সুনামগঞ্জ জেলার চলমান হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ না হওয়ায় হাওরপাড়ের কৃষকদের মাঝে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সংগঠন বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম করে দ্রুত কাজ সম্পন্নের দাবি জানিয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে রাজপথে নামারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ। সাত একর জমিতে কঠোর পরিশ্রম করে ফসল ফলানো কৃপেশ দাসের মতো লাখো কৃষকের চোখে এখন সোনালি স্বপ্নের বদলে দুশ্চিন্তার ছায়া। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অর্ধেকের বেশি কাজ এখনো বাকি। ধীরগতির কাজ ও অনিয়মের অভিযোগে জেলার প্রধান বোরো ফসল ঝুঁকিতে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, এ বছর সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১৮টি প্রকল্পের মাধ্যমে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কারের কাজ হাতে নেওয়া হয়। নীতিমালা অনুযায়ী ১৫ ডিসেম্বর কাজ শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। অনেক এলাকায় এখনো মাটির কাজ শেষ হয়নি; কোথাও কোথাও শুধু ঘাস লাগানোর প্রস্তুতি চলছে।
২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি এখনো ভোলেননি হাওরবাসী। সে বছর বাঁধ ভেঙে প্রায় শতভাগ ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। খরচার হাওরপারের কৃষক আবুল কাসেম (৬৫) বলেন, “২০১৭ সালে বাঁধের দুর্নীতি আর অবহেলার কারণে আমরা পথে বসেছিলাম। ২০২৬ সালেও যদি একই পরিস্থিতি হয়, তাহলে আমাদের আর কিছু করার থাকবে না।”
হাওর সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর দাবি, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও স্থানীয় পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) যে অগ্রগতির তথ্য দিচ্ছে, বাস্তবের সঙ্গে তার মিল নেই। হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিজন সেন রায় বলেন, “গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার অনিয়ম ও গাফিলতি বেশি। শাল্লাসহ কয়েকটি উপজেলায় কাজ শুরুই হয়নি।”
হাওর ও নদী রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন অভিযোগ করেন, “গত বছরের অক্ষত বাঁধগুলোতেও নতুন বরাদ্দ দেখিয়ে অনিয়ম করা হচ্ছে। প্রথম দফার আগাম বন্যাতেই এসব নড়বড়ে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার কাজের ধীরগতির কারণ হিসেবে নির্বাচনজনিত ব্যস্ততার কথা উল্লেখ করে ১৫ দিন সময় বাড়ানোর কথা জানান। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—মার্চ মাসে সম্ভাব্য আগাম বন্যার আগে এই বাড়তি সময় কতটা কার্যকর হবে?
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া মনিটরিং জোরদারের আশ্বাস দিলেও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি কম বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা দ্রুত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
পিআইসির মাধ্যমে বাস্তবায়িত বাঁধের কাজ ১৫ ডিসেম্বর শুরু হয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে দাবি করা হলেও কৃষকদের মতে বাস্তবে ৫০ শতাংশ কাজও সম্পন্ন হয়নি। জেলার ৯৫টি হাওরের মধ্যে ৫৩টি হাওরে ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১৮টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে বড় ভাঙনসংবলিত ক্লোজার রয়েছে ১১০টি।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, জেলার ১২ উপজেলায় এ বছর ২ লাখ ৩০ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ লাখ মেট্রিক টন ধান, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার ২৮ কোটি টাকা।
হাওরবাসীর আশঙ্কা, সময়মতো বাঁধের কাজ শেষ না হলে বিপুল পরিমাণ ফসল ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং জেলার অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক: খামেনি হত্যা আন্তর্জাতিক আইন ও রীতির সরাসরি লঙ্ঘন
অপরাধ ও দুর্নীতি: মার্কিন দূতাবাসের নিরাপত্তা জোরদার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী