দেশি শিল্প রক্ষার নামে সুতা আমদানিতে বাড়তি শুল্কারোপ করে স্পিনিং মিলগুলোকে ‘একচেটিয়া বাজার’ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে পোশাক রপ্তানিকারকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। সোমবার, (১৯ জানুয়ারী ২০২৬) ঢাকার একটি হোটেলে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএ’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেছেন, ‘আমদানির সুতার চেয়ে বাংলাদেশি স্পিনিং মিলের কাছ থেকে সুতা নিলে প্রতি কেজি ৪৬ টাকা বেশি নিচ্ছেন। এখন দেশীয় শিল্প রক্ষার নামে আমদানি নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কৃত্রিম সুরক্ষার আড়ালে সুতার একচেটিয়া বাজার তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।’ স্পিনিং মিল আন্তর্জাতিক মানের সুতা প্রতিযোগিতামূলক দরে দিতে পারলে তা দেশের থেকেই নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় সংবাদ সম্মেলনে।
প্রতিবেশী ভারত থেকে সুতা আমদানির খরচ কম দাবি করে সেলিম রহমান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানের ও প্রতিযোগিতামূলক দরে সুতা দিতে পারলে আমরা প্রতি কেজিতে ১০-১৫ সেন্ট (১২ টাকা থেকে সাড়ে ১৮ টাকা) বেশি দিয়ে হলেও নেব।’
বাংলাদেশ নিট পোশাক রপ্তানিকারক সমিতি র (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আমরা অল্প প্রফিটে ব্যবসা করি। সেখানে বেশি দামে কেন কিনব? আমাদের পোশাক শিল্পকে ক্ষতি করে আরেক শিল্পকে রক্ষা করার মানে হয় না।’
প্রয়োজনে স্পিনিং মিলকে ভিন্ন সুবিধা দিয়ে শিল্প রক্ষার উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, ‘পোশাক খাত এখন আইসিইউতে আছে। পাটের পর এখন পোশাক শিল্প ধ্বংস হবে।’
বিজিএমইএ পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, ‘যেখানে কাঁচামালের দাম কম পাব, সেখানেই যাব। আমাদের বাজার উন্মুক্ত করতে হবে আমদানিতে।’
মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ সুতা স্থানীয় স্পিনিং মিল থেকে নিয়ে থাকে পোশাক খাত। বাকি ৪০ শতাংশ আমদানির কারণ তুলে ধরতে গিয়ে বিজিএমইএ পরিচালক ফজলে শামিম এহসান বলেন, ‘অনেক সুতা আছে, যা দেশে হয় না। তারা দিতে পারবে না। এখন এই সুতা কই পাব? আরেকটি কারণ হলো বায়াররা (ক্রেতা গোষ্ঠী) কাঁচামালের আন্তর্জাতিক দাম দেখে পোশাকের দাম ঠিক করে। বিদেশে কম, বাংলাদেশে বেশি দাম হলে তো তারা মানবে না।’
স্থানীয় শিল্পকে রক্ষার কথা বলে দেশি স্পিনিং মিল ও বস্ত্রকল ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে সরকার শুল্কারোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়। তৈরি পোশাক খাতে ব্যবহৃত সুতার সর্বোচ্চ কাউন্ট হচ্ছে ৩০ থেকে ৩২। কোন ধরনের কাপড় তৈরি বা কোন কাজে ব্যবহৃত হবে, তার ওপর নির্ভর করে সুতার মান নির্ণয়ের মাধ্যম হচ্ছে সুতার সংখ্যা গণনা।
সুতার সংখ্যা ধরা হয় সর্বোচ্চ ১০০। সংখ্যার উপর সুতার ওজন ও মান নির্ভর করে। সংখ্যা যত বেশি হবে, সুতা ততো চিকন হবে। অন্যদিকে সংখ্যা যতো কম হবে, ওজন তত বেশি ও মোটা হবে। গত বছরের শুরুর দিকে স্থলবন্দর নিয়ে ভারত থেকে সুতা আমদানি বন্ধ করে দেয় সরকার। অভিযোগ ছিল, স্থল বন্দর দিয়ে তৈরি পোশাক খাতের নামে উচ্চ কাউন্ট অর্থ্যাৎ ৩২ এর উপরে ৬০ থেকে ৮০ কাউন্টের সুতা আমদানি হচ্ছে।
রপ্তানিমুখী শিল্পের নামে কম শুল্কে এসব সুতা আমদানি করে উচ্চ দামে বাজারে বিক্রি হচ্ছে—এমন অভিযোগের পাশাপাশি স্থলবন্দর দিয়ে আনা একই রকমের সুতার দাম নদীপথে আনার চেয়ে কম মুল্য দেখানোর অভিযোগ ছিল।
বস্ত্রখাতের ব্যবসায়ীদের এমন অভিযোগের পরই সরকার সুতা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় স্থলবন্দর দিয়ে। এখন দুই পথেই আমদানিতে শুল্কারোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। রপ্তানির শর্তে আনা কাঁচামাল হিসেবে সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা পান রপ্তানিকারকরা। বন্ড সুবিধা থাকলে শিল্পের কাচামাল আমদানিতে কোনো শুল্ক দিতে হয় না।
সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেছে বস্ত্রখাতের ব্যবসায়ীরা। তাদের আবেদনে এবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সাড়া দিয়ে চিঠি লিখেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর)। সব মানের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল হোক তা অবশ্য চায় না বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সবচেয়ে বেশি আমদানি হওয়া ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতার বন্ড সুবিধা বাতিল করতে চায় তারা। সরকারের কাছে সুতা আমদানিতে শুল্কারোপের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার, বস্ত্রখাতকে ভিন্ন সুবিধা যেমন নগদ অর্থ সহায়তা ও জ্বালানি সরবারাহ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।
বিজিএমইএ পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুস সালাম বলেন, ‘শুল্ক আরোপ করা- সমাধান না। সবার সঙ্গে আলোচনা করে উইন-উইন সিচুয়েশনে যেতে চাই। সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেই সমাধান করতে চাই শিল্প বাঁচাতে।’
অর্থ-বাণিজ্য: ভরিতে ৩ হাজার ২৩৬ টাকা বাড়লো সোনার দাম
অর্থ-বাণিজ্য: ঈদের ছুটিতে কাস্টম হাউসগুলো খোলা থাকবে