image

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ধ্বংসের পথে

প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল

চায়ের সবুজ সমুদ্র, পাহাড়ি ছড়া আর কুয়াশায় মোড়া টিলাময় বনভূমি—শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ অঞ্চলের প্রকৃতির মূল আকর্ষণ লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। সিলেট বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সংরক্ষিত বনাঞ্চল একসময় ভানুগাছের পাহাড় নামে পরিচিত ছিল। নব্বইয়ের দশকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণার পর এটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম গন্তব্যে পরিণত হয়। কিন্তু সময়ের প্রবাহে সেই সবুজ অভয়ারণ্য আজ গভীর সংকটের মুখে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক দশক ধরে মূল্যবান সেগুন, মেহগনি, গর্জন ও বাঁশসহ বিভিন্ন বনজ সম্পদ অবৈধভাবে কেটে পাচার করা হয়েছে। সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী গোষ্ঠী বনাঞ্চলে প্রবেশ করে কোটি কোটি টাকার গাছ ও বনজ সম্পদ লুটপাট করেছে বলে এলাকাবাসীর দাবি। এসব লুটপাটের মাধ্যমে জড়িতদের কেউ কেউ বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন—দেশে-বিদেশে ফ্ল্যাট, বাড়ি, গাড়ি, হোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এমনকি স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, লাঠিয়াল বাহিনী ও অর্থবল কাজে লাগিয়ে তাদের অনেকে জনপ্রতিনিধি হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে বন উজাড়ের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই কার্যত ‘ওপেন সিক্রেট’ হয়ে আছে। সাধারণ মানুষ অনেক কিছু জানলেও নিরাপত্তা ও প্রতিক্রিয়ার ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পান না বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে একশ্রেণীর দুর্নীতিগ্রস্ত বন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার কথাও স্থানীয়দের আলোচনায় উঠে আসে। যদিও এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রমাণভিত্তিক যাচাই জরুরি, তবু বনাঞ্চলের দৃশ্যমান পরিবর্তন পরিস্থিতির গুরুত্বই তুলে ধরে।

বড় ও প্রাচীন বৃক্ষ কমে যাওয়ায় ছায়াপ্রধান বনের স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে যাচ্ছে। এতে পাখি, সরীসৃপ ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। বনভূমির ঘনত্ব কমলে মাটির আর্দ্রতা, জলধারা ও স্থানীয় জলবায়ুতেও বিরূপ প্রভাব পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বন উজাড় কেবল গাছ হারানোর বিষয় নয়—এটি পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করে।

বনাঞ্চল সংকুচিত হওয়ায় খাদ্য ও আশ্রয়ের অভাবে বন্যপ্রাণীরা লোকালয়ে চলে আসছে। সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলে একটি অজগর সাপ বাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়ার ঘটনা তারই প্রতিফলন।

শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়ক লাউয়াছড়ার ভেতর দিয়ে অতিক্রম করেছে। দ্রুতগতির যানবাহনের নিচে চাপা পড়ে প্রায়ই বন্যপ্রাণীর মৃত্যু হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানান। একইভাবে ঢাকা-সিলেট রেলপথ বনাঞ্চল অতিক্রম করায় ট্রেনের শব্দ ও কম্পনে প্রাণীরা আতঙ্কিত হয়; অনেক সময় দুর্ঘটনাও ঘটে। এতে প্রাণীদের বিচরণক্ষেত্র খণ্ডিত হচ্ছে এবং বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, অবৈধ কাঠ ও বাঁশ পাচার রোধে কার্যকর নজরদারি, আইন প্রয়োগে কঠোরতা ও বন ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ চলাচলের জন্য করিডোর ও আন্ডারপাস নির্মাণ, সড়কে গতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

লাউয়াছড়া কেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি দেশের পরিবেশগত নিরাপত্তা ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ ভাণ্ডার। উন্নয়ন, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বন সংরক্ষণে কার্যকর ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে এই সবুজ ঐতিহ্য একদিন ইতিহাস হয়ে যেতে পারে। এখনই সময়—লাউয়াছড়াকে বাঁচাতে সাহসী ও স্বচ্ছ উদ্যোগ গ্রহণের।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি