image

ঘটনাস্থল লক্ষীপুরের বশিকপুর

অস্ত্র ঠেকিয়ে, হাত-মুখ বেঁধে জিম্মি করে বাসায় লুটপাট

বাকী বিল্লাহ, ঢাকা ও মাসুদুর রহমান, লক্ষীপুর

শেখ হাসিনা সরকারের সময়ের সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে পরিচিত লক্ষ্মীপুর জেলার বশিকপুরে গত ১ সাপ্তাহে পরপর ৩টি বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ডাকাতদের হামলায় বাড়ির বৃদ্ধ থেকে শুরু করে গর্ভবর্তী নারীও নির্যাতন থেকে রেহাই পায়নি।

ডাকাতরা কাউকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে, হাত-মুখ বেঁধে ও কম্বল দিয়ে চেপে ধরে বাসার আলমারির চাবি নিয়ে লুটপাট করেছে। আরেক বাসার সবাইকে মারধর করে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার হাতিয়ে নিয়েছে। ঈদে সন্তানদের জামাকাপড় কেনার জন্য জমানো টাকাও ডাকাতরা লুট করে নিয়ে গেছে।

গত ১৭-২৩ ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন সময় এসব ডাকাতি সংঘঠিত হয়েছে। গত শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সরজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা ডাকাতির তথ্য জানিয়েছেন।

সরজমিনে গিয়ে জানা গেছে, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সেহেরি খাওয়ার জন্য উঠলে রাত আনুমানিক পোনে ৪টার দিকে বশিকপুর ইউনিয়নে পূর্ব বশিকপুর গ্রামে আবুল বাসারের বাড়িতে ৬/৭ জন্য সশস্ত্র ডাকাত ঘরে ঢুকে পড়ে। এ সময় বাড়ির বাইরে ও আরও কয়েকজন ডাকাত পাহারায় ছিল বলে জানান ঘরের বাসিন্দা মো. আল আমিন।

এক সপ্তাহে ৩ বাড়িতে ডাকাতি, লুটপাট। ডাকাতরা ৫ মাসের গর্ভবর্তী নারীর পেটে লাথি মেরে আহত করেছে

এলাকাজুড়ে আতঙ্ক, রাত জেগে গ্রামবাসী পাহারা দিচ্ছেন

একটি ঘটনায় পুলিশ মামলা না দিয়ে জিডি নিয়েছে

ডাকাত দল ঐ বাড়ির নারী সদস্যসহ সব সদস্যকে এলোপাতাড়ি মারধর করে এবং গামছা দিয়ে হাত-পা বেঁধে এবং মুখ কাপড় দিয়ে ২ ভরি স্বর্ণালংকার ও চোখের লেন্স লাগানোর জন্য নগদ ৫০ হাজার টাকা, ৩টি মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যায় ডাকাতদল।

আবুল বাসারের স্ত্রী মারজাহান বলেন, ডাকাতরা পিস্তল দেখিয়ে আমার নাকফুল ও গলার চেইন নিয়ে যায় এবং আমার ছেলে আল আমিনের স্ত্রী বীথি আক্তার ৫ মাসের অন্তসত্ত্বাকে ব্যাপকভাবে মারধর করে ও পেটে লাথি মারে। এতে সেসহ পেটের বাচ্চা মারাত্মকভাবে আহত হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিদর্শন করলে কোনো সহযোগিতা পাইনি বলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা অভিযোগ করেন।

এদিকে গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাত ২টা দিকে বশিকপুর ইউনিয়নে খোদাওয়ান্দপুর গ্রামের নুরুল ইসলামের জানালার গ্রিল ভেঙে একদল ডাকাত ঘরে প্রবেশ করে।

১ ভরি স্বর্ণালংকারসহ নগদ ১৪ হাজার টাকা ৫টি মোবাইল ফোন সেটসহ মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যায়। বাড়ির বাসিন্দা মো. জাবির হোসেন বলেন, আমি ঘুমে ছিলাম আমাকে প্রথমে ডাকাতরা এসে মাথায় স্টিলের লাইট দিয়ে আঘাত করে বলে বাসার সব জিনিসপত্র বের করে দিতে এবং আমার ভাই তানভির হোসেন কে পিস্তল দেখিয়ে বলে কোনো কথা না বলতে তার স্ত্রী রাফিয়া আক্তার কে ও মারধর করেন ডাকাতদল জিনিসপত্র বের করার জন্য। পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিদর্শন করলে ও কোনো ধরনের সহোযোগিতা পাইনি বলে অভিযোগ করেন নুরুল ইসলামের পরিবারের সদস্যরা।

এর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারি রাত ২টার দিকে বশিকপুর ইউনিয়নে খোদাওয়ান্দপুর গ্রামের স্থানীয় পোস্টমাস্টার মাহাবুব আলমের বাড়িতে ডাকাত ঘরে প্রবেশ করে।

মাহবুব আলম রাত ২টার দিকে প্রকৃতিকর ডাকে সারা দিতে ঘর থেকে বের হলে তার মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে তার বসত ঘরে প্রবেশ করে। তার মুখ বেঁধে ফেলে। ঘরের বাসিন্দা মাহাবুব আলম বলেন, তার স্ত্রী শারমিন আক্তার ও মা পেয়েরা বেগমকে মারধর করে আলমারি ভেঙে তার মায়ের কানের দুল ও বাচ্চার কানের দুলসহ ১৪ আনা স্বর্ণালংকার নগদ ২০ হাজার টাকা ও ২টি মোবাইল ফোন সেটসহ মূল্যবান জিনিসপত্র ডাকাতদল নিয়া যায়।

ঘটনার খবর শুনে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন তেমন কোনো সহযোগিতা পাইনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে আমার পোস্ট অফিসের পোজ মেশিন নিয়ে যাওয়ার চন্দ্রগঞ্জ থানার পুলিশ শুধু জিডি করতে বলেছে। এখন আমরা আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেছি। পুরো বশিকপুর এলাকার মানুষ ডাকাত আতঙ্কে ভুগতেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

এলাকার একজন ওষুধ ব্যবসায়ী সংবাদকে মুঠোফোনে ডাকাতির ঘটনা জানিয়ে বলেন, সন্ধ্যার পর এলাকাজুড়ে এখন ডাকাত আতঙ্ক বিরাজ করছে। বশিকপুর ইউনিয়নের কাশিপুর ,পুরান বৌদ্দার বাড়ি, মোল্লাবাড়িতে ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনার পর এখন বাজারে সন্ধ্যার পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কখন কার ওপর হামলা ও লুটপাট চালানো হয়। এ নিয়ে তারা এখন আতঙ্কে দিন কাটাছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ ঘটনার খবর শুনে বাড়িতে পুলিশ গেলেও আর মামলা দিচ্ছে না। আবার অনেকেই ডাকাতদের বিরুদ্ধে মামলা করতে সাহস পাচ্ছে না। যদি পুরো পরিবারকে হত্যা দেয়। অনেকেই ধর্মীয়ভাবে আল্লাহর কাছে বিচার দিয়ে কান্নাকাটি করছেন।

পৌদ্দারবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মধূসূদন দা সংবাদকে বলেন, ডাকাতি হয়েছে। তাদের থানায় গিয়ে অভিযোগ করতে বলেছি। এরপর আর কোনো খবর তার কাছে নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

স্থানীয় ইউপি মেম্বার মো. শরীফ ও আবুল কালাম সংবাদকে বলেন, ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কোনো ডাকাত গ্রেপ্তার হয়নি। এলাকায় ডাকাত, সন্ত্রাসী ও মাদককারবারি আধিপত্য বিস্তার করছে। তাদের বিরুদ্ধে কেউ মামলা করতেও সাহস পাচ্ছে না।

