image
যমুনার চরে চাষাবাদ। স্বপ্ন দেখছেন কৃষকরা -সংবাদ

যমুনার বালুচরে সূর্যমুখীর হাসিতে স্বপ্ন বুনছেন কৃষকরা, বাণিজ্যিক চাষাবাদ বাড়ছে

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, টাঙ্গাইল

টাঙ্গাইলের ধু ধু যমুনার বুকে সূর্যমুখী যেন এক টুকরা বন্দী রোদ। ভোরের শিশিরভেজা ঘাসে যখন সূর্যের প্রথম পরশ লাগে তখন এই হেমন্ত-বসন্তের সোনালি অলঙ্কারগুলো যেন প্রেমের এক চিরন্তন সংলাপে মেতে ওঠে। সূর্যমুখীর প্রতিটি পাপড়ি যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক একটি স্বপ্ন- যা কেবল আলোর তৃষ্ণায় চাতক পাখির মতো আকাশের পানে চেয়ে থাকে। যমুনার বিস্তীর্ণ তীর-মাঠজুড়ে এখন এমনই হলুদের আভা। দিগন্তজুড়ে বড় বড় থালার মতো সূর্যমুখী ফুল বাতাসের তালে দুলছে। ভোরের স্নিগ্ধ আলো যখন এসব ফুলের ওপর পড়ে, তখন চারপাশ যেন এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। ভোরের আলো ফুটতেই যমুনা নদীর বাম তীরে টাঙ্গাইল অংশে ঝলমল করে উঠে সূর্যমুখী ফুলের সোনালি হাসি। সবুজ পাতার আড়াল ভেদ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ফুলগুলো যেন সূর্যের দিকে তাকিয়ে নতুন দিনকে অভিবাদন জানায়। ধু ধু বেলে-দোআঁশ নদীতীরের বিস্তৃত এই হলদে আভা প্রকৃতির শোভা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে টাঙ্গাইলের কৃষকদের চোখেমুখে ফুটিয়ে তুলেছে সচ্ছলতার স্বপ্ন। শুধু সৌন্দর্য নয়, সূর্যমুখী এখন এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য হয়ে উঠেছে বাড়তি আয়ের এক নতুন আশার নাম। ফলে জেলায় দিন দিন সূর্যমুখীর চাষাবাদ বাড়ছে।

টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরে জেলার ১২টি উপজেলায় মোট ১৭৮ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ করা হয়েছে। এরমধ্যে সদর উপজেলায় ৪৫ হেক্টর, বাসাইলে ৪৬ হেক্টর, কালিহাতীতে ৮ হেক্টর, ঘাটাইলে ১০ হেক্টর, নাগরপুরে ১০ হেক্টর, মির্জাপুরে ১০ হেক্টর, মধুপুরে ১৪ হেক্টর, ভূঞাপুরে ৫ হেক্টর, গোপালপুরে ৫ হেক্টর, সখীপুরে ৩ হেক্টর, দেলদুয়ারে ২০ হেক্টর এবং ধনবাড়ী উপজেলায় ২ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ করা হয়েছে। চলতি মৌসুমে টাঙ্গাইল জেলায় সূর্যমুখীর বাম্পার ফলন হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকা এবং কৃষি বিভাগের যথাযথ সহযোগিতায় এবারে জেলার চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন উপজেলায় এই তৈলবীজ চাষে নীরব বিপ্লব ঘটেছে। গত বছরের চেয়ে এবার ৮-১০ হেক্টর বেশি জমিতে সূর্যমুখীর চাষ হয়েছে। সখের সূর্যমুখী এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের মর্যাদা পেয়েছে। দিগন্তজোড়া হলুদ ফুলের সমারোহ দেখতে যেমন ছাত্র-ছাত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকাসহ নানা বয়সী দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন। তেমনি লাভের অঙ্ক কষতে শুরু করেছেন কৃষকরা।

সূত্রমতে, টাঙ্গাইলের চরাঞ্চলের বিশাল এলাকা এক সময় অনাবাদি পড়ে থাকতো, সেখানে এখন সূর্যমুখীর চাষ হচ্ছে। কৃষি বিভাগ মনে করছে, যদি এ ধারা অব্যাহত থাকে তবে আগামী কয়েক বছরে জেলায় সূর্যমুখী চাষের পরিধি কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। যমুনার পাড়ে এখন কেবল ফুল নয়, ফুটছে কৃষকের ভাগ্য। সবুজ প্রকৃতি আর হলুদের মিতালীতে টাঙ্গাইলের মাঠ এখন এক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি। সেই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক সফল কৃষি অর্থনীতির গল্প। সূর্যমুখীর এই সোনালি হাসি টাঙ্গাইলের কৃষকের জীবনে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য নিয়ে এসেছে।

সরেজমিন যমুনা নদীর তীরবর্তী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, যেখানে ধু ধু বালুচর ছাড়া আর কিছু চোখে পড়তো না সেখানে হলদে আভার সৌন্দর্য সবাইকে মুগ্ধ করে। চাষিরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন সূর্যমুখীর পরিচর্যায়। হেমন্তে ফোঁটা সূর্যমুখীর ফুল সাধারণত বসন্তে পরিপক্ক হয়। এখন প্রতিটি ফুলই পূর্ণ বয়স্ক, আর কয়েকদিন পরই ঘরে তুলতে হবে। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সূর্যমুখী চাষে খরচ ও পরিশ্রম দুই-ই কম, কিন্তু লাভ তুলনামূলক বেশি। প্রতি বিঘা জমিতে সূর্যমুখী আবাদে খরচ হয় মাত্র ৫-৬ হাজার টাকা। অথচ ভালো ফলন হলে বিঘা প্রতি ২০-২৫ হাজার টাকার বীজ বিক্রি করা সম্ভব। এছাড়া সূর্যমুখীর খৈল মাছ ও পশুর খাদ্য হিসেবে এবং শুকনো গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এলাকায় যদি বড় আকারে তেল মাড়াইয়ের ব্যবস্থা ও সরকারিভাবে বীজ কেনার ব্যবস্থা থাকে। তবে সূর্যমুখী চাষে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।

স্থানীয় কৃষক নাজিমুদ্দিন, আবুল কালাম, নাজমুল ইসলাম, খবির উদ্দিন, আব্দুর রহমানসহ অনেকেই জানান, যমুনা তীরের বেলে মাটিতে বাদাম, আলু, তিল, তিশি ইত্যাদি ফসল আবাদ হলেও খরচের তুলনায় উৎপাদন খুবই কম হয়। ওসব ফসলের তুলনায় সূর্যমুখী চাষে খরচ অনেক কম কিন্তু লাভ বেশি উৎপাদনও হয় অনেক বেশি। সদর উপজেলার কৃষক ফরমান আলী ও বোরহান তালুকদার জানান, আগে এসব জমিতে কোনো ফসলই উৎপাদন করা যেত না। কিছু কিছু জায়গায় তিল-তিশি-বাদাম লাগানো যেত। কিন্তু ফলন ভালো হতো না। এবার কৃষি অফিসের পরামর্শে সূর্যমুখী লাগিয়েছেন। গাছ খুব ভালো হয়েছে, প্রতিটি ফুলেই দানা পুষ্ট দেখা যাচ্ছে। বাজারে ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন তারা। কৃষকরা জানান, ভালো ফলনের জন্য সাধারণত ২-৩ বার সেচের প্রয়োজন হয়। প্রথমটি চারা গজানোর ২৫-৩০ দিন পর এবং দ্বিতীয়টি ফুল আসার আগে। এছাড়া আগাছা পরিষ্কার রাখা এবং মাটি আলগা করে দেয়া (নিড়ানি) জরুরি। যখন ফুলের পেছনের অংশ হলুদ থেকে বাদামী বর্ণ ধারণ করে এবং বীজগুলো কালো ও শক্ত হয়। তখন ফুল কেটে সংগ্রহ করতে হয়।

কৃষিবিদরা জানান, বাংলাদেশে সূর্যমুখী চাষের প্রধান সময় রবি মৌসুম (অগ্রহায়ণ বা মধ্য-নভেম্বর থেকে মধ্য-ডিসেম্বর)। তবে এটি সারা বছরই চাষ করা যায়। মাটির ক্ষেত্রে সুনিষ্কাশিত বেলে-দোআঁশ বা দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। বিশ^ব্যাপী সূর্যমুখীর ৭০টিরও বেশি প্রজাতি রয়েছে। বাংলাদেশে সাধারণত বারি সূর্যমুখী-২ (উচ্চ ফলনশীল), হাইসান-৩৩ (হাইব্রিড), ডিএস-১ এবং বারি সূর্যমুখী-৩ জাতের চাষাবাদ হয়ে থাকে। বারি সূর্যমুখী-২: এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় জাত। গাছের উচ্চতা ১২৫-১৪০ সেমি এবং বীজে ৪২-৪৪% তেল থাকে। হাইসান-৩৩ (হাইব্রিড): এটি ব্র্যাক বীজ দ্বারা আমদানিকৃত একটি উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড জাত। সাধারণ জাতের চেয়ে এর ফলন প্রায় দ্বিগুণ এবং এটি লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। ডিএস-১ এটি একটি উন্নতমানের জাত যা স্থানীয়ভাবে চাষ করা হয়। বারি সূর্যমুখী-৩: এটি তুলনামূলকভাবে আগাম পরিপক্ক হয় (প্রায় ১০৩ দিন)।

পুষ্টিবিদদের মতে, সূর্যমুখীর তেল হৃদরোগীদের জন্য অত্যন্ত উপকারী এবং এতে কোলেস্টেরলের মাত্রা খুব কম থাকে। বাজারে সয়াবিন তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এই তেলের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। টাঙ্গাইলের এই ১৭৮ হেক্টর জমির ফলন স্থানীয় তেলের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সাহিত্যের ভাষায়, সূর্যমুখী চাষ কোনো সাধারণ কৃষি কাজ নয়- এ যেন এক শুদ্ধ আরাধনা। মাটির গভীর মমতা থেকে রস নিয়ে যখন একটি দীর্ঘ সবুজ কা- আকাশের উচ্চতা ছুঁতে চায়, তখন তাতে মিশে থাকে কৃষকের গভীর ভালোবাসা আর শ্রমের ঘ্রাণ। হলুদ আভার সেই মায়াবী হাসি কেবল চোখের প্রশান্তি নয় বরং এ যেন এক জীবন্ত দিকনির্দেশনা। বিপদের আঁধারেও কীভাবে মুখ ফেরাতে হয় চিরন্তন আলোর দিকে, তারই দৃষ্টান্ত। বাতাসের দোলায় যখন মাইলের পর মাইল হলুদ সমুদ্রের মতো ঢেউ খেলে যায়। তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন তার সমস্ত হিরণয় রূপ এই মাঠেই ঢেলে দিয়েছে। সূর্যমুখী কেবল একটি ফুল নয়, এটি সূর্যের প্রতি পৃথিবীর এক গোপন প্রেমপত্র- যেখানে প্রতিটি বীজ আগামী দিনের নতুন এক সূর্য ওঠার গল্প বুনে রাখে।

টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ অফিসার মোহাম্মদ দুলাল উদ্দিন জানান, সূর্যমুখী চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে সরকার বিশেষ প্রণোদনা দিচ্ছে। কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে নিয়মিত পরামর্শ, প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সার ও বীজ সহায়তা দেয়া হয়েছে।

টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আশেক পারভেজ জানান, ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে এবং পুষ্টিকর তেলের চাহিদা মেটাতে কৃষকদের এই অর্থকরী ফসল চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের পাশে থেকে উন্নতজাতের বীজ ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা ধারণা দিয়েছে। যমুনার পলিবিধৌত ঊর্ব্বর মাটি সূর্যমুখী চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় ফলনও হয়েছে আশাতীত। সূর্যমুখী চাষ শুধু কৃষকের আয় বাড়াবে না, এটি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী তেলের অভাবও পূরণ করবে বলে মনে করেন এ কর্মকর্তা।

ছবির ক্যাপসন: চলতি মৌসুমে টাঙ্গাইলের যমুনা নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চলে সূর্যমুখীর বাম্পার ফলন হয়েছে।

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

সম্প্রতি