করোনার পর গত পাঁচ বছরে দেশে-বিদেশে দ্রুতগতিতে বাড়তে শুরু করে স্বর্ণের দাম। তবে, ২০২৩ সালের ২১ জুলাই হঠাৎই প্রতি ভরি সোনার দাম এক লাখ টাকায় ওঠে। পরে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেড় লাখ ও অক্টোবরে দুই লাখ টাকার মাইলফলক স্পর্শ করে। শেষ পর্যন্ত তা গিয়ে ঠেকেছে আড়াই লাখের ওপরে। তবে, গত কয়েকদিনে স্বর্ণের দামে দেখা দিয়েছে নাটকীয়তা। মাত্র কয়েকঘণ্টার ব্যবধানে কয়েকদফায় ওঠানামা করেছে এই স্বর্ণের দাম।
দেখা যায়, ৩১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক স্বর্ণের বাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়। এরপর থেকে আজ সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) কর্তৃক দেশিয় স্বর্ণের বাজারে ঘনঘন পরিবর্তন দেখা যায়।
গত তিন দিনে লাগাতার ওঠানামা
গত শনিবার (৩১ জানুয়ারি) বিশ্ববাজারে হঠাৎই কমে যায় সোনার দাম। মূল্যবান এ ধাতুর দাম বিশ^বাজারে আউন্সপ্রতি ৪৩৪ ডলার ৪৫ সেন্ট কমে। এতে দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়ে যথারীত। এদিন বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি-বাজুসের ঘোষণা অনুযায়ী প্রতি ভরিতে সোনার দাম কমে ১৫ হাজার ৭৪৬ টাকা। দাম কমার কারণে ভালো মানের, অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম দাঁড়ায় ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬১৭ টাকা। ২১ ও ১৮ ক্যারেট সোনার দাম কমে ভরিপ্রতি যথাক্রমে ১৪ হাজার ৯৮৮ ও ১২ হাজার ৮৮৮ টাকা। তাতে ২১ ক্যারেটের দাম হয় ২ লাখ ৪৪ হাজার ১১ টাকা ভরি। ১৮ ক্যারেটের দাম হয় ২ লাখ ৯ হাজার ১৩৬ টাকা। এদিকে সনাতন পদ্ধতির সোনার ভরি ১০ হাজার ৯৬৪ টাকা কমে হয় ১ লাখ ৭১ হাজার ৮৬৯ টাকা।
সকালে সোনার দাম কমার পর ওইদিন সন্ধ্যার পরেই আবার বেড়ে যায়। বাজুসের ঘোষণা অনুযায়ী এ দফায় ভরিতে বাড়ে ৪ হাজার ৮২ টাকা। তাতে ভালো মানের অর্থাৎ, ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম দাঁড়ায় ২ লাখ ৫৯ হাজার ৬৯৯ টাকা। একইভাবে ২১ ও ১৮ ক্যারেট সোনার দাম ভরিপ্রতি যথাক্রমে ৩ হাজার ৯০৭ ও ৩ হাজার ৩৮২ টাকা বাড়ে। তাতে ২১ ক্যারেটের দাম হয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯১৮ টাকা ভরি, আর ১৮ ক্যারেটের দাম দাঁড়ায় ২ লাখ ১২ হাজার ৫১৮ টাকা। এছাড়া সনাতন পদ্ধতির সোনার ভরি ২ হাজার ৪১ টাকা বেড়ে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৯১০ টাকা হয়। যদিও, এর কারণ হিসেবে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) স্থানীয় বাজারে তেজাবি তথা পাকা সোনার দাম বিষয়টি উল্লেখ করে। বাজুসের এ তথ্য অনুযায়ী গতকাল রোববার (১ ফেব্রুয়ারী) সারাদিন এ দামে স্বর্ণ বিক্রি হয়।
এদিকে, রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) রাতে বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং কমিটি বৈঠকে আবারও স্বর্ণের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত হয়।
এ দফায় দাম কমানো হয়েছে ১ হাজার ৯২৫ টাকা। এখন সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম এক হাজার ৯২৫ টাকা কমিয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৭৭৪ টাকা। ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম এক হাজার ৮৬৬ টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৫২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ১৮ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম এক হাজার ৬৩৩ টাকা কমিয়ে নতুন দাম ২ লাখ ১০ হাজার ৮৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম এক হাজার ৩৪১ টাকা কমিয়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ ৭২ হাজার ৫৬৯ টাকা।
এবারো স্বর্ণের দাম কমানোর বিষয়টি তেজাবি তথা পাকা সোনার দাম কমার ওপরই চাপিয়েছে বাজুস।
যা বলছে বিশেষজ্ঞরা
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি তাদের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে স্বর্ণের দাম বাড়ার তিনটি কারণ উল্লেখ করেছে।
ট্রাম্পকে ঘিরে অনিশ্চয়তায় বদলাচ্ছে বিনিয়োগ প্রবণতা
এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের আর্থিক সেবাদানীকারী কোম্পানি হারগ্রিভস ল্যান্সডাউনের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ এমা ওয়ালের বরাত দিয়ে সংবাদ সংস্থাটি জানিয়েছে, হঠাৎ করে ট্রাম্পের শুল্ক বাড়ানোর বাণিজ্যনীতি বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, যা সোনার দাম বাড়ায় ভূমিকা রাখছে।
ক্যাপিটাল ইকনমিক্সের অর্থনীতিবিদ হামাদ হোসেন বলেন, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি ও আর্থিক নীতির ঝুঁকর বিপরীতে স্বর্ণকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং এ কারণেই এই মূল্যবান ধাতুটি এখন ‘আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে’ রয়েছে।
যুদ্ধ ও গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে হুমকি অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে
ইউক্রেন ও গাজায় যুদ্ধ সামগ্রিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও ঘনভূত করেছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের আটক করার ঘটনা স্বর্ণের দামকে আরও উপরের স্তরে নিয়ে যায়।
এদিকে, গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে ট্রাম্পের হুমকি বৈশ্বিক রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে এবং ডলারের প্রতি আস্থা কমে যায়; ফলে বিনিয়োগকারীরা অধিক নিরাপদ হিসেবে মূল্যবান ধাতুর দিকে ঝুঁকে পড়েন।
ট্রাম্পের ক্ষমতাকালে ডলারের সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে গত বসন্তে ঘোষিত তার তথাকথিত লিবারেশন ডে শুল্কনীতির পর।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনা
এ বিষয়ে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বিশেজ্ঞরা বলেন, “বিনিয়োগকারী এবং বৈশ্বিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোৃ স্বর্ণকেই রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে প্রাধান্য দিচ্ছে। কারণ তারা বিশ্বাস করে এতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ভরতা থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখা যায়”।
“রাশিয়ার ডলারভিত্তিক সম্পদ ইউক্রেনের সমর্থক বৈশ্বিক শক্তিগুলোর দ্বারা বাজেয়াপ্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চয়ই কিছু দেশ লক্ষ্য করেছে এবং তারপর থেকেই তারা স্বর্ণকে তুলনামূলক নিরপেক্ষ রিজার্ভ হিসেবে বেশি আকর্ষণীয় মনে করছে”।
এদিকে, তথ্য অনুযায়ী যদিও ২০২২ সালের পর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আগের তুলনায় এখনো বেশি স্বর্ণ কিনছে, ধারণা করা হয় যে ২০২৫ সালে তাদের চাহিদা কিছুটা কমে এসেছে।
এছাড়া অন্যান্য ক্রেতার মধ্যে রয়েছে চীন, যারা সবচেয়ে বড় স্বর্ণ ক্রেতা। যেখানে চাহিদা আসে ব্যক্তিগত গয়না ক্রেতা ও বিনিয়োগকারী উভয়ের কাছ থেকে। পাশাপাশি পশ্চিমা দেশগুলোতেও বাড়ছে স্বর্ণ কেনার প্রবণতা, বিশেষ করে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত স্বর্ণভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে।
সম্প্রতি স্বর্ণ ও রূপার দাম কেন কমেছে?
একই প্রতিবেদনে বিবিসি স্বর্ণেও দাম কমার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা করেছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয় গত কয়েক দিনে স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় ওঠার একটি কারণ হচ্ছে ট্রাম্প এমন একজন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান নিয়োগ করতে পারেন যিনি তার সুদের হার কমানোর দাবিতে নতি স্বীকার করবেন। এতে ডলারের দরপতন এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এসব পরিস্থিতিতে স্বর্ণ কেনাকে সুরক্ষামূলক কৌশল হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু পরে যখন খবর আসে যে প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ার্শকে মনোনীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যিনি অন্যান্য প্রার্থীর তুলনায় অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল বলে বিবেচিত তখন স্বর্ণ, রূপা ও প্লাটিনামের দাম হঠাৎই কমে যায়।
অর্থ-বাণিজ্য: স্বর্ণের দামে নাটকীয়তা: লাগাতার উঠানামা
নগর-মহানগর: হাতিরঝিলে পিকআপের ধাক্কায় নিহত ১
অর্থ-বাণিজ্য: ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে কমলো স্বর্ণের দাম