image

ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকে রূপান্তরের প্রস্তাব নিয়ে শীর্ষ উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কড়া সমালোচনা

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

দেশের শীর্ষ এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাহী প্রধানরা সরকারের প্রস্তাবিত ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ’-এর খসড়াকে দেশের ক্ষুদ্রঋণ খাতের চিরাচরিত দর্শন, কাঠামো ও অর্জনের পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছেন। এক যৌথ বিবৃতিতে তারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই আইন কার্যকর হলে দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক উন্নয়নে ক্ষুদ্রঋণ খাতের গত কয়েক দশকের ইতিবাচক ভূমিকা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো ওই বিবৃতিতে তারা যদিও ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সরকারি উদ্যোগকে নীতিগতভাবে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন, কিন্তু পরিষ্কারভাবে জানান যে প্রস্তাবিত অধ্যাদেশের খসড়াটি এই খাতের মৌলিক চরিত্র ও লক্ষ্য ঠিকভাবে ধারণ করতে পারেনি।

বিবৃতিতে তারা ব্যাখ্যা করেন, "ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান মূলত একটি উন্নয়নভিত্তিক, অলাভজনক ও দরিদ্রবান্ধব ব্যবস্থা; বিপরীতে ব্যাংক একটি মুনাফাভিত্তিক কাঠামো। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকে রূপান্তরের এই প্রস্তাব তাই বাস্তবসম্মত নয় এবং এতে খাতটির মৌলিক উদ্দেশ্য থেকে সরে আসার (মিশন ড্রিফট) ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে এই সেবা থেকে বঞ্ছিত হতে পারে।"

ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ, আশার প্রেসিডেন্ট মো. আরিফুল হক চৌধুরী, বুরো বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন, টিএমএসএস-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপিকা ড. হোসনে আরা বেগম, সোসাইটি ফর সোশ্যাল সার্ভিসেসের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক সন্তোষ পাল, ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের নির্বাহী পরিচালক মো. আলাউদ্দিন খান, সাজেদা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জাহিদা ফিজ্জা কবির, অন্তর সোসাইটি ফর ডেভেলপমেন্টের প্রধান উপদেষ্টা মো. এমরানুল হক চৌধুরীসহ মোট ১৭টি প্রতিষ্ঠানের প্রধান বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন।

নির্বাহীরা তাদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন যে, বিদ্যমান ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে বা কোন প্রক্রিয়ায় ব্যাংকে রূপান্তরিত হবে, সে সম্পর্কে প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে কোনো স্পষ্ট, নির্দিষ্ট বা বাস্তবায়নযোগ্য রূপরেখা দেওয়া হয়নি। "বরং এর মাধ্যমে দেশি ও বিদেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং করপোরেট বিনিয়োগকারীদের জন্য ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের লাইসেন্স গ্রহণের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে, যা এই খাতে অতিরিক্ত মুনাফালোভ, অনৈতিক চর্চা এবং সুশাসন সংকটের ঝুঁকি বাড়াতে পারে," বলে তারা সতর্ক করেন।

তারা বাণিজ্যিক ব্যাংকিং খাতে বিদ্যমান খেলাপি ঋণ, দুর্নীতি ও দুর্বল সুশাসনের সমস্যার কথাও তুলে ধরে বলেন, এসব সমস্যা যদি ক্ষুদ্রঋণ খাতে সংক্রমিত হয়, তাহলে তার অর্জনসমূহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা বিশেষভাবে অধ্যাদেশে ‘একাধিক ব্যক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজস্ব অর্থায়নে’ ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিধানের সমালোচনা করে বলেন, এটি ব্যক্তি মালিকানার ধারণা প্রবর্তন করবে, যা খাতটির সামাজিক দায়বদ্ধতা ও উন্নয়নমুখী চরিত্রকে দুর্বল করে দিতে পারে।

বিবৃতিতে একটি গুরুতর অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) সনদপ্রাপ্ত যেসব ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকে রূপান্তরের সম্ভাবনা বা আগ্রহ থাকতে পারে, তাদের সঙ্গে অধ্যাদেশের খসড়া প্রণয়নের আগে কোনো প্রকার আলোচনা বা তাদের মতামত গ্রহণ করা হয়নি।

উল্লেখ্য, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কর্তৃক প্রণীত ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৫’–এর খসড়ায় বলা হয়েছে, এ ধরনের ব্যাংকগুলো সামাজিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য দূরীকরণে কাজ করবে। তবে এগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারবে না। বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণদানকারী সংস্থাগুলো শুধুমাত্র তাদের সদস্যদের কাছ থেকে সঞ্চয় হিসেবে আমানত নিতে পারলেও, প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকগুলো সাধারণ জনগণের কাছ থেকেও আমানত সংগ্রহ করার সুযোগ পাবে।

‘অর্থ-বাণিজ্য’ : আরও খবর

সম্প্রতি