image
মানিকগঞ্জ : সিংগাইরে আবাসিক এলাকা ও ফসলি জমির উপর সক্রিয় রয়েছে ৫৮টি ইটভাটা -সংবাদ

সিংগাইরে ৫৮ ইটভাটা গিলে খাচ্ছে ফসলি জমির মাটি

প্রতিনিধি, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ)

মানিকগঞ্জের সিংগাইরে আবাসিক এলাকা ও ফসলি জমির উপর ৫৮টি ইটভাটা চালু রয়েছে। প্রত্যেকটি ভাটায় ইট উৎপাদনে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ফসলি জমির মাটি। গত কয়েক বছরে বেশকিছু ইটভাটা বন্ধ হলেও বর্তমানে চালু ভাটাগুলোর বেশির ভাগই ভাড়ায় পরিচালিত হচ্ছে।

সূত্রমতে, উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের মধ্যে বলধারায় ২৭টি, চান্দহরে ১৩টি,জামির্ত্তায় ৬টি, বায়রা ৬টি, চারিগ্রামে ৩টি, ধল্লায় ২টি ও সদর ইউনিয়নে একটি ইটভাটা রয়েছে। তবে ইটভাটার পরিমাণ আরো বেশি হবে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি।

ভাটাগুলোতে কাঁচামাল হিসেবে দেদারসে ব্যবহৃত হচ্ছে ফসলি জমির টপসয়েল, যা ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে স্থায়ী ক্ষতি। এমন ক্ষতি শুধু মাটি বিক্রির জন্য নয়, আশপাশের জমিও ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন অনেক কৃষক।

রোববার, (২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) সরেজমিন জানা গেছে, রেকর্ড পরিমাণ ইটভাটা রয়েছে বলধারা ইউনিয়নে। এ এলাকার অধিকাংশ ফসলি জমি পরিণত হয়েছে ডোবা- নালায়। এই ইউনিয়নটিতে বিশাল মাটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের শীর্ষে রয়েছে কুদ্দুস কোম্পানি তার ভাই মহর আলী, লালন মিয়া ও ভাতিজা রবিন। এছাড়াও রয়েছে সোহেল, মিন্টু, জিয়া, আকবর, নুরু ও টুটুল। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, কতিপয় ইটভাটার মালিক এক লাইসেন্সের বিপরীতে অবাধে একাধিক ইটভাটা চালিয়ে যাচ্ছেন। খোলাপাড়া মৌজার বদ্দর চকের জমির মালিক ভুক্তভোগী আমিনুর ইসলাম, ইদ্রিস আলী ও ফারুক আহমেদসহ অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, টুকানি মেম্বারের ছেলে লালন মিয়া আমাদের জমি-সংলগ্ন জনৈক আব্বাস আলীর ২ বিঘা জমি ৩৬ লাখ টাকায় কিনে গভীর করে মাটি কেটে নিচ্ছে। ফলে, পাশেই আমাদের তিন ফসলি জমি ভেঙে পড়ছে। আশপাশে ১২টি প্লট আছে, জিম্মি করে সেই জমিগুলো কমদামে কিনে নিতে চাচ্ছে। আমরা বিক্রি না করলে জোর করেই মাটি কেটে নেয়ার হুমকি দিচ্ছে। ভুক্তভোগীরা সদ্য নির্বাচিত এমপির কাছে অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, জামির্ত্তা ইউনিয়নের হাতনি ও জাইল্লার চকে ৬টি ইটভাটা সচল রয়েছে। এর মধ্যে চারটি ইটভাটা ভাড়ায় পরিচালিত হচ্ছে। এ এলাকায় মাটিখেকো সিন্ডিকেটের মধ্যে রয়েছে- আয়নাল, রিপন, সাদিক, আরিফুল, মঞ্জু, আলামিন, রাজু ও দ্বীন ইসলাম। স্থানীয় মাটিকাটা প্রতিরোধ কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আবু সায়েম জানান,ভাটা মালিকরা পার্শ্ববর্তী সাভার উপজেলার বলিয়ারপুর ধান উৎপাদনকারী চক শেষ করে এ এলাকার জমিতে প্রতিনিয়ত ছোবল মারছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাটিকাটার বিরুদ্ধে পরিপত্র জারি করে চিঠি দিলেও মানছেন না তারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে রাতের আঁধারে অবৈধ ড্রাম ট্রাকের মাধ্যমে মাটি বহন করছেন ব্যবসায়ীরা। এতে গ্রামীণ রাস্তাঘাটেরও ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে।

