সরকারি হিসেবে দেশে কোরবানির পশুর সংকট নেই। চাহিদার তুলনায় প্রায় ২১ লাখের বেশি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। এরপরও শঙ্কা কাটছে না। কারণ চাঁদাবাজি ও সড়কে অব্যবস্থাপনা হলে কোন কোন হাটে পশু সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে খামারিদের আশঙ্কা। এতে সংকট হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য বেসরকারি সংস্থা ‘ক্যাব’ অন্তত এক লাখ গরু আমদানির দাবি জানিয়েছে।
তবে অবৈধ গবাদি পশুর অনুপ্রবেশ এবং পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি নিয়ে উদ্বিগ্ন পশু পাইকাররা। কোরবানির জন্য দেশে প্রয়োজনীয় পশুর সরবরাহ হয়েছে বলে দাবি পাইকার ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এজন্য তারা পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পশু আমদানি না করার দাবি জানিয়েছেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (সম্প্রসারণ) ডা. শাহিনুর আলম সংবাদকে বলেন, ‘আমরা কোরবানির জন্য এবারের চাহিদা নিরুপণ করেছি এক কোটি তিন লাখ ৯৪ হাজার ৭৩৯টি। আর কোরবানির জন্য প্রস্তুত আছে এক কোটি ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৩৩টি প্রাণী। এ হিসেবে ২১ লাখ ৪১ হাজার ৫৯৪টি পশু উদ্ধৃত্ত আছে।’
তিনি বলেন, পশু আনা-নেয়া বা সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক থাকলে সংকট হবে না। কিন্তু কোথাও পশুর কিছুটা সংকট হলেই দাম বাড়ার গুজব রটানো হয়। এসব বিষয়ে প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে হবে।
তবে দেশে পশুর বাজার ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে এক লাখ গরু আমদানির সুপারিশ করেছে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। তাদের যুক্তি হলো- ভারতে চাহিদার তুলনায় জোগান বেশি হওয়ায় দাম কম। বাংলাদেশে উৎপাদনের তুলনায় চাহিদা বেশি। এ কারণে এখানে গরুর মাংসের দাম বেশি। চড়া দামের কারণে নিম্ন ও নিম্নবিত্তরা এখন গরুর মাংস খাওয়ার সামর্থ্য হারাচ্ছেন। মাঝারি আয়ের সংসারগুলোতে মাঝেমধ্যে গরুর মাংস খাওয়া এখন দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে ক্যাব মনে করছে।
হাইওয়ে সড়কে চাঁদাবাজি
জানতে চাইলে ‘বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের’ সভাপতি ইমরান হোসেন সংবাদকে বলেন, ‘দেশে পশুর সংকট নেই। সরকারও এটি স্বীকার করছে। আমাদের কোরবানির চাহিদা এক কোটি চার লাখের মতো। এর বিপরীতে আমাদের কাছে এক কোটি ২৫ লাখের বেশি গবাদি পশু প্রস্তুত আছে।’
পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এবার চাঁদাবাজি একটু বেশি হচ্ছে। ঢাকায় একটি পশুবাহী ট্রাক পৌঁছাতে আট থেকে দশ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। এতে পশুর ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।’
বিভিন্ন সংগঠনে নেতাকর্মীরা এই চাঁদা আদায় করছে জানিয়ে ইমরান হোসেন বলেন, হাইওয়ে সড়কে গাড়ি আঁটকিয়ে চাঁদা আদায় করা হয়। তাছাড়া এখন গরুর খাজনাও বাড়ছে। আগে গ্রাম-গঞ্জ থেকে বেপারিরা আসলে গরু প্রতি ১০০-২০০ টাকা দিতে হতো। এখন শতাকরা ৫ শতাংশ হারে খাজনা দিতে হয়। বিভিন্ন জেলা শহরে পশু নিতে গেলেও চাঁদা দিতে হয় অভিযোগ করে তিনি বলেন, এ চাঁদা দিতে গিয়ে গরুম দাম বেশি হচ্ছে। এছাড়া খামারে বিক্রি হওয়া গরু কোন হাটের কাছ দিয়ে গেলে ক্রেতাকে নাজেহাল হতে হয়।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে গত ১৪ জুন অনুষ্ঠিত এক সভার কার্যাবিবরণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্তবর্তী জেলাসমূহে অবৈধ গবাদিপশুর অনুপ্রবেশ বন্ধে ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া সভায় সব স্থানীয় সরকার, মাঠপ্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ করে অবৈধ গবাদিপশু অনুপ্রবেশসহ অন্যান্য অপত্যতপরতা বন্ধে বিজিবি এবং পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশুবাহী ট্রাক থামিয়ে চাঁদাবাজি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক ২১ জুন ডিএমপির সদর দপ্তরে কোরবানির পশুর হাটের নিরাপত্তা, মানি এস্কর্ট, জাল নোট শনাক্তকরণ, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিশেষ সমন্বয় সভায় এ কথা বলেন।
পশুবাহী কোন ট্রাক থেকে কোথাও গরু নামাতে বাধ্য করা যাবে না জানিয়ে তিনি বলেন, হাটে নেয়ার জন্য গরু নিয়ে টানাটানি করা যাবে না। কোরবানির পশুবাহী কোন ট্রাক থামিয়ে চাঁদাবাজি করা যাবে না। এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দেশে কোরবানির পশুর চাহিদা
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার কোরবানির জন্য দেশে এক কোটি ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৩৩টি গবাদিপশুর ‘প্রাপ্যতা আশা করা যাচ্ছে’। এর মধ্যে গরু ও মহিষ ৪৮ লাখ ৪৩ হাজার ৭৫২টি। আর ছাগল ও ভেড়া ৭৬ লাখ ৯০ হাজারটি এবং অন্যান্য প্রজাতির দুই হাজার ৫৮১টি পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
গত বছর ঢাকা সিটি করপোরেশনসহ সারাদেশে কোরবানিযোগ্য এক কোটি ২১ লাখ ২৪ হাজার ৩৮৯টি গবাদিপশু ছিল। এ বছরও গবাদিপশুর পর্যাপ্ত যোগান রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
গত বছর সারাদেশে তিন হাজার ১৯৫টি পশুর হাট বসেছিল। এবারও পশুর হাটের সংখ্যা প্রায় একই থাকছে বলে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব নাহিদ রশীদ সম্প্রতি ঢাকায় একটি পশুর খামার পরিদর্শনে গিয়ে বলেন, গত বছর কোরবানির যোগ্য পশু ছিল এক কোটি ২১ লাখ। কিন্তু গত বছর ঈদুল আজহায় ৯৯ লাখ ৫০ হাজার পশু কোরবানি হয়েছিল। সেই হিসাবে এবার কোরবানি বাড়লেও পশুর সংকট হবে না।
গত কয়েক বছরের মতো এবারও দেশের পশুতেই কোরবানির প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে জানিয়ে সচিব বলেন, এবার বিদেশি পশুর ওপর নির্ভর করতে হবে না। ব্যবসায়ী ও খামারিদের স্বার্থে ভারত ও মায়ানমার থেকে অবৈধ পথে গরু প্রবেশে সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। বন্ধ আছে মাংস আমদানিও। পাশাপাশি খামারিদের ব্যবসা নির্বিঘœ করতে সব ব্যবস্থা নেয়া হবে।
পশু আমদানি নিয়ে প্রশ্ন
বৃহস্পতিবার (২২ জুন) ক্যাবের এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দেশের বাজারে গরুর মাংস ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভারতের কলকাতায় গরুর মাংস প্রতি কেজি ২৬০ রুপিতে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৪৫ টাকা।
প্রয়োজনীয় পশু থাকতে দেশে আমদানির প্রশ্ন কেন আসছে- জানতে চাইলে ‘ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের’ সভাপতি ইমরান হোসেন বলেন, ‘তারা (ক্যাব) বলছে দাম বেশি; পৃথিবীতে সবকিছুই দাম বেড়েছে।’
পাশর্^বর্তী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের মাংসের দামের তুলনা করে তিনি বলেন, এর তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, ভারতীয় সরকার এ খাতে অনেক অনেক ভর্তুকি দেয়। বাংলাদেশ সরকার এখানে ভর্তুকি তো দেয়নি, উল্টো খামারিদের অনেক টেক্স দিতে হয়।
দ্বিতীয় ভারতে দুধের দাম বেশি; প্রান্তি পর্যায়ের খামারিরাও প্রতি লিটার ৫০ টাকা ধরে বিক্রি করতে পারে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় টাকায় ৮০ টাকার মতো। তৃতীয়ত তাদের দেশে মাংসের চাহিদা খুব কম। বাংলাদেশে দেশে এর চাহিদা অনেক বেশি।
এছাড়া ভারত থেকে হিমায়িত মাংস রপ্তানি করলে সরকার ৩০ শতাংশ ইনসেনটিভ দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে সরকার যদি এই পরিমাণ ইনসেনটিভ দেয় তাহলে মাংসের দামি প্রতি কেজি ৫০০ টাকা নেমে আসে বলে মনে করেন ইমরান হোসেন।
খামারিরা বলছেন, গরু লালন-পালনে খরচ অনেক বেড়েছে। সরকারি হিসাবে ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে গরুর উৎপাদন ছিল দুই কোটি ৪৭ লাখ। এছাড়া কোরবানি উপলক্ষে বিভিন্ন খামারে ও ব্যক্তিগতভাবে অনেক খামারি গরু উৎপাদন করে থাকেন।
আবার দেশীয় গরুর খামার ও চামড়া রক্ষার স্বার্থে সরকার ভারতীয় গরু আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। ফলে দেশীয় বাজারে চাহিদার তুলনায় জোগানের ঘাটতি থাকায় গরুর মাংসের দাম বেড়েছে বলে দাবি গরুর ব্যবসায়ীদের।