দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও কমে এবার ১৯ বিলিয়নের ঘরে নেমে এলো। মঙ্গলবার (৭ নভেম্বর) এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের আমদানি বিল বাবদ ১২১ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ। এর ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৯ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। দেশের সার্বিক অর্থনীতি ভালো রাখার জন্য রিজার্ভকে সুরক্ষা দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে গ্রস রিজার্ভ ২৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত অনুযায়ী বিপিএম-৬ ম্যাথোডের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবের সঙ্গে ৫ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারের পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ বিপিএম-৬ ম্যানুয়াল অনুযায়ী গ্রস রিজার্ভ ২০ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন। এখান থেকে আকুর বিল পরিশোধের পর দেশের রিজার্ভ কমে ১৯ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে এসেছে।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সংবাদকে বলেন, ‘বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। সেটা যেন আরও না বাড়ে তার দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এর জন্য যেকোনো মূল্যে রিজার্ভকে সুরক্ষা দিতে হবে।’
বিভিন্ন অনিয়মের কারণে রিজার্ভ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি সংবাদকে বলেন, ‘সামষ্টিক অর্থনীতির যে অব্যবস্থাপনা যেমন- ট্রেড ইনভয়েসিং, হুন্ডি ইত্যাদির মাধ্যমে গত কয়েক বছরে বিলিয়নস অব বিলিয়নস ডলার বাইরে চলে গেছে। সেগুলো শক্ত হাতে দমন করতে হবে। ওভার অ্যান্ড আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে ডলার পাচার, হুন্ডির মাধ্যমে ডলার পাচার নিয়ন্ত্রণ একেবারে জরুরি হয়ে পড়েছে। রিজার্ভকে সুরক্ষা দিতে হলে এগুলো করতেই হবে।’
যেসব অর্থ পাচার হয়েছে সেগুলো দেশে আনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যেগুলো চলে গেছে সেগুলোকে কীভাবে দেশে আনা যায় তার ব্যবস্থা নিতে হবে। ভবিষ্যতে যেন না যায় সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে।’
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত অনুযায়ী চলতি বছরের ১৩ জুলাই থেকে বিপিএম-৬ নিয়মে রিজার্ভের তথ্য প্রকাশ শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন বিপিএম-৬ অনুযায়ী, দেশে রিজার্ভ ছিল ২৩ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন (২ হাজার ৩৫৬ কোটি) ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে রিজার্ভের যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে তাতে দেখা যায়, ২ নভেম্বর পর্যন্ত রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন (২ হাজার ৬৬ কোটি) ডলার। তার মানে, সাড়ে তিন মাসে রিজার্ভ কমেছে ২৯০ কোটি ডলার।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও বিভিন্ন পণ্যের দাম বেশি থাকায় আমদানি ব্যয় কমেনি। এছাড়া করোনার পর বৈশ্বিক বাণিজ্য আগের অবস্থায় ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর গত বছরের মার্চ থেকে দেশে ডলার-সংকট প্রকট আকার ধারণ করে যা এখনও অব্যাহত আছে। এ সংকট দিন দিন বাড়ছে। বাজারে ‘স্থিতিশীলতা’ আনতে রিজার্ভ থেকে নিয়মিত ডলার বিক্রি করে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি অর্থবছরে এরই মধ্যে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের মতো বিক্রি করা হয়েছে। ফলে ধারাবাহিকভাবে কমছে অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এ সূচকটি। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে ১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছিল। আর আগের অর্থবছরে (২০২১-২২) ডলার বিক্রি করেছিল ৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বেশকিছু বিষয়ে নির্দিষ্ট শর্ত দিয়ে বাংলাদেশকে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করে চলতি বছরের জানুয়ারির শেষের দিকে। এই ঋণের প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬২ লাখ ৭০ হাজার ডলার গত ফেব্রুয়ারিতে পায় বাংলাদেশ। এই শর্তের মধ্যে অন্যতম ছিল জুনে প্রকৃত রিজার্ভ ২ হাজার ৪৪৬ কোটি ডলার, সেপ্টেম্বরে তা ২ হাজার ৫৩০ ডলার এবং ডিসেম্বরে ২ হাজার ৬৮০ ডলারে রাখার। কিন্তু পরে এসব শর্ত শিথিল করেছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর থেকে রিজার্ভ কমে এ পর্যায়ে নেমেছে। এর আগে ধারাবাহিকভাবে যা বাড়ছিল। ১০ বছর আগে ২০১৩ সালের জুন শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল মাত্র ১৫ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার। পাঁচ বছর আগে ছিল ৩৩ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। সেখান থেকে বেড়ে ২০২০ সালের ১ সেপ্টেম্বর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৯ বিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছায়। ওই বছরের ৮ অক্টোবর ৪০ বিলিয়ন ডলারের নতুন মাইলফলক অতিক্রম করে। এরপর তা বেড়ে করোনা মহামারীর মধ্যেও বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ রেকর্ড গড়ে ২০২১ সালের ২৪ আগস্ট। ওইদিন রিজার্ভ ৪৮ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন ডলার বা চার হাজার ৮০৪ কোটি ডলারে উঠে। এরপর ডলার সংকটে গত বছর থেকে রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে কমছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রিজার্ভ ছিল ২১ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ছিল ২৫ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার। ২০১৫-১৬ তে ৩০ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩৩ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল ৩২ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ৩৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন। ২০২০-২১ অর্থবছরে রিজার্ভ ছিল ৪৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪১ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার এবং সব শেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে রিজার্ভ কমে দাঁড়ায় ৩১ বিলিয়ন ডলার।
নগর-মহানগর: উত্তরায় ভবনে আগুন, ৩ জন নিহত
অপরাধ ও দুর্নীতি: জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে জালিয়াতি, তথ্য বিক্রি করে মাসে কোটি টাকার বেশি আয়
অপরাধ ও দুর্নীতি: ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে চলন্ত বাসে কলেজছাত্রীকে গণধর্ষণ, ৩ জন গ্রেপ্তার