এ ছাড়া হাজী সোহেল ইমামের (কবির মাস্টার) মালিকানাধীন সুপার ব্রিকস নামের ইটভাটাটি সুদক্ষিরা- জাইল্লার মাঝামাঝি কবরস্থান সংলগ্ন আবাসিক এলাকায় গড়ে ওঠেছে। ওই ভাটা মালিকের ট্রাকে ২০২১ সালের ৬ মে বিন্নাডাঙ্গী বাসস্ট্যান্ডে নজরুল ইসলাম বাবুল নামের এক ব্যক্তিকে চাপা দিয়ে মেরে ফেলে। মামলার ভয়ে রফা-দফায় মীমাংসা করলেও নিহতের পরিবার এখন পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পায়নি বলে জানা গেছে।

চান্দহর ইউনিয়নের রিফায়েতপুর,ওয়াইজনগর,বাঘুলি ও চালিতাপাড়া চকে গড়ে ওঠা ১৩টি ইটভাটার জন্য মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে স্থানীয় ফসলি জমি থেকে। এ ইউনিয়নের মালেক, রেহানুল, ইজ্জত আলী, লাল মিয়া, মনির, শহিদুল, হুসো, হাসান, কিরন ও সেলিম মাটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের অন্যতম। শক্তিশালী এ চক্রের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের ওপর চলে নির্যাতন।

অপরদিকে, চারিগ্রাম ইউনিয়ন থেকেও অন্যান্য ইটভাটায় মাটি বিক্রি হচ্ছে। এখানকার মাটিখেকো সিন্ডিকেটের মধ্যে রয়েছে- জাহাঙ্গীর, হলু বেপারী, বাবুল, হালিম প্রমুখ। জামশা ইউনিয়নে জাহাঙ্গীর, কাদের, আমিনুল ও বাবুলসহ আরো কয়েকজন। এ ছাড়া বায়রা ইউনিয়নে মাটিকাটার নেতৃত্বে রয়েছে নাসির ও জামিল। প্রায় প্রত্যেকটি ইউনিয়নেই এমন মাটি ব্যবসায়ী চক্র দিনের বেলায় মাটি কাটার পরিবর্তে তারা রাতকে বেছে নিয়েছে। এ মাটিকাটার ফলে প্রতি বছর ফসলি জমি কমে ডোবা-নালায় পরিণত হয়ে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, পাকা-আধাপাকা গ্রামীণ রাস্তাঘাটের ক্ষতিসহ ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় পরিবেশের ওপর পড়ছে বিরূপ প্রভাব। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের কতিপয় কর্মচারীদের সঙ্গে মাটিখেকো চক্রের সখ্যতা থাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বের হলেই খবর পৌঁছে যায় তাদের কাছে। ফলে, তারা রয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।

উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মো. ইলিয়াস খান এখানকার অর্ধশতাধিক ইটভাটার বেশির ভাগই ভাড়ায় চালিত স্বীকার করে বলেন, মাটি না কাটলে তো আমাদের ভাটা চলবে না। যারা মাটির ব্যবসা করে তারা ভাটার সঙ্গে জড়িত না। প্রশাসন ইচ্ছা করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। অবৈধ ভাটা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানে ৪টি ভাটা আছে অবৈধ। এগুলো ঢাকা থেকে এসে ভেঙে দেবে শুনেছি।

থানার অফিসার ইনচার্জ ( ওসি) মো.মাজহারুল ইসলাম বলেন, ফসলি জমির মাটি কাটা অন্যায়। এটা ভূমি দেখবে, তারপরও যেখানেই মোবাইল কোর্টের অভিযান হচ্ছে সেখানেই পুলিশ সহযোগিতা করছে।

উপজেলা কৃষি অফিসার হাবিবুল বাশার চৌধুরী বলেন, এ উপজেলায় একটি ইটভাটাও বিধিসম্মত নয়। ভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে আমাদের কাছ থেকে কোনো মতামত নেয়া হয় না।

পরিবেশ অধিদপ্তর মানিকগঞ্জের উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, কৃষিজমির মাটিকাটা ও অবৈধ ইটভাটা বন্ধে ইউএনও এসিল্যান্ড মোবাইল কোর্ট করে বিচারের ব্যবস্থা করবেন। অভিযানের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর সব সময় রেডি আছে।

এ ব্যাপারে সিংগাইর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. হাবেল উদ্দিন বলেন, জমির টপসয়েল কাটার অভিযোগে চলতি মৌসুমে সাড়ে ৭ লাখ টাকা জরিমানাসহ তিনটি ভেকু অকার্যকর করা হয়েছে। যেখানেই খবর পাচ্ছি, সেখানেই অভিযান চালানো হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি