পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পাড় করছে কিশোরগঞ্জের ভৈরবের পাদুকা কারিগররা। দিন রাত বিরামহীন পরিশ্রম করছেন বাড়তি রোজগারের আশায়। সনাতন পদ্ধতির পাশাপাশি এ শিল্পে সংযোজন হয়েছে আধুনিক অটো মেশিন। যেখানে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে রপ্তানি যোগ্য হাজার হাজার পাদুকা। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় বড় কারখানার সমন্বয়ে দেশের সর্ববৃহৎ পাদুকা বাজার গড়ে উঠেছে এখন ভৈরবে। এখানকার শহরাঞ্চলসহ বিভিন্ন গ্রামের আনাচে কানাচে গড়ে ওঠেছে ৫০ থেকে ৬০টি পাদুকা পল্লী। পল্লীগুলোয় রয়েছে ৩-৪ হাজার ছোট বড় কারখানা ও কারখানাগুলোয় রয়েছে প্রায় লক্ষাধিক নারী ও পুরুষ শ্রমিক। ভৈরবের পাদুকা শিল্পের আধুনিকতায়ন ও বিশ্বায়ন করা যেন এখন সময়ের দাবী। কারখানাগুলো নজর দিলে দেখা যায় দক্ষ কারিগরের সংকট।
রমজানের শুরতে পাদুকার চাহিদা কম থাকলেও রমজানের পনেরোর পর থেকে অনেক খানি বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন পাইকারী ব্যবসায়ীরা। বহির্বিশ্বের অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে স্বল্প সময়ের শীতকাল, গরমকাল পাশাপাশি ঈদ উপলক্ষে পাদুকা তৈরিতে হিমসিম খেতে হচ্ছে পাদুকা কারখানা মালিকদের। কারখানার মালিকরা বলছেন, ভৈরবে বিকাশমান পাদুকা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে একটি কমন ফ্যাসেলিটি কেন্দ্র স্থাপন এখন সময়ের দাবী। প্রতিটি ফ্যাক্টরিতে কারিগর থাকলেও তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা নেই। দেখে দেখে যা শিখেছে তাতেই কোন রকম কাজ করে যাচ্ছে ঈদ উপলক্ষে।
এদিকে ঈদ উপলক্ষে কেনাবেচা থমকে রয়েছে বলছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি বহির্বিশ্বের যুদ্ধাবস্থা ও সারাদেশের অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বিক্রি নেই। তবে এখনো আশা ছাড়েনি ব্যবসায়ীরা তারা মনে করছেন ঈদের রয়েছে আরো দুই সপ্তাহ। এরই মধ্যে ঈদ উপলক্ষে বিক্রির টার্গেট পূরণ করতে পারবেন তারা।
জানা যায়, ভৈরবে ৬০টির মতো পিও ফুটওয়্যার কারখানাসহ ছোট বড় ৩/৪ হাজার কারখানা রয়েছে। ভৈরব শহর জুড়ে বিভিন্ন কারখানায় নারী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার ও পুরুষ শ্রমিক রয়েছে প্রায় দেড় লাখের মতো। এ পাদুকাকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পুরোক্ষভাবে ২ লাখ শ্রমিক ও মালিক এ শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছে। ছয়টির মতো বৃহত্তর পাইকারি মার্কেট এবং ৫০টিরও বেশি পাদুকাশিল্প পল্লী নিয়ে এখানে গড়ে উঠেছে একটি বড় কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক বলয়। যেখানে প্রতিটি কারখানায় প্রতিদিন দৃষ্টি নন্দন হাজার হাজার পাদুকা তৈরী হচ্ছে। ঈদকে কেন্দ্র করে কর্মমুখর এসব পাদুকা কারখানা গুলোতে সনাতন পদ্ধতিতে পাদুকা তৈরীর পশাপাশি আধুনিক অটো মেশিন স্থাপনের কারনে এ শিল্পে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। কম খরচে তৈরি হচ্ছে রকমারী সব পাদুকা। প্রতিটি কারখানায় বিরতিহীন চলছে নানান রং, সাইজ ও ডিজাইনের পাদুকা তৈরীর কাজ। ডিজাইন, সেলাই, কাটিং, সোল তৈরী, পেস্টিং, রং করা, সলিউশন করা, আপার তৈরী, ফিতায় বেনী করা, বাক্স তৈরীর বিভিন্ন রকম কাজের ভিন্ন ভিন্ন কারিগররা যার যার কাজ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। নব্বই দশকের শেষ দিকে দেশ ব্যাপী খ্যাতি অর্জন করে ভৈরবের পাদুকাশিল্প। কারিগরদের দক্ষতায় এখানে তৈরি পাদুকা সুনাম কুরিয়েছে দেশের বিভিন্ন জেলায়।
সরেজমিনে ৪ মার্চ বুধবার শহরের হাজী ফুল মিয়া মার্কেট ও লালু কালু মার্কেট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, হাতে তৈরি পাদুকা শ্রমিকরা তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে সময় কম থাকায় যেখানে দিনে ২০ থেকে ২৪ জোড়া পাদুকা তৈরি করতে পারতো সেখানে ১০/১২ জোড়া পাদুকা তৈরি হচ্ছে। কারখানাগুলিতে হাতে তৈরি পাদুকা ও মেশিনে তৈরী পাদুকা সমান তালে উৎপাদন হচ্ছে। যদিও কারখানা মালিকদের দাবী দক্ষ কারিগর ও দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে কারখানাগুলোতে।
এদিকে পাদুকা কারখানাকে ঘিরে বিভিন্ন জায়গায় কাঁচামাল বিক্রিসহ ম্যাটেরিয়ালসের দোকান গড়ে ওঠেছে কয়েকশত। তাছাড়া রয়েছে বাক্স তৈরির বোর্ড কাটিংয়ের দোকানসহ বাক্স তৈরির কারখানা। গড়ে ওঠেছে বড় বড় কার্টুন তৈরির কারখানা। এসব কারখানায় কাজ করছে কয়েক হাজার নারী ও পুরুষ শ্রমিক।
এ সময় সাইফুল, বাবুল মিয়া, রমজান মিয়া, রফিকুল ইসলাম, সুমন মিয়াসহ বেশ কয়েকজন পাদুকা শ্রমিকের সাথে কথা হলে তারা বলেন, রমজানের সময় বেশী পাদুকা উৎপাদন করে আমরা মালিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিতে পারি। দিনরাত কাজ করছি ধম ফেলার সুযোগ নেই।
ওইসব শ্রমিকরা আরো জানান, সরকারি সহায়তায় যদি একটি ট্রেনিং সেন্টার হতো আমরা আরো দক্ষ হতাম। এতে ভৈরবে দক্ষ কারিগরের সংখ্যা বাড়তো। সেই সাথে পাদুকার মানও আরো বাড়তো। এতে শ্রমিক কারিগর ও মালিকপক্ষ লাভবান হতো।
পাদুকা ব্যবসায়ী হাসিম মিয়া বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর পাদুকার চাহিদা রয়েছে। রোজার শুরুতে বিক্রি বাড়লেও এখন থমকে আছে। তবে ঈদের আগে বিক্রি বাড়বে বলে জানান তিনি।
আরেক ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম বলেন, মেশিনের পাদুকা থেকে হাতে তৈরী পাদুকার অনেক চাহিদা ও সুনাম রয়েছে। ভৈরবের পাদুকার সারা দেশে ডিমান্ড থাকার কারণ পাদুকার টেকসই অনেক ভালো। এজন্য ভৈরব থেকে সারাদেশে পাদুকা সাপ্লাই হয়। ভৈরবের পাদুকার মধ্যে বাচ্চাদের পাদুকার চাহিদা অনেক বেশি।
পাদুকা কারখানা মালিক ইয়াকুব মিয়া বলেন, গত বছর কেমিক্যাল ও কাঁচামাল সংকটে ছিল। এ বছর সংকট না থাকায় ব্যবসায়ীরা কিছু টাকা লাভবান হতে পেরেছে। এ বছর তেমন সংকট না থাকলেও কারখানগুলোতে দক্ষ কারিগর সংকট রয়েছে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকারের বিশেষ সহযোগিতা প্রয়োজন। দ্রুত সময়ের মধ্যে যদি সরকার ভৈরবে একটি কমন ফেসিলিটি সেন্টার বা ট্রেনিং সেন্টার করে দেয় তবেই দক্ষ কারিগর তৈরী হবে পাশাপাশি পাদুকার মান আরো বাড়বে।
ড্রাগন ফুটওয়ার কারখানার মালিক মিজানুর রহমান বলেন, এ বছর শীতকাল স্বল্প সময়ে ছিল। ভেবে ছিলাম শীত বাড়বে তাই তৈরী পাদুকার মজুদ রয়েছে। সেই সাথে গরম ও ঈদ পাশাপাশি সময় হওয়ায় পাদুকার চাহিদা অনেক বেশি হলেও প্রোডাকশন কম। শীতের পাদুকা বিভিন্ন দোকানে এখনো অবিক্রিত পড়ে আছে এরই মধ্যে ঈদ মৌসুম শুরু হয়ে গেছে। ভৈরব বিশাল সম্ভাবনাময় পাদুকা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে এখানকার উৎপাদিত পাদুকা বিদেশে রপ্তানি করতে হবে।
আর সে কারনে এখানে দক্ষ শ্রমিক তৈরী করার জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দরকার।
লেস ফুটওয়ার বিডি কারখানার মালিক ইঞ্জিনিয়ার মো. এরশাদ আলী বলেন, দেশের গ-ি পেরিয়ে বিদেশেও ভৈরবে ৫/৭টি ফ্যক্টরির পাদুকা রপ্তানী হচ্ছে। তবে কারখানাগুলোতে দক্ষ কারিগরের অনেক অভাব রয়েছে। সরকারের বিশেষ নজরদারি থাকলে ও রপ্তানির জন্য স্বল্প লাভে ঋণ দিলে ভৈরবের পাদুকা বিদেশে রপ্তানি করা যাবে। সেই সাথে ভৈরবে একটি ট্রেনিং সেন্টার হলে দক্ষ কারিগর ও পাদুকার মান বাড়বে।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া থেকে আসা ক্রেতা উজ্জল মিয়া, নাদিম মিয়া ও বাজিতপুর থেকে আসা রমিজ উদ্দিন ও শরীফুল ইসলাম জানান, ঈদ আসলে পাদুকার দাম কিছুটা বৃদ্ধি পায়। গত বছরের তুলনায় এবার পাদুকা প্রতি জোড়াতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভৈরবের পাদুকা দামে ও মানে অনেক ভাল ও টেকসই। ভৈরবের পাদুকা কিনে বিক্রি করে লাভবান হওয়া যায়। তাই ভৈরব থেকে পাদুকা নিতে এসেছি।
এ বিষয়ে ভৈরব পাদুকা ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. আল আমিন মিয়া বলেন, করোনার পর থেকে প্রতিবছর কোন না কোন কারনে ভৈরবে পাদুকা শিল্প বিপর্যয়ে সম্মুখিন হতে হয়েছে। এ বছর পাদুকা ব্যবসায়ীরা কিছুটা আলোর মুখ দেখতে পাচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে এখানকার উৎপাদিত পাদুকা বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা করতে হবে। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এ বছর ব্যবসা অনেকটা বেড়েছে। বস্ত্র শিল্পের পাশাপাশি পাদুকা শিল্পেও সরকারের আন্তরিকতা প্রয়োজন। ভৈরবে একটি কমন ফেসিলিটি সেন্টার হলে শ্রমিকরা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অত্যাধুনিক পাদুকা তৈরি করতে পারবেন ও তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিগত সরকারের আমলেও একাধিকবার আবেদন করেছি একটি কমন ফেসিলিটি সেন্টার যেন হয়। কিন্তু সরকারের কোন নজরদারি তেমন ছিলনা। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। ভৈরবের মাননীয় সংসদ সদস্য এখন প্রতিমন্ত্রী হয়েছে। তিনি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। আমাদের পাদুকা ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুরোধ ভৈরবের ঐতিহ্যবাহী পাদুকা শিল্পকে বাঁচাতে যেন সর্বাত্মক সহায়তা করেন। শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখতে এখানে একটি কমন ফেসেলিটি কেন্দ্র নির্মাণের দাবী করছেন তিনি। এছাড়াও তিনি আরও বলেন, কিছুদিন যেতে না যেতে ভৈরবে পাদুকা কারখানাগুলো অগ্নিকা-ের শিকার হয়। কিন্তু সরকারি কোন সহায়তা পাওয়া যায় না। সরকারের সুদৃষ্টি না থাকলে পাদুকা ব্যবসা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাবে।
এদিকে ভৈরবের পাদুকা শিল্প নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন পপি’র এসইপি প্রকল্প ও নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সুইস কন্ট্যাক্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও রয়েছে বিশ্বব্যাংকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে আরো কয়েকটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পাদুকার মালিক ও পাদুকা শ্রমিকদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে ও বাজারজাত করণেরও ব্যবস্থা করে দেন। তাছাড়া পাদুকা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত সমস্যাসহ পাদুকা তৈরির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও ওইসব প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছেন।
ভৈরব : ব্যস্ত সময় পাড় করছে কিশোরগঞ্জের ভৈরবের পাদুকা কারিগররা