এ সম্পর্কে স্থানীয় বিএনপি নেতা মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ সংবাদকে মুঠোফোনে বলেন, ঘটনার খবর শুনে তারা গেছে। পরিবারকে মামলা করতে বলেছেন। ভয় ফেলে অজ্ঞাত হিসেবে মামলা করার জন্য বলা হয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে ডাকাতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়েছে। কিন্তু কেউ মামলা করছে না।

স্থানীয় একজন গৃহবধূ মুঠোফোনে বলেন, এলাকায় আতঙ্কে দিন কটছি। সন্ধ্যার পর ডাকাত আতঙ্কে থাকি। অনেকেই আত্মীয় -স্বজনদের বাড়ি গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে।

উপজেলা বিএনপি নেতা ইসমাইল হোসেন পাটওয়ারি বলেন, ডাকাতির খবর শুনে ঘটনাস্থলে গিয়েছি। তাদের আইনি ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এলাকায় সন্ত্রাসীরা প্রভাব বিস্তার করছে। পুলিশ মামলা নিতে চায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ সম্পর্কে চট্টগ্রাম বিভাগের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশের সঙ্গে সংবাদ থেকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু চন্দ্রগঞ্জ থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি অবশ্য ডাকাতির ঘটনা ভিন্ন খাতে বলার চেষ্টা করছে। পোস্টমাস্টার মাহবুব আলমের বাড়ির ঘটনায় জিডি নেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ডাকাতির ঘটনার পর পোস্টমাস্টার ও মাদ্রাসা কম্পপিউটার অপারেটর মাহবুব আলম জানান, তার বাড়ি বশিকপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রাত ২টার দিকে বাসা থেকে দরজা খুলে প্রসাব করতে বের হন। এরপর বাসায় ঢোকার সময় মুখোশধারী ৫/৬ জন তাকে ঘেরাও করে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে বাসায় ঢোকায়।

তার মা ও স্ত্রীর হাত-মুখ বেঁধে কম্বল দিয়ে চেপে ধরে। বাসার আলমারির চাবি নিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা ঘরে লুটপাট করে। ডাকাতদল স্বর্ণালংকার থেকে পায়ের জুতাসহ সর্বস্ব লুট করে নিয়ে গেছে বলে তিনি জানান।

বাসা থেকে ঈদের বাজার খরচের জন্য রাখা ২০ হাজার টাকা, স্ত্রীর কানের দুল তিন জোড়া, আংটি ৪টিসহ অন্যান্য জামা-কাপড় হাতিয়ে নিয়ে গেছে। ঘটনার খবর শুনে স্থানীয় পৌদ্দারবাজার পুলিশ ফাঁড়ি থেকে পুলিশ, চন্দ্রগঞ্জ থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে জানান। তারা সবই শুনেছেন। কাগজে লিখে নিয়ে গেছেন।

পরবর্তীতে বাড়ির মালিক মাহবুব আলম থানায় যোগাযোগ করে অভিযোগ করতে গেলে পুলিশ বলছে কিছু লাগবে না। আমরা ঘটনা দেখবো।

এই সম্পর্কে চন্দ্রগঞ্জ থানার ওসি সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, এটা ডাকাতি কিনা বশিকপুর গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখেন। কিন্তু ঘটনাটি ডাকাতি না দস্যুতা তা নিয়ে তিনি মন্তব্য না করে উত্তেজিত হয়ে যান এবং ফোন কেটে দেন। তার উত্তেজিত হওয়ার খবর পুলিশ সদর দপ্তরে মিডিয়া শাখাকে জানানো হয়েছে। এরপর সরজমিনে সংবাদের জেলা বার্তা পরিবেশক ওই এলাকা ঘুরে ডাকাতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নির্যাতিত পরিবারের বক্তব্য, রেকর্ড, ভিডিও করে আনা হয়েছে। যা সংরক্ষিত আছে।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি