দেশের সম্ভাবনাময় লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও রপ্তানিমুখী করতে আজ থেকে রাজধানীতে শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী দ্বিতীয় বাংলাদেশ লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এক্সপো। বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক জানান, এই এক্সপোর মাধ্যমে দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা তুলে ধরা, আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং বৈদেশিক বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। রোববার, (০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বিশ্বব্যাংক সমর্থিত এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস প্রকল্পের সহযোগিতায় ঢাকার শহীদ আবু সাঈদ আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই এক্সপো অনুষ্ঠিত হবে।’
প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলা এই মেলায় দেশের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের সর্বশেষ প্রযুক্তি, যন্ত্রাংশ ও উদ্ভাবনী পণ্য প্রদর্শিত হবে। ২ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র প্রাইভেট সেক্টর স্পেশালিস্ট হোসনা ফেরদৌস সুমি এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রহিম খান। এছাড়া সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, শিল্প ও বাণিজ্য সংগঠনের প্রতিনিধি, দেশি ও বিদেশি ক্রেতা, উদ্যোক্তা এবং বিনিয়োগকারীরা এই এক্সপোতে অংশ নেবেন।
লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘এই খাত কৃষি, টেক্সটাইল, নির্মাণ, বিদ্যুৎ, অটোমোবাইল ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ সরবরাহ করছে। বর্তমানে দেশে প্রায় পঞ্চাশ হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে তিন লাখের বেশি দক্ষকর্মী কাজ করছেন। এই খাত জাতীয় জিডিপিতে প্রায় তিন শতাংশ অবদান রাখছে।’
তিনি জানান, দেশের প্রায় আট দশমিক দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় অর্ধেক এই শিল্পের মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে। বর্তমানে তিন হাজার আটশটিরও বেশি ধরনের যন্ত্রপাতি, প্রতিস্থাপন যন্ত্রাংশ, সরঞ্জাম, ডাই ও ছাঁচসহ বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য দেশে উৎপাদিত হচ্ছে। তবে এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ যন্ত্রাংশ ও যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা এই খাতে সম্প্রসারণের বড় সুযোগ নির্দেশ করে।
বিশ্ববাজারে ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের চাহিদা বিপুল হলেও প্রায় সাত ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারে বাংলাদেশের অংশ এক শতাংশেরও কম বলে জানান তিনি। বর্তমানে বাংলাদেশের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের রপ্তানি প্রায় সাতশ পঁচানব্বই মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যথাযথ নীতি সহায়তা, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দুই হাজার ত্রিশ সালের মধ্যে এই খাত থেকে বারো দশমিক ছাপ্পান্ন বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এক্সপোকে শুধু প্রদর্শনী নয়, কার্যকর সোর্সিং ও নেটওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে নির্মাতা, ক্রেতা, সরবরাহকারী, বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারকদের সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে। ফলে প্রযুক্তি হস্তান্তর, ব্যবসায়িক চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ হবে।
মেলায় কনস্ট্রাকশন ও প্যাকেজিং মেশিনারি, কৃষিযন্ত্র, বৈদ্যুতিক পণ্য, জুট ও টেক্সটাইল যন্ত্রাংশ, অটোমোবাইল কম্পোনেন্টস, ডাই ও মোল্ডসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্পপণ্য প্রদর্শিত হবে। এবারের মেলায় পঞ্চাশটিরও বেশি বুথে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবন ও সক্ষমতা তুলে ধরা হবে। এক্সপো চলাকালে দুটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম সেমিনারে এলডিসি উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির কৌশল এবং দ্বিতীয় সেমিনারে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত উন্নয়নে গবেষণা ও উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হবে।
লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের টেকসই উন্নয়নে বেশ কয়েকটি নীতিগত প্রস্তাব তুলে ধরে আবদুর রাজ্জাক বলেন, আন্তর্জাতিক মানের রপ্তানি সক্ষমতা অর্জনে ফ্যাক্টরিগুলোকে কমপ্লায়েন্সসম্মত করে গড়ে তোলা জরুরি। এজন্য শিল্প নগরীতে বিশেষায়িত লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং জোন প্রতিষ্ঠার দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘পণ্য বহুমুখীকরণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর ছাড়া উচ্চমূল্যের ও রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদন সম্ভব নয়। এজন্য নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ, গবেষণা ও উদ্ভাবনে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাস এবং সহজ আমদানি সুবিধা দেওয়ার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।’
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ চীন, ভারত বা ভিয়েতনামের তুলনায় পিছিয়ে নেই, তবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত নকশা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা জরুরি।’ এক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দেশে উৎপাদিত যন্ত্রাংশ ও ডাই ডিজাইনের স্বত্ব সংরক্ষণের জন্য একটি সহজ ও সময়োপযোগী পেটেন্ট ও ডিজাইন রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া চালুর দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি এই শ্রমনির্ভর খাতে নারী ও যুব শ্রমিকদের অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার আহ্বান জানান। এছাড়া রপ্তানিমুখী এবং রপ্তানির জন্য প্রস্তুত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ক্যাশ ইনসেনটিভ ও সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ সুবিধা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য কয়েক বছর ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে অনুরোধ জানিয়ে আসছে সমিতি। ফিনিশড গুড আমদানিতে শুল্ক এক শতাংশ হলেও একই পণ্যের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সর্বোচ্চ সাতান্ন শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে, যা বৈষম্যমূলক।’ দ্রুত এই বৈষম্য নিরসনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, এই এক্সপোর মাধ্যমে দেশীয় শিল্প আরও শক্তিশালী হবে, নতুন বিনিয়োগ আসবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং বাংলাদেশের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত আন্তর্জাতিক বাজারে দৃশ্যমানতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করবে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি আব্দুর রশিদ, সহ-সভাপতি রাজু আহমেদসহ কেন্দ্রীয় পরিচালক এবং এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস প্রকল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।