image

সরকারি ভ্যাকসিন বাণিজ্যে পকেট ভারী করছেন কর্মকর্তারা

প্রতিনিধি, চরফ্যাশন (ভোলা)

গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির নির্ধারিত মূল্যের সরকারি ভ্যাকসিন বাড়তি দামে বিক্রি করে নিজেদের পকেট ভারী করার অভিযোগ উঠেছে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের চার উপসহকারি ও অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটরের বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন ধরে তারা এ অনিয়ম করে আসছেন বলে অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের দাবি, কিছু ভ্যাকসিন ভেঙে বা নষ্ট হয়ে যায় সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতেই অতিরিক্ত টাকা নেয়া হয়।

হাঁস-মুরগি পালনকারীদের অভিযোগ, বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত বড় মুরগির সরকারি ভ্যাকসিনের নির্ধারিত মূল্য ২৫ টাকার পরিবর্তে ৩০ টাকা এবং বড় হাঁসের ভ্যাকসিন ৫০ টাকার পরিবর্তে ৬০ টাকায় বিক্রি করছেন উপসহকারী কর্মকর্তা (সম্প্রসারণ) মোহাম্মদ লোকমান, আবুল বসার, মো. মিজানুর রহমান ও শঙ্কর কৃষ্ণ দাস।

গবাদিপশু পালনকারীদের অভিযোগ, লাম্পি স্কিন ডিজিজ রোগে আক্রান্ত পাঁচ মাত্রার এক বোতল গরুর ভ্যাকসিন সরকার নির্ধারিত মূল্য ২৫০ টাকা। এক বোতল ভ্যাকসিন থেকে পাঁচটি গরুকে একমাত্রা করে প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু চারজন উপসহকারী ও অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর জহির গ্রামে গিয়ে একমাত্রা ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে গরু প্রতি ৩০০ টাকা করে নেয়। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত ১ হাজার ২৫০ টাকা বাড়তি নেন। এ ছাড়া গলাফুলা ও খুঁড়া রোগের ভ্যাকসিনের দামও বেশি নেন তারা।

প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি মাসে বরাদ্দকৃত ভ্যাকসিন চার ভাগে ভাগ করে চার কর্মকর্তা নিজ নিজ তত্ত্বাবধানে রাখেন এবং বিক্রি করেন। তারা জানান, নিজ নিজ দায়িত্বে থাকা রেফ্রিজারেটরে (ফ্রিজ) সংরক্ষণ করে ভ্যাকসিন বিক্রি করা হয়।

জিন্নাগড় ইউনিয়নের বাসিন্দা আলমগীর বলেন, ‘গরু অসুস্থ হলে চরফ্যাশন পশু হাসপাতালে যাই। হাসপাতাল থেকে জহির স্যার এসে গরু দেখে যায়। কিছুদিন আগে জহির স্যারে আমার তিনটা গরুকে লাম্পি রোগের ভ্যাকসিন দিয়ে গেছে। তিনি ৩০০ টাকা করে ৯০০ টাকা নিয়েছে। এ ছাড়া তাকে আসা-যাওয়ার তেল খরচও দিয়েছি।’

জিন্নাগড় ইউনিয়নের আরও এক বাসিন্দা মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘চরফ্যাশন পশু হাসপাতালের লোকমান স্যারে আমার চারটি গরুকে ভ্যাকসিন দিয়ে ১ হাজার ২০০ টাকা নিয়েছে।’

জিন্নাগড় ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ফারুক বলেন, ‘আমি বিশ বছর ধরে গরু লালনপালন করে আসছি। জহির স্যার খরচ বেশি নেন। কিছুদিন আগে জহির স্যার আমার বাড়িতে এসে একটা গরুর ডেলিভারি করিয়ে দুই হাজার টাকা চেয়েছে, আমি ১ হাজার টাকা দিলে ওই টাকা ছুড়ে ফেলে দেয়, পরে দুই হাজার টাকা দিয়েছি।’

