খাদ্যপণ্যের লাগামহীন দামের চাপে ডিসেম্বর মাসেও দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী থেকেছে। মাছ, চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়েছে। রোববার,(২৫ জানুয়ারী ২০২৬) পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত সর্বশেষ অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
জিইডির ‘ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক, জানুয়ারি ২০২৬’ প্রতিবেদনে থেকে জানা যায়, নভেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। এক মাসের ব্যবধানে তা ০ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিই প্রধান ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৭১ শতাংশে যা আগের মাসে ছিল ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ। বিশেষ করে মাছ ও চালের দামের ঊর্ধ্বগতি খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে আরও তীব্র করেছে। যদিও মাঝারি ও মোটা চালের মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে, তবুও বাজারে চালের দাম উচ্চ অবস্থানে থাকায় সাধারণ ভোক্তাদের স্বস্তি ফেরেনি।
খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে চালের অবদান কিছুটা কমলেও মাছ ও শুকনো মাছের অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ডিসেম্বর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে মাছের অবদান সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। পাশাপাশি দুধ, ডিম ও দুগ্ধজাত পণ্যের দাম বাড়ায় পরিবারের মাসিক ব্যয়ের চাপ আরও বেড়েছে। বিপরীতে শাকসবজি ও কিছু কৃষিপণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে কম থাকায় ওই খাতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ডিসেম্বর মাসে মজুরি মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ, যা নভেম্বরের তুলনায় খুব সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, সেভাবে মানুষের আয় বাড়ছে না। এতে করে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ তৈরি হবে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। তবে অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রে কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিতও দিয়েছে জিইডির প্রতিবেদন। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং কৃষিখাতও মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখাচ্ছে।
বৈদেশিক খাতের অবস্থানও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। রফতানি আয় ও প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। ডিসেম্বর মাসে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় তেত্রিশ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকায় বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে রাজস্ব খাতে এখনো প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
ডিসেম্বর মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয় আগের মাসের তুলনায় বাড়লেও সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে আমদানি-রফতানি পর্যায় ও অভ্যন্তরীণ মূল্য সংযোজন কর খাতে ঘাটতি রয়ে গেছে।
জিইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। গ্রাম পর্যায়ে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এসডিজি ভিলেজ পাইলটিং উদ্যোগ বাস্তবায়নের কথাও প্রতিবেদনে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে।