ফাগুনের নরম রোদ আর মৃদুমন্দ হাওয়ায় আবারও সোনালি স্বপ্নে ভরে উঠেছে রাজশাহী অঞ্চলের আকাশ-বাতাস। সারি সারি আমবাগানে এখন কেবল মুকুলের উচ্ছ্বাস হলুদ আর সবুজের মায়াবী মিশেলে যেন প্রকৃতি নিজেই এঁকেছে এক বিকেল ক্যানভাস। সুবাসিত মুকুলের ঘ্রাণে মাতোয়ারা চারদিক; ভোরের শিশিরে ভেজা প্রতিটি ডালে ঝুলে আছে সম্ভাবনার নীরব প্রতিশ্রুতি।
গতবারের অতিবৃষ্টির ক্ষত এখনও শুকায়নি পুরোপুরি। লোকসানের বেদনাকে বুকে নিয়েই নতুন আশায় বুক বাঁধছেন চাষিরা। কারণ প্রকৃতি এ বছর যেন একটু বেশি দয়ালু। শতভাগ গাছে মুকুলের ছোঁয়া, কোথাও কোথাও আগাম জাতের সবুজ গুটি সব মিলিয়ে বাম্পার ফলনের স্বপ্ন আবারও ডানা মেলেছে।
তবে এই আনন্দের মাঝেও আছে একটুখানি উদ্বেগ। কোথাও কমেছে বাগানের পরিমাণ, কোথাও বদলেছে চাষের ধরন। তবু মাটির মানুষ হার মানতে জানে না। নিয়মিত সেচ, সুষম সার, যতœ আর প্রার্থনায় তারা ধরে রাখতে চায় প্রতিটি মুকুল, প্রতিটি সম্ভাবনা। গত বছর ফলন ভালো হলেও অতিবৃষ্টির কারণে অনেক আম নষ্ট হয়ে যায়। এতে দাম কমে গিয়ে ক্ষতির মুখে পড়েন চাষিরা। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে অনেকেই লোকসান গুনেছেন। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবার মৌসুমের শুরু থেকেই বাগান পরিচর্যায় বাড়তি মনোযোগ দিচ্ছেন তারা। নিয়মিত সেচ, আগাছা পরিষ্কার, সুষম সার প্রয়োগ এবং রোগ-পোকার আক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহার করছেন চাষিরা।
রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিয়ে গঠন করা হয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহী অঞ্চল। এই চার জেলায় ৯২ হাজার ৫৫২ হেক্টর জমিতে আমবাগান আছে। এতে গাছ আছে ৩ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ৫৫৪টি। এসব গাছে ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত মুকুল এসেছে। পর্যায়ক্রমে সব গাছে শতভাগ মুকুল চলে আসবে আশা করছে কৃষি অফিস ও চাষিরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহী অঞ্চলের তথ্য বলছে, গেল মৌসুমে রাজশাহীতে ২ লাখ ৬০ হাজার টন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ লাখ ৫০ হাজার টন, নওগাঁয় ৪ লাখ ৩২ হাজার টন এবং নাটোরে ১ লাখ ৩৪ হাজার টন আম উৎপাদন হয়েছে। এবার উৎপাদন আরও বেশি হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
রাজশাহী জেলাতে আমবাগান আছে ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে। গেল বছর ছিল ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর। এক বছরে কমেছে ৫৪১ হেক্টর আম বাগান। আমের গাছ আছে ৩৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৭৭টি। মুকুল এসেছে ৬০ শতাংশ। নওগাঁ জেলাতে ৩০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আছে আমের বাগান। গেল বছর পরিমাণ ছিল ৩০ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে। জেলায় ২ কোটি ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৩২৫টি আমগাছ আছে। মুকুল এসেছে ৭১ শতাংশ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমবাগান আছে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে। গত বছর ছিল ৩৭ হাজার ৫০৪ হেক্টর জমিতে আম বাগান। জেলায় জমি কমেছে ১৭ হেক্টর। আমগাছ আছে ৯২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৬৫টি। আমের মুকুল এসেছে ৭০ শতাংশ। নাটোরে আমবাগান আছে ৫ হাজার ৬৯ হেক্টর জমিতে গাছ আছে ১৪ লাখ ৮৬ হাজার ১৮৭টি গাছ। মুকুল এসেছে ৫৩ শতাংশ। কৃষি বিভাগ বলছে, এখনও অনেক গাছে মুকুল আসেনি। যেগুলোতে মুকুল এসেছে মৌসুমের শুরুতে সে আমগুলো পাওয়া যায়।
রাজশাহী বাঘা উপজেরার আমচাষি শফিকুল ইসলাম বলেন, গেলবারের চেয়ে এবার গাছে বেশি মুকুল এসেছে। বড় ঝড় না হলে প্রচুর আম পাওয়া যাবে। আবহাওয়া ভালো থাকলে ফলনও খুব ভালো হবে। তবে এখনই নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। নিয়মিত কীটনাশক দেয়া হচ্ছে। পরিচর্যাও করা হচ্ছে।
পুঠিয়ার আমচাষি মোহাম্মদ আলী বলেন, এ বছর মুকুল আসার জন্য আবহাওয়া মৌসুমের শুরু থেকেই ভালো আছে। দিনের বেলায় যে তাপমাত্রা দরকার তা রোদের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে। এরই মধ্যে গাছে গাছে অনেক মুকুল এসেছে। এই রকম আবহাওয়া আর ১০ দিন থাকলে আরও ভালো পরিমাণে মুকুল আসবে। তিনি বলেন, গত বছর মুকুল ভালো হলেও বাজারজাতের সময় টানা বৃষ্টিতে আম নষ্ট হয়ে যায়। দাম না পাওয়ায় অনেক চাষি আর্থিক ক্ষতির শিকার হন। এ বছর ভালো মুকুল আর ভালো ফলনের আশাতেই সবাই বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহী অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, আমের ফলন এবার খুবই ভালো হবে বলে আশা করছি। পাশাপাশি এবার যাতে চাষিরা আম রফতানি করতে পারেন, সে লক্ষ্যেও কাজ চলছে। প্রতিটা উপজেলায় এ ব্যাপারে কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করছেন। আশা করছি এবার ভালো আম রপ্তানি হবে।
রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, এবার শীত খুব সুন্দরভাবেই শেষ হয়েছে। শেষের দিকে কোনো কুয়াশা ছিল না, বৃষ্টিও হয়নি। তাপমাত্রাটা বেড়েছে ধীরে ধীরে। হঠাৎ করে তাপমাত্রা বৃদ্ধি কিংবা কমে যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি। তিনি বলেন, এবার আবহাওয়া মুকুলের জন্য একেবারেই উপযোগী ছিল। তা ছাড়া গতবার মুকুল একটু কম এসেছিল। যেসব গাছে মুকুল কম ছিল, সেগুলোতেও এবার মুকুল এসেছে। এ কারণে প্রচুর মুকুল দেখা যাচ্ছে। এখন চাষিদের গাছে সেচ দিতে হবে। আর মুকুল আসার পর একবার ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক স্প্রে করতে হবে। তাহলে মুকুল টিকে যাবে।
অর্থ-বাণিজ্য: বিদেশি ঋণ পাওয়ার চেয়ে পরিশোধই বেশি
আন্তর্জাতিক: পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাতে কী বলছে ভারত