এককালের নান্দনিক ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ রেলওয়ে স্টেশন। আজ তার ঐতিহ্য জৌলুশ হারিয়ে ফেলেছে। নব্বইয়ের দশকে পর্যন্ত প্রতিদিনই বাংলাদেশের প্রথম দ্বিতল বা দোতলা স্টেশনটি দেখতে ভিড় জমাতো লোকজন এখন আর সেই দিনও নাই স্টেশনের নান্দনিকতাও নেই।
সরেজমিন দেখা গিয়েছে, স্টেশনের দক্ষিণ দিকের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগে ভয়। সিঁড়ির ধাপগুলোর ভগ্নদশা। সাইডে উঠানামার হাতল নাই। দেয়ালে প্লাস্টার খসে পড়া। দরজা জানালা, যাত্রীদের ওয়েটিং রুম ভাঙাচোরা। নিচে সিঁড়ির আশেপাশে ময়লার স্তূপ। দীর্ঘ বছর ধরে নাই এক কালের সাক্ষী এই নান্দনিক স্টেশনের কোনো সংস্কার। সচেতনমহলের দাবি ঐতিহ্যবাহি স্টেশনের জৌলুস ফিরিয়ে আনতে কর্তৃপক্ষ যেন দ্রুত সংস্কারে হাত দেয়।
এদিকে স্টেশনে নেই কোন স্টেশন মাস্টার। একজন বুকিং সহাকারী ও পরিচ্ছন্ন কর্মি আছে বলে জানা যায়। অথচ এই স্টেশন হতে প্রতিদিনই শত শত যাত্রী বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করে। পলাশ-ঘোড়াশাল শিল্পাঞ্চলের গুরুত্ব বুঝেই সরকার যেন যথাশীঘ্র এর সংস্কার করে, এমনটাই দাবি এলাকাবাসির।
ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ রেলওয়ে স্টেশনের ইতিহাসে জড়িয়ে আছে এক গৌরবময় ঐতিহ্য। বাংলাদেশের প্রথম দ্বিতল বা দোতলা ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ স্টেশনটি ঢাকা বিভাগের নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার ঘোড়াশালে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে অবস্থিত একটি রেলওয়ে স্টেশন।
জানা যায়, ১৮৯২ সালে ইংল্যান্ডে গঠিত আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি এদেশে রেলপথ নির্মানের দায়িত্ব নেয়। পরবর্তীতে অন্যান্য স্টেশনের ন্যায় ১৯১০ সালে ঘোড়াশাল রেলওয়ে স্টেশনটি স্থাপন করা হলেও ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ স্টেশনটি ১৯১৪ সালে স্থাপন করা হয়। ১৯১০ সালের স্টেশনটির নাম টান ঘোড়াশাল স্টেশন নামে পরিচিত।
ঘোড়াশালের তৎকালীন জমিদার হাজী মোহাম্মদ আবু সাঈদ (সাজদা মিয়া) জমিদারীর পাশাপাশি ব্রিটিশ সরকারের একজন মেজিস্ট্রেট ছিলেন। সেই সুবাদে ঘোড়াশাল থেকে রেলপথে তাকে ঢাকায় গিয়ে অফিস করতে হতো। পার্শ্ববর্তী কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া এবং চরসিন্দুরের লোকজনকেও নদী পথে এসে ঘোড়াশালের এই স্টেশনটি রেলপথে যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করতে হতো।
কিন্তু শীতলক্ষ্যা নদীর পাড় থেকে স্টেশনটির দূরত্ব ছিল প্রায় দুই কিলোমিটার। নদীপথে এসে পায়ে হেঁটে যাত্রীদের স্টেশনে আসা-যাওয়াটা খুবই কষ্টসাধ্য ছিল। সেইদিক বিবেচনা করে জমিদার সাজদা মিয়া শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে আরেকটি রেলওয়ে স্টেশন স্থাপনের জন্য ব্রিটিশ সরকারের নিকট লিখিত আবেদন জানান। তার এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯১৪ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি দ্বারা নির্মিত হয় বর্তমান ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ স্টেশন।
এ ব্যাপারে ঘোড়াশাল দক্ষিণ চরপাড়ার কোরবান আলী জানান, তখন স্টেশনের এই ঘরটি চারদিকে মুলিবাঁশ ও ওপরে ছিল টিনের চালা। নিচে টিকেট বিক্রি করার জন্য ছিল টিকেট ঘর, আর উপরে ছিল বিশ্রামাগার। রেলগাড়িতে থাকতো জমিদার সাহেবের জন্য নির্ধারিত একটি কামড়া। ফ্ল্যাগ স্টেশনের পুরাতন স্থাপত্যটি গত এরশাদ সরকারের আমলে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হলেও জমিদার দেশবরেণ্য জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব আহমদুল কবিরের (মনু মিয়া) বাধার কারণে তা আর হয়নি।
ঘোড়াশাল টেকপাড়া গ্রামের আব্দুল হাই খান জানান, সাজদা মিয়া ছিলেন, ঘোড়াশাল অঞ্চলের সবচেয়ে বড় জমিদার। স্টেশনটি তার জন্যই হয়েছে। যেদিন ঢাকা যেতেন, সংবাদটি আগেই রেলওয়ে কোম্পানিকে জানানো হতো। গাড়ি থামিয়ে রেলওয়ে কোম্পানির লোক বাড়িতে এসে বলতেন জমিদার সাহেবের জন্য গাড়ি থামিয়ে রাখা হয়েছে।
তখন তিনি পালকিতে চড়ে স্টেশনে যেতেন। পালকির আগে পিছে থাকতেন ৩ জন করে ৬ জন ঋষি, আঞ্চলিক ভাষায় যাদের বলা হয় ‘মাউরা’। সাহেবকে স্টেশনে আনা-নেয়ার জন্য তাদেরকে প্রস্তত রাখা হতো। মূলত জমিদার সাজদা মিয়ার জন্যই ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ স্টেশনটি করা হয়েছে বলে জানান। এতে এলাকাবাসী এখনও জমিদার সাজদা মিয়ার প্রশংসা করে।
ঘোড়াশাল গ্রামের হযরত আলীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে জমিদার সাজদা মিয়ার ছিল খুবই সুসম্পর্ক। আর এই জন্যই মাত্র এক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে।
আরেকটি ফ্ল্যাগ স্টেশন স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। যেদিন অফিসের কাজে ঢাকা যেতো, চট্টগ্রাম থেকেই জমিদার সাহেবের জন্য একটি কামড়া বরাদ্দ থাকতো। জমিদার ছাড়া আর কেউ এই কামড়াটিতে উঠতোনা।
ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ রেলওয়ে স্টেশনটির ঐতিহ্যকে ধরে রাখার দাবি স্থানীয়দের। পাশাপাশি ১১২ বছরের পুরনো এই ঐতিহাসিক নিদর্শন গুলো রক্ষণা বেক্ষণের মাধ্যমে এটিকে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে পর্যটন এলাকায় রূপান্তরিত করতে সরকারের কাছে সর্বমহলের দাবি।
ঢাকা, প্রতিদিন বিশেষ করে যেকোনো ছুটির দিনে নরসিংদী জেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকরা এখানে আসেন অবসর সময় কাটাতে। এখানে দুটি রেলওয়ে সেতু ও পাশেই রয়েছে একটি সড়ক সেতু। আসা যাওয়ার রাস্তাগুলোর সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়েছে। রয়েছে প্রাকৃতিক মনোরম দৃশ্য, যা দেখলে যে কারো মন জুড়াবে।
খেলা: সাঙ্গাকারার সতর্কতা