image

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ২টি রেখে বাকিগুলো মার্জ করতে চায় সরকার: গভর্নর

অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক

সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে দুটিতে নামিয়ে এনে বাকি ব্যাংকগুলো একীভূত (মার্জ) করার পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেছেন, ‘দেশে ১০ থেকে ১৫টি ব্যাংক থাকলেই যথেষ্ট হতো, কিন্তু বর্তমানে রয়েছে ৬৪টি। অতিরিক্ত ব্যাংকের কারণে প্রশাসনিক জটিলতা ও ব্যয় বেড়েছে। ব্যাংকের সংখ্যা কমলে ব্যয় কমবে এবং লাভজনকতা বাড়বে।’

বুধবার, (২১ জানুয়ারী ২০২৬) সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) ‘ব্যাংকিং খাত: বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক লোকবক্তৃতায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘গভর্নেন্স (সুশাসন) ব্যর্থতা ও চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের অভাবে ব্যাংক খাত থেকে তিন লাখ কোটি টাকার মতো পাচার হয়েছে। অবৈধভাবে ব্যক্তি ও সরকারি নির্দেশে ঋণ দেওয়ার ফলে ব্যাংকের গভর্নেন্স সিস্টেম নষ্ট হয়েছে। দেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো গভর্নেন্স ফেইলর। সরকার ও প্রভাবশালী ব্যক্তি বা পরিবারের নির্দেশে ঋণ দেওয়া হয়েছে। এর পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অবহেলা রয়েছে, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। বর্তমানে ব্যাংকের দুরাবস্থার কারণ হলো ব্যাংকগুলোর মালিকানা ব্যক্তিদের হাতে নিয়ন্ত্রণে ছিল। যেমন ইসলামী পাঁচটি ব্যাংক এক করা হলো। সবগুলো ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ব্যাংকগুলোতে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স না থাকায় তিন লাখ কোটি টাকার মতো দেশ থেকে চলে গেছে।’

ড. আহসান এইচ মনসুর আরও বলেন, ‘পৃথিবীতে চারটি খাতের মধ্যে ব্যাংকিং খাত রয়েছে তৃতীয় স্থানে। তবে বাংলাদেশে এর অবস্থান প্রথম। ফলে বাংলাদেশে অন্যান্য আর্থিক খাত ক্ষতির অবস্থানে রয়েছে। এখন আমাদের ভালো অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এতে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হবে। ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে অন্যান্য খাতগুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে।’ সিঙ্গাপুরের একটি ব্যাংকের আয় বাংলাদেশের সব ব্যাংকের সম্মিলিত আয়ের সমান বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বক্তব্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম বলেন, ‘একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত খাতকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন বর্তমান গর্ভনর। ব্যাংকিং খাত ধ্বংস হয়ে গেছিলো। আমরা বুঝতে পারছি, এই খাতটা কতটা নাজুক পর্যায়ে আছে। বিভিন্ন কলাকৌশলে এটাকে ঠিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে। যে উন্নয়নের ইতিবাচক ধারা এসেছে সেটা অব্যাহত থাকবে এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।’

খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, ‘আগামী মার্চ মাসের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশে নেমে আসবে বলে তিনি আশাবাদী। তবে সংশোধিত বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশ জারি না হলে ভবিষ্যতে আবারও ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ফিরে আসতে পারে।’

তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক রেজ্যুলেশন ফান্ড গঠনের কাজ করছে। এ তহবিলে ৩০ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। শুধু ব্যাংক নয়, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এই রেজ্যুলেশন কাঠামোর আওতায় আনা হবে।

ক্যাশলেস সমাজ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে গভর্নর বলেন, ‘রাজস্ব ফাঁকির প্রধান মাধ্যম হচ্ছে নগদ লেনদেন। ক্যাশলেস ব্যবস্থা চালু করা গেলে বছরে দেড় থেকে দুই লাখ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব।’ এ জন্য প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম বলেন, ‘একটি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত খাতকে এগিয়ে নিতে বর্তমান গভর্নরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিং খাত কতটা নাজুক অবস্থায় রয়েছে, তা এখন স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে।’ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে এই খাত পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে এবং ইতিবাচক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানে অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শরিফ মোশারফ হোসেন বলেন, ‘দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতি সবারই জানা। ঋণ খেলাপির হার বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকের ঋণ বিতরণ কমে গেছে, ফলে বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’ ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতকে আরও কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠানে উপস্থিতি ছিলেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মাহাবুব উল্লাহ, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. হেলাল উদ্দিন ও বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

‘অর্থ-বাণিজ্য’ : আরও খবর

সম্প্রতি