image

নতুন মাইলফলক, এক বছরে প্রবাসী আয় এসেছে ৩২ বিলিয়ন ডলার

শুক্রবার, ০২ জানুয়ারী ২০২৬
অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক

রেমিট্যান্স প্রবাহের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫ সালে প্রবাসী আয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রবাসীরা ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণের রেকর্ড।

আগের বছর ২০২৪ সালে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৬ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্সের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৮ শতাংশ। বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরেও রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল অনেক বেশি

বৈশ্বিক নানা সংকটের মধ্যেও প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করতে বড় ভূমিকা রাখছে। এর ফলে দেশের অর্থনীতি স্বস্তিতে আছে। আগের বছর ২০২৪ সালে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৬ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্সের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৮ শতাংশ। বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরেও রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল অনেক বেশি। এ মাসে প্রবাসীরা ৩২৩ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন। একক মাসে আসা এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স। ২০২৫ সালের মার্চে সর্বোচ্চ ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছিলেন ২৬৪ কোটি ডলার। এক বছর পর সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২৩ কোটি ডলারে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ডিসেম্বর মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৫৯ কোটি ডলার বা প্রায় ২২ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে প্রধান অবদান রাখে রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় ও বিদেশি ঋণ। এর মধ্যে প্রবাসী আয় সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, কারণ এটি সরাসরি ডলার আনে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, হুন্ডি প্রতিরোধে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমন্বিত উদ্যোগ, প্রবাসী আয়ে প্রণোদনা অব্যাহত রাখা এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের সেবা সহজ হওয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহ আগের চেয়ে বেড়েছে। এর ফলে দেশের রিজার্ভ পরিস্থিতিতে স্বস্তি ফিরেছে।

২০২৫ সালের ১২ মাসের রেমিট্যান্স প্রবাহের চিত্রে দেখা যায় জানুয়ারিতে এসেছে ২১৮ কোটি ডলার, ফেব্রুয়ারিতে ২৫৩ কোটি, মার্চ ৩৩০ কোটি, এপ্রিল ২৭৫ কোটি, মে ২৯৭ কোটি, জুন ২৮২ কোটি, জুলাই ২৪৮ কোটি, আগস্ট ২৪২ কোটি, সেপ্টেম্বর ২৬৮ কোটি, অক্টোবর ২৫৬ কোটি, নভেম্বর ২৮৯ কোটি এবং সবশেষ ডিসেম্বরে এসেছে ৩২৩ কোটি মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী গত কয়েক বছরের রেমিট্যান্স আহরণ এর আগের বছরগুলোর তুলনায় বেশি ছিল। গত বছর ২০২৪ সালে রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৬৮৯ কোটি ডলার, ২০২৩ সালে এসেছে ২ হাজার ১৯২ কোটি ডলার, ২০২২ সালে ২ হাজার ১২৯ কোটি, ২০২১ সালে ২ হাজার ২০৭ কোটি এবং ২০২০ সালে এসেছে ২ হাজার ১৭৪ কোটি মার্কিন ডলার। এর আগে ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের ঘরে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) রেমিট্যান্স এসেছে এক হাজার ৬২৬ কোটি ডলার। এর আগে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল তিন হাজার ৩২ কোটি ৮০ লাখ ডলার। তার আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৩৯২ কোটি মার্কিন ডলার।

প্রবাসী আয়ের জোরালো প্রবাহের ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার মোট মজুত বা রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩১৮ কোটি ডলারে (৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত হিসাব)। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ ২ হাজার ৮৫২ কোটি ডলার।

এছাড়া চলতি মাসের ২৯ দিনে দেশে ৩ বিলিয়ন ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে, যা ডলারসংকট কাটাতে সাহায্য করেছে। অন্যদিকে ব্যাংক থেকে ডলার কেনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলার বা ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এর আগে ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল, আর ২০২১ সালে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় রিজার্ভ নেমেছিল ২৬ বিলিয়ন ডলারে।

চলতি মাসের প্রথম ২৯ দিনে প্রবাসী আয় ৩ বিলিয়ন ডলার বা ৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ২৯ দিনে দেশে এসেছে ৩০৪ কোটি ডলার।

গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত আছে। তাতে গত মার্চে প্রবাসী আয়ে রেকর্ড হয়। ওই মাসে ৩২৯ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় দেশে এসেছিল, যা এখন পর্যন্ত একক কোনো মাসে দেশে আসা সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়। এরপর চলতি মাসে প্রবাসী আয় আবারও ৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ৩ হাজার ৩৩ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। তার আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসেছিল ২ হাজার ৩৯১ কোটি ডলারের প্রবাসী আয়।

প্রবাসী আয় বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকগুলো থেকে ডলার কিনে চলছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ছাড়া বিদেশি ঋণও আসছে। এতে বাড়ছে রিজার্ভ। গত মঙ্গলবার রিজার্ভ বেড়ে হয় ৩ হাজার ৩১৮ কোটি ডলার। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবপদ্ধতি বিপিএম ৬ অনুযায়ী রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৫১ কোটি ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার নিলামের মাধ্যমে সাতটি ব্যাংক থেকে ৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে এসব ডলার কেনা হয়। এর ফলে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট ডলার কেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ১৩ বিলিয়ন বা ৩১৩ কোটি ডলার। এর মধ্যে শুধু ডিসেম্বর মাসেই ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘ডিসেম্বর শেষে রিজার্ভ ৩৪-৩৫ বিলিয়নে পৌঁছাবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা কোনো সংস্থার ঋণে নয়, নিজেদের দেশ থেকে ডলার কিনেই রিজার্ভ বাড়ানো হবে। এটাই ভালো সিদ্ধান্ত।’

‘অর্থ-বাণিজ্য’ : আরও খবর

সম্প্রতি