জন্য দখলদারদের উচ্ছেদ ও বাঁধ অপসারণ অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। সঙ্গে দখলবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। এ ব্যাপারে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো দরকারছিলো। শৈলমারি ও বুড়িভদ্রার এই দুঃখগাথা আজ একটি অঞ্চলের নয়, বরং সমগ্র দেশের জন্য এক শোকসংবাদ। সময় থাকতে এই সংকটের সমাধানে সবার ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস দরকার। নদী আমাদের শিকড়, সেই শিকড় কেটে আমরা বেঁচে থাকতে পারব না, এমন মন্তব্য গবেষক-পরিবেশবিদের।