image
ছবিঃ সংগৃহীত

কমলো উন্নয়ন বাজেট, বড় ধাক্কা স্বাস্থ্য ও শিক্ষায়

অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক

চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বড় অঙ্কের কাটছাঁট করা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত প্রকল্প না পাওয়ায় এবং সরকারের ধীরে চলা নীতিতে বাস্তবায়ন গতি মন্থর হওয়ায় এই কাটছাঁট করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

পর্যাপ্ত উন্নয়ন প্রকল্প না থাকায় এডিপির আকার কমেছে ১৩ শতাংশ

স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ কমেছে ৭৩ শতাংশ, শিক্ষায় ৫৫ শতাংশ

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ হ্রাসকে প্রধান কারণ বলছে সরকার

অর্থবছরের অর্ধেক সময়ে এসে টাকার অঙ্কে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা যা মোট বরাদ্দের ১৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। সোমবার, (১২ জানুয়ারী ২০২৬) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় সংশোধিত এডিপি (আরএডিপি) অনুমোদন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।

চব্বিশের অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতায় এসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত জুনে তার একমাত্র বাজেট দেয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া উন্নয়ন নীতিতে কাটছাঁট করে চলতি অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এডিপি নির্ধারণ করা হয়। জানুয়ারিতে এসে কাটছাঁটের পর সংশোধিত এডিপির আকার দাঁড়ালো ২ লাখ কোটি টাকায়।

সবচেয়ে বড় কোপ পড়েছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বরাদ্দে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ কমেছে ৭৩ শতাংশ, আর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় কমেছে ৫৫ শতাংশ।

সভার পর ব্রিফিংয়ে এসে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘এমনিতেই মূল এডিপি যেটা ছিল সেটাকেই কম ধরা হয়েছিল। অনেক বছরের মধ্যে মূল এডিপি তার আগের বছরের চেয়ে কম ছিল ২০২৩-২৪ সালে। সেখানেও বাস্তবায়ন হার কম ছিল বলে আমরা এ বছরের মূল এডিপি ধরেছিলাম ২ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে যে চাহিদা এসেছে, সেই চাহিদা পূরণ করার পরও কিছু বাকি রয়ে গেছে, তাই না? আসলে রাজনৈতিক সরকারের আমলে যেমন অসংখ্য প্রকল্পের ভিড় থাকে, আমাদের সময়ে প্রকল্প বরং চেয়ে চেয়ে আনতে হয়। প্রকল্পের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সেক্ষেত্রে আমরা প্রকল্পগুলো, যেগুলো একদমই গ্রহণযোগ্য না সেগুলো বাদ দিয়ে বাকি প্রকল্পগুলো সব গ্রহণ করার পরও কিছু থোক বরাদ্দ রয়ে গেছে এবং সেগুলো মিলিয়ে আমাদের এখন যে... ২ লাখ আরএডিপি ২ লাখ কোটি টাকায়।’

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করে পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেছেন, ‘শুধু এডিপির আকার ছোট হওয়ার কারণেই অর্থনীতিতে যে মন্দাভাব দেখা যাচ্ছে, বিষয়টি তা নয়। মূল সমস্যা হচ্ছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়া। বিনিয়োগ বাড়লে এডিপি কিছুটা কম হলেও অর্থনীতিতে বড় ধরনের সমস্যা হতো না বরং কর্মসংস্থান ও উৎপাদন স্বাভাবিক গতিতে এগোতে পারতো।’

উপদেষ্টা বলেন, ‘এই সময়ে অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক দিক হলো রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রেমিট্যান্সের বড় অংশ গ্রামে যাচ্ছে, ফলে যেসব এলাকায় রেমিট্যান্স বেশি সেখানে বাড়িঘর নির্মাণ, দোকানপাট, সেবা খাত ও ক্ষুদ্র ব্যবসা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। এসব এলাকায় দারিদ্র্যের চাপ তুলনামূলকভাবে কম।’

তবে রেমিট্যান্সের সুফল সব এলাকায় সমানভাবে পৌঁছাতে পারেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যেসব এলাকায় রেমিট্যান্স প্রবাহ নেই, সেখানে উন্নয়ন প্রকল্পের গতি ধীর ছিল এবং নতুন প্রকল্পও তেমন নেয়া হয়নি। ফলে এসব অঞ্চল তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ যুক্ত হয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে পুরো সময়জুড়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি রেখেছে। উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।’

বিনিয়োগের পরিবেশ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, ‘যদিও বড় বিনিয়োগ আসা বা না আসা কেবল সুদের হারের উপর নির্ভর করে না, সেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত নিশ্চয়তার বিষয়গুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। আমাদের করা এক জরিপে দেখা গেছে, তাদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হলো ঋণ পাওয়া এবং স্বল্প সুদে চলতি মূলধনের অভাব। কম সুদে ঋণ না পেলে তাদের ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে।’

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি নিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক দাবি করেছে যে, চলতি মূলধনের জন্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে ব্যাংকগুলোর কাছে কম সুদের বিশেষ ক্রেডিট লাইন দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যেসব খাতে বেশি সুদ পাওয়া যায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সেদিকেই বেশি ঝুঁকেছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা প্রত্যাশিত পরিমাণে ঋণ পাননি।’

ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও নীতি নির্ধারণ বিষয়ে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘সুদের হার যদি আরও আগে এবং ধীরে কমানো হতো তাহলে পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় হতে পারতো। আমার ধারণা, অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়বে না। তবে এটাও সত্য যে, বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে তাদের মুদ্রানীতি নির্ধারণে তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে চলছে।’

‘অর্থ-বাণিজ্য’ : আরও খবর

সম্প্রতি