অভিযোগের সত্যতা জানতে সোমবার প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার আমিনাবাদ ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা দুলাল পাটোয়ারী বাচ্চা মুরগির চোখের ভ্যাকসিন কিনতে গেলে উপসহকারি কর্মকর্তা মোহাম্মদ লোকমান তাকে বলেন, ‘এখন ভ্যাকসিন নেই, আগামী সপ্তাহে পাবেন। ভ্যাকসিনগুলো বাড়িতে রেখেছি।’

সরকারি ভ্যাকসিন বাসায় রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে লোকমান বলেন, ‘অফিসের ফ্রিজে জায়গা নেই, তাই বাড়িতে রাখছি।’ পরবর্তীতে ওই ক্রেতা বড় হাঁসের ১০০ মাত্রার একটি ভ্যাকসিন ৬০ টাকা এবং মুরগির ১০০ মাত্রার একটি ভ্যাকসিন ৩০ টাকায় কিনে নেন। যদিও ওই কক্ষে চারটি ফ্রিজ সংরক্ষিত রয়েছে।

প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য মতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত রানীক্ষেত (বিসিআরডিবি ও আরডিবি) টিকা ৭ লাখ ৫৪ হাজার, ফ্রিজিয়ান ২ হাজার, গামবোরো ৩৫ হাজার, ডাকপ্লেগ ৩৪ হাজার, ফাউল কলেরা ৫৬ হাজার, ফাউল পক্স ৪২ হাজার, তড়কা ৫ হাজার ১০০, বাদলা ৩ হাজার ৮০০, গলাফুলা ২ হাজার ৯০০, এলএসডি ৩৬ হাজার এবং গোটপক্স ৯০ মাত্রা বিক্রি হয়েছে।

কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, একটি বোতলে ১০০ মাত্রা (ডোজ) তরল ভ্যাকসিন থাকে, যা গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

দক্ষিণ আইচা থানা এলাকা থেকে ভ্যাকসিন কিনতে আসা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘সরকারি ভ্যাকসিন নির্ধারিত দামে পাওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের কাছ থেকে বেশি টাকা নেয়া হচ্ছে। না দিলে নানান অজুহাত দেখানো হয়।’

জিন্নাগড় ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. মোস্তফা বলেন, ‘আমি প্রায় ১০০টি মুরগি পালন করছি। মুরগিগুলো অসুস্থ হলে চরফ্যাশন ভেটেরিনারি হাসপাতাল থেকে ওষুধ নিয়ে আসি। কিন্তু সেখানে কলেরার ওষুধ ৬০ টাকা এবং চোখের ওষুধ ৩০ টাকা করে রাখা হয়, যা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি।’

বাড়তি টাকা নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে উপসহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ লোকমান বলেন, ‘আমি টাকা নেইনি।’

অফিস সহকারি হয়ে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করার অনুমতি আছে কি না? জবাবে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর জহির বলেন, আমি কোন ধরনের পশুর শরীরে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করিনি। এ ছাড়া আমি কারো কাছ থেকে টাকা নেইনি।’

উপসহকারি কর্মকর্তা আবুল বাশারকে একজন খামারি পরিচয়ে মুঠোফোনে কল দিয়ে লাম্পি স্কিন ডিজিজ রোগের ভ্যাকসিনের দাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনি কি আগে ভ্যাকসিন কিনেন নাই? আমি দোকান থেকে কিনেছি। দোকানদার কত চেয়েছে? ২ হাজার ২০০ টাকা চেয়েছে। তিনি বলেন, ‘তাহলে আমি আপনার কাছ থেকে অর্ধেক দাম রাখব।’

উপসহকারী কর্মকর্তা শংকর কৃষ্ণদাস, মিজানুর রহমানকে কার্যালয়ে গিয়ে পাওয়া যায়নি। তাদের মুঠোফোন কল দিলে রিসিভ না করায় বক্তব্য নেয়া যায়নি।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের ভেটেরিনারি সার্জন মো. রাজন আলী বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘সরকারি ভ্যাকসিন নির্ধারিত মূল্যের বাইরে বিক্রির সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

‘সারাদেশ’ : আরও খবর

» তিস্তা-ব্রহ্মপুত্রের চরে গো-খাদ্যের তীব্র সংকট : বিপাকে লাখো খামারি

সম্প্রতি