মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে কোনো প্রকার নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে গড়ে উঠেছে বেকারি ও কারখানা। এসব বেকারিতে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে তৈরি করা হচ্ছে শিশু খাবার। উৎপাদিত খাদ্যের গুনগতমান এবং পরিমাপ নিশ্চিকরণে স্থানীয় প্রশাসনের নেই কোনো নজরদারি। কারখানাগুলোতে উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ ছাড়াই বাহারি রংবেরংয়ের মোড়কে বিস্কুট, ক্রিমরোল, বানরুটি, শেমাই, কটকটি, বাটার বান, ঘি টোস্ট, কেক, পাউরুটি, সবজি রোল, চানাচুর, ফাস্টফুডসহ নানা ধরনের শিশুখাবার। ভোর বেলা ভ্যান গাড়িতে এবং অটোবাইকে করে বিভিন্ন হাট-বাজারে উৎপাদিত খাবার সামগ্রী বাজারজাত করা হচ্ছে। কোন প্রকার গুনগতমান এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই খাদ্যের মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ বেকারি কর্মরত শ্রমিকরা প্যাকেটে দিয়ে দিচ্ছে। প্রতিটি বেকারির ভেতরে নোংরা, ময়লা-আর্বজনার দুর্গন্ধে পরিবেশ ভয়াবহ আকার ধারণ করলেও স্থানীয় প্রশাসনের কোন মাথাব্যথা নেই।
জানা গেছে, উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে মোট ৬/৭টি বেকারি আছে। এর মধ্যে ঘিওর সদরে ৫টি, পয়লাতে ১টি, বানিয়াজুরীতে ১টি, বড়টিয়াতে ১টি বেকারি আছে। এসব বেকারির উৎপাদিত খাদ্যের মান প্রণয়ন এবং গুনগতমান ও পরিবেশ নিশ্চিতকরণের কোনো প্রকারের ব্যবস্থা নেই। সরকারি নিয়মনীতি না মেনে স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকারচ্ছন্ন নোংরা, ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধ পরিবেশে নিম্নমানের উপকরন দিয়ে তৈরি বাহারি রকমের খাবার মেঝেতে ফেলে রাখা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে- বিভিন্ন বেকারিতে শিশুখাদ্য তৈরি করতে ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ, কেমিক্যাল, নিম্নমানের পাম তেল, পচা ডিম, ডালডা, আটা ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে অধিকাংশ বেকারি ও কারখানায় কোনো প্রকার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। উৎপাদিত খাবারেরমান নিয়ন্ত্রণকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্টান্ডার্ডস টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর অনুমোদন ও খাদ্য বিভাগের ছাড়পত্র নেই। নেই ট্রেড লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। এছাড়া শ্রমিকরা বিশেষ পোশাক ছাড়া খালি গায়ে খাবার তৈরি করছে। নোংরা অপরিষ্কার কড়াই গুলোতে আটা ময়দা প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। প্রতিটি খাবারে নিম্নমানের আটা, ইস্ট, ডিম, ছোটা দেওয়া হয়। ডালডা ও চিনি দিয়ে তৈরি করা ক্রিম রাখার পাত্রগুলোতে তেলাপোকা, ঝাঁকে ঝাঁকে মশা-মাছি ভনভন করছে। প্রতিটি খাবারে এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। অধিকাংশ বেকারির মালিকরা আইনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে চটকদার মোড়কে নিম্নমানের খাদ্যসামগ্রী তৈরি করে বাজারজাত করছে। প্রতিদিন হাট-বাজারগুলোতে অটোবাইক ও ভ্যানে করে দিবারাত্রী খাদ্যসামগ্রীগুলো দোকানে দোকোনে পৌঁছে দিচ্ছে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সব প্রকার মুদি দোকানের পলিথিনের ভেতরে রাখা ক্রিমরোল, ড্রাই কেক, ছোট কেক, পাউরুটি, বনরুটি, পেটিস, ডেনিস, সিংগারা, লাড্ডুসহ বাহারি রকমের শিশুখাবার ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয়, খাবারগুলো কবে উৎপাদন করা হয়েছে, কবে মেয়াদ শেষ হবে তার নিদিষ্ট কোন তারিখ উল্লেখ নেই। বেকারির মালিকরা নিজেরাই উৎপাদন মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ লেখা স্টিকার পণ্যসামগ্রী প্যাকেটে ভেতরে দিচ্ছেন।
শিশু শ্রম আইনত নিষিদ্ধ, তার পরেও প্রতিটি বেকারিতে শ্রমিকদের পাশাপাশি ১০ থেকে ১২ বছরের কমলমতি শিশুদের কাজ করতে দেখা যায়। একটি বেকারিতে প্রায় ১২ জন শ্রমিক কাজ করেন। এর মধ্যে ৫/৬ জন শিশুশ্রমিক। শিশুশ্রমিকদের বেতন ৩/৪ হাজার টাকা। প্রতিটি বেকারিতে শিশুরা শ্রম দিচ্ছে। প্রতিটি শিশু রোগাক্রান্ত কঙ্কালসার। কাপড়-চোপড়গুলো নোংরা-অপরিষ্কার। এদের বয়স ১০ থেকে ১২ বছর। বেকারিতে থাকা খাওয়ার কোন পরিবেশ নেই। অন্য শ্রমিকদের বেতন ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়। প্রতিদিন সকাল থেকেই তারা খাদ্যসামগ্রী তৈরি করেন। স্থানীয় লোকজন বলেন, মাঝে মধ্যে নামমাত্র জরিমানা করা হয়। অনেক সময়ে স্যানিটারি কর্মকর্তসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসে ঘুরে চলে যায়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ভেজাল কেমিক্যাল ও নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে তৈরি করা এসব খাবার স্বাস্থের জন্য খুবই খারাপ ও ঝুঁকিপূর্ণ। খোলাবাজারের কোনো খাদ্য শিশুদের খাওয়ানো টিক নয়। ডায়রিয়া, লিভার সিরোসিস, জন্ডিস, আমাশয়সহ পেটের মারাত্মক ধরনের রোগ হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. বিপুল বালো বলেন, অস্বাস্থ্যকর এবং অপরিষ্কার পরিবেশে বেকারিতে শিশুখাদ্য তৈরি করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন ক্ষতিকর রং পাউডার, তেলসহ বিভিন্ন ধরনের উপদান ব্যবহার করা হয়। এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
মানিকগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, জেলার বিভিন্ন বেকারিতে মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর রং কেমিক্যাল, দিয়ে তৈরিকৃত শিশুখাদ্যসহ অন্য খাদ্যসামগ্রী তৈরি করা আইনত নিষিদ্ধ। আমি নতুন যোগদান করেছি। বেকারির তালিকা আমার অফিসে নেই। অভিযোগ পেলে এসব বেকারির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মানিকগঞ্জ জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (ভারপ্রাপ্ত) সহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামান রুমেল জানান, আমি মানিকগঞ্জে বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছি। পর্যায়ক্রমে বেকারিগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
ঘিওর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তানবীর আহম্মেদ বলেন, দ্রুত এ সমস্ত বেকারির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অর্থ-বাণিজ্য: বিশ্ববাজারে তেলের দাম সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ
অর্থ-বাণিজ্য: বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালো
সারাদেশ: বাঁচার আকুতি গৃহবধূ মুন্নির