পশ্চিমা বিশ্বের জনপ্রিয়, উচ্চমূল্যের সুপার ফুড খ্যাত চিয়া সিডের পরীক্ষামূলক চাষের পর এবার বাণিজ্যিক চাষাবাদ শুরু হয়েছে মাগুরা জেলায়। দিগন্তজোড়া সবুজ মাঠে নতুন সম্ভাবনার নাম লেখাচ্ছে এখন এই চিয়া সিড। চলতি বছরে প্রায় ১৫০ একর জমিতে এর চাষ হয়েছে। এখানকার উৎপাদিত চিয়া সিড দেশের বিভিন্ন সুপারশপ ও অনলাইন বাজারে বিক্রি হচ্ছে বেশ চড়া দামে। পুষ্টিগুণে ভরপুর এই সুপার ফুডের চাষ করে যেমন জেলায় সাড়া ফেলে দিয়েছেন বহু চাষি, তেমনি লাভবানও হচ্ছেন।
মাগুরায় সুপার ফুড চাষে সাড়া ফেলে দেওয়া তরুণ কৃষি উদ্যোক্তাদের অন্যতম একজন কৃষিতে উচ্চ ডিগ্রিধারী দিদার আহমেদ। জেলা সদরের হাজিপুর ইউনিয়নের নড়িহাটি গ্রামে মাত্র ১৬-১৮ হাজার টাকা ব্যয়ে তিনি দেড় একর জমিতে চিয়া সিড চাষ করেছেন। আমেরিকা, কানাডা, ব্রাজিলসহ উন্নত বিশ্বের জনপ্রিয় এই ফসলের চাষ একনজর দেখতে প্রতিদিন তার খেতে ভিড় করছেন বহু কৃষক। এবার চিয়া সিডের আবাদ থেকে দুই লাখ টাকা লাভ হবে আশা করছেন দিদার।
এর আগের বছরগুলোতে দিদার সামার টমেটো, পেয়ারা, বিভিন্ন জাতের বড়ই-কুল, বারোমাসি লাউ ও স্কোয়াশ চাষ করে দারুণ সফল হয়েছেন। তবে চিয়া সিড নিয়ে তার আত্মবিশ্বাস যেকোনো ফসলের চেয়ে বেশি। তরুণ চাষি দিদার বলেন, ‘অন্য অনেক ফসলের চেয়ে চিয়া সিডে রোগবালাই কম। আর পরিচর্যাও অতি সহজ। এর ওপর বাজারে চাহিদা ও দাম ভালো থাকায় লাভের সম্ভাবনাও বেশি।’
স্থানীয় কয়েকজন কৃষক জানান, গেল বছরে নড়িহাটি গ্রামের চাষি মাসুদ আলম পরীক্ষামূলকভাবে চিয়া সিড চাষ করেছিলেন। তাতে ভালো ফলও পেয়েছিলেন। মাসুদের সাফল্যই দিদারকে বড় পরিসরে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করে।
চিয়া সিড চাষি দিদার জানালেন, জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক আক্কাস খানের সহযোগিতায় গত নভেম্বর মাসে বিদেশি উচ্চমূল্যের এই অর্থকরী ফসলের বীজ বপন করেন। এরপর সার, সেচ ও ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি তুলনামূলক যেমন সহজ, তেমনি খরচও কম। মাত্র ৯০ থেকে ১০০ দিনের মধ্যেই ফসল সংগ্রহ করা যায়। প্রতি বিঘায় ২০০-৩০০ গ্রাম বীজই যথেষ্ট।
নড়িহাটি গ্রামের কৃষক রাইসুল ইসলাম, মনি বিশ্বাস ও কমল হোসেনসহ অনেকে জানান, নতুন এই অর্থকরী ফসল এলাকায় লাভজনক কৃষিতে ব্যাপক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। ইতোমধ্যে অনেকেই চিয়া সিড চাষে আগ্রহী হয়েছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে মাগুরা জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. তাজুল ইসলাম জানান, চলতি বছর জেলায় প্রায় ১৫০ একর জমিতে চিয়া সিডের আবাদ হয়েছে। দেশের বিভিন্ন সুপারশপ ও অনলাইন বাজারে প্রতি কেজি সিড ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তাজুল ইসলাম বলেন, তোকমা বা তিলের মতো দেখতে ছোট এই বীজে রয়েছে ক্যালসিয়াম, আয়রন, পটাশিয়াম, প্রোটিন ও ওমেগা-থ্রি। নিয়মিত খাদ্যতালিকায় যুক্ত হলে এটি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। রক্তে সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে কর্মকর্তারা বলছেন, মাগুরার উর্বর মাটি ও অনুকূল আবহাওয়া চিয়া সিড চাষে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। কৃষি বিভাগের প্রণোদনা ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সাহসী উদ্যোগে এ ফসল একদিন মাগুরার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
প্রসঙ্গত, দেশে পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে চিয়া সিড, কিনোয়া ও স্পিরুলিনার মতো উচ্চমূল্যের সুপার ফুড চাষ দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। মাগুরাসহ বিভিন্ন জেলায় চিয়া সিড ও লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও পটুয়াখালীতে কিনোয়া চাষে কৃষকরা সফল হয়েছেন। যা প্রথাগত ফসলের চেয়ে তিনগুণ লাভজনক। এসব ফসলে যেমন রোগ-বালাই কম, তেমনি খরা ও লবণাক্ত সহিষ্ণু হওয়ায় দেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
সারাদেশ: মাগুরায় সাড়া ফেলেছে ‘সুপার ফুড’ চাষ