image

কুমারখালীতে বালু হরিলুটের মহোৎসব

প্রতিনিধি, কুমারখালী (কুষ্টিয়া)

কুষ্টিয়া কুমারখালী সৈয়দ মাসুদ রুমি সেতুর নিচে রাহিনীতে স্তূপ করা বালু না থাকলেও ১টিতেই ১ কোটি ১৭ লাখ টাকার বালুর ইজারা সম্পন্ন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ ধরনের প্রতারণা নিয়ে ক্ষোভ দরপত্রে অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ দরপত্রক্রেতা। দরপত্র আহ্বান কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক হওয়ায় এ ধরনের প্রতারণার বিচার নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে তারা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ২৯ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে জেলা পানি সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গড়াই নদী ড্রেজিং ও তার তীর সংরক্ষণ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় কুষ্টিয়া জেলার ৬টি স্থানে স্তূপ আকারে রাখা ড্রেজিংকৃত বালির দরপত্র আহ্বান করা হয়। যার মোট পরিমাণ ৪২ লাখ ২৬ হাজার ৩৪৯ ঘনমিটারের বেশি।

৬টি স্থানের মধ্যে কুমারখালী উপজেলার সৈয়দ মাসুদ রুমি সেতু পার্শ্ববর্তী জয়নাবাদ ও রাহিনী মৌজায় ৩ লাখ ২৮ হাজার ৮১৬ ঘনমিটার ড্রেজিংকৃত বালু, একই উপজেলার বহলাগোবিন্দপুর মৌজার ২ লাখ ৫০ হাজার ১৫৫ ঘনমিটার, কুমারখালী উপজেলার চাপড়া মৌজায় ৫ লাখ ৪৯ হাজার ২৪৬ ঘনমিটার এবং উপজেলার বরুরিয়া মৌজার ১ লাখ ২০ হাজার ২৩৪ ঘনমিটার বালুর পাশাপাশি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার গোপীনাথপুর মৌজায় ড্রেজিং করা স্তূপ বালুর পরিমাণ ১০ লাখ ১৬ হাজার ৪৮৫ ঘনমিটার, একই উপজেলার হরিপুর ও শালদাহ্ মৌজায় ১৯ লাখ ৬১ হাজার ৪১৩ ঘনমিটার বালু রয়েছে বলে দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশ করে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, কুষ্টিয়া।

দরপত্র আহ্বানের পূর্বে জেলা পানি উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে এই বালির সঠিক পরিমাপ নির্ধারণের কথা থাকলেও সরেজমিনে গিয়ে দরপত্রে নির্ধারণ করা স্থানে বিজ্ঞপ্তির আগে থেকেই অধিকাংশ বালু স্তূপকৃত স্থান চলছে বালু হরিলুটের মহোৎসব। কোন কোন স্থানে দরপত্রে আহ্বান করা স্তূপকৃত বালু অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দুরূহ হয় পরে। পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে খাস কালেকশনের নামে বালু লুটের আরেক পদ্ধতি। স্থানীয় সরকারি ভূমি অফিসের তত্ত্বাবধানে খাস কালেকশনের বিধান থাকলেও স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে নিয়মিত চলে বালুচুরির এই উৎসব।

সরেজমিনে সৈয়দ মাসুদ রুমি সেতুর পার্শ্ববর্তী রাহিনী মৌজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্তূপ করা বালু দেখতে গেলে সেখানে সরকারি বালু লুটের সঙ্গে জড়িতরা পথ রোধ করার চেষ্টা করে। ছবি না তোলার শর্তে যেতে দিলে গোপন ক্যামেরায় ধরা পরে কিভাবে লুট হয় সরকারি সম্পদ। শত শত ড্রাম ট্রাকে চলে এই লুটপাট। সেখানে স্তূপ করা বালু লুটপাট শেষ করে ইজারা ছাড়াই নদীতে নেমেছে এইসব বালুখোররা। জেলার গুরুত্বপূর্ণ ব্যস্ততম কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়কের সৈয়দ মাসুদ রুমি সেতুর পার্শ্ববর্তী হওয়ার পরও প্রশাসনের নাকের ডগায় নদী চুরির মতো ঘটনায় জনমানে সৃষ্টি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়ার ড্রেসিংকৃত বালু অপসারণের দরপত্রে অংশগ্রহণকারী কয়েকজন জানান, এ ধরনের টেন্ডারের বিষয়ে জেলা, উপজেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যুক্ত থাকার পরও কিভাবে এ ধরনের দলপত্র আহ্বান হলো তা আমাদের জানা নেই। যে ঘাটে স্তূপ করা বালুই নেই এখানেও তারা ১ কোটি ১৭ লাখ টাকায় টেন্ডার সম্পন্ন করেছে।

তারা আরও বলেন, আমরা শুনেছি ছয়টি ঘাটের টেন্ডার আহ্বান হয়েছে এর মধ্যে তিনটি সম্পন্ন হয়েছে। যার এখনও অনুমতি পত্র পাইনি সংশ্লিষ্ট দরদাতা প্রতিষ্ঠান। এই ঘাটগুলোর অধিকাংশ ঘাটেই যে পরিমাণ বালু থাকার কথা তা নেই। এরমধ্যে কুমারখালী উপজেলার রাহিনী ঘাটের অবস্থা ভয়াবহ, এখানে স্তুপের কোন বালুই নেই। যে প্রতিষ্ঠান এই ঘাট পেয়েছে তারা তো এখন টাকা উদ্ধারের জন্য কুষ্টিয়া রাজবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়কে অবস্থিত সৈয়দ মাসুদ রুমি সেতুকে ঝুঁকিতে ফেলে গড়াই নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করবে।

তারা বলেন, উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতারা অবৈধভাবে এই বালু হরিলুটের সঙ্গে জড়িত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানায়, ২০২২-২৩ সালের দিকে নদী ড্রেজিং করে এই বালু গড়াই নদীর পাড়ে স্তূপ করে রেখেছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়া। কিন্তু ২০২৪ সালের শেষের দিকে মানহা টিম্বার নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই স্তূপ বালু খাস কালেকশনের নামে তা বিক্রি করব বলে আমরা শুনেছিলাম। কিন্ত আমরা দেখে আসছি স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতারা ও উশৃঙ্খল ছেলেপেলেদের নিয়ে বালু বিক্রি হয়। তাদেরকে কোন কিছু জিজ্ঞাসা করলে এরা তৎকালীন কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিকাইল সাহেবের কাছে খোঁজ নিতে বলে।

তারা আরও জানায়, আমরা শুনেছি এখনও বালু উত্তলনের অনুমতি পত্র পাইনি দরদাতা প্রতিষ্ঠান। এরই মধ্যে টেন্ডার আহ্বানের পূর্বেই স্তূপ করা বালু শেষ করে পার্শ্ববর্তী গুরুত্বপূর্ণ এই সেতুর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে বালু উত্তোলন করছে। এগুলো প্রশাসনের মদদ ছাড়া কিভাবে সম্ভব। এর সঙ্গে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট প্রশাসন জড়িত তারা মনে করেন।

কুষ্টিয়া কুমারখালী-৪ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য আফজাল হোসেন কে কুমারখালী খোকসা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন সহ সৈয়দ মাসুদ রুমি সেতুর নিচে রাহিনী পাড়া জয়নাবাদ এলাকায় দশ কোটি টাকার বালু হরি লুটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন আমরা নির্বাচিত এলাকায় আমি মঙ্গলবার, (২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) মিটিং করে বলে দিয়েছি কোথায় কোন অবৈধ দখলবাজি চাঁদাবাজি আমি কোথাও করতে দেব না।

এ ধরনের প্রতারণার বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড, কুষ্টিয়া জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান বলেন, জেলার পানিসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক নিজে। তিনি এ বিষয়ে বলতে পারবেন। বালু পরিমাপের দায়িত্ব আমার না। এ বিষয়ে তিনি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক ইকবাল হোসেনের কাছে কুমারখালী সৈয়দ মাসুদ রুমি সেতুর নিচে রাহিনীতে ড্রেজিংকৃত বালু নেই টেন্ডার হয়েছে তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন এটা তো হওয়ার কথা নয় ওখানে তো বালু থাকার কথা আমি বিষয় টি দেখবো। খাস কালেকশনের নামে কুমারখালী লাহিনী ও জয়নাবাদের দশ কোটি টাকার বালি যদি অবৈধভাবে কেউ এক ছটাক বালু তোলা হবে না।

অবৈধভাবে বালু হরিলুটের মহোৎসব ও বালি না থাকার পরও টেন্ডার আহ্বানের প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক ইকবাল হোসেন বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ দেন। এ সময় তিনি বালুখোরদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি