অচল চট্টগ্রাম বন্দর

নির্বাচনের আগে অর্থনীতিতে ‘রেড অ্যালার্ট’

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বন্দরের ইয়ার্ড, জাহাজ ও ইনল্যান্ড ডিপোতে আটকে আছে প্রায় ১৩ হাজার রপ্তানি কনটেইনার। যার আর্থিক মূল্য গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮ হাজার ৫০ কোটি টাকা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের রপ্তানি, সরবরাহ ব্যবস্থা ও বৈদেশিক আস্থায় বড় ধরনের ধস নামতে পারে। এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছে দেশি ও বিদেশি ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। অর্থনীতির এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতিকে ‘অর্থনীতির জন্য রেড অ্যালার্ট’ আখ্যা দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের জরুরি ও ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন শীর্ষ ব্যবসায়ীরা।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স (ইউরোচেম বাংলাদেশ) জানিয়েছে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। এখন সেই প্রধান বন্দরে কর্মবিরতির ফলে রপ্তানি কনটেইনার মুভমেন্ট একেবারেই থেমে ও থমকে গেছে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার রপ্তানি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হলেও সাম্প্রতিক অচলাবস্থায় বিপুল পরিমাণ পণ্য বন্দরের ইয়ার্ড, বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো আর জাহাজেই আটকে আছে। এমনকি অনেক জাহাজ নির্ধারিত সময়ে ভিড়তে বা বন্দর ছাড়তেও পারছে না।

এই পরিস্থিতিতে ইউরোচেমের সদস্য প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহকারী ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে দ্রুত উদ্বেগ বাড়ছে। সরবরাহের সময়সূচি ভেঙে পড়ায় শিপমেন্ট বিলম্বিত হচ্ছে। লজিস্টিক ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তিভঙ্গের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ইউরোচেমের হিসাব অনুযায়ী, বন্দরে আটকে থাকা প্রায় ৮ হাজার ৫০ কোটি টাকার পণ্য শুধু তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতিই নয়, দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ‘নির্ভরযোগ্য সোর্স কান্ট্রি’ হিসেবে সুনামকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

একই সঙ্গে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও সরকারকে স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছে। বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ), বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ প্রধান উপদেষ্টাকে দেওয়া এক খোলা চিঠিতে জানিয়েছে, জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে বন্দরে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিপর্যয়ের বার্তা দিচ্ছে। ব্যবসায়ী নেতারা চট্টগ্রাম বন্দরকে ‘জাতীয় অর্থনীতির প্রাণভোমরা’ উল্লেখ করে বলেন, দেশের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৯৯ শতাংশ আর সমুদ্রপথে বাণিজ্যের প্রায় ৭৮ শতাংশ এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল।

ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, বন্দরে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে প্রধান রপ্তানি খাত, বিশেষত, তৈরি পোশাক শিল্প, অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে। অর্ডার বাতিল, শিপমেন্ট বিলম্ব ও ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। পাশাপাশি রমজান মাসের আগে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহেও কৃত্রিম সংকট দেখা দিতে পারে।

https://sangbad.net.bd/images/2026/February/08Feb26/news/%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A6%B0%20%E0%A6%9B%E0%A6%AC%E0%A6%BF%20%282%29.JPG

এসব সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত। যে সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে শ্রমিক-কর্মচারীরা টার্মিনাল ও আউটার অ্যাঙ্করেজে কাজ বন্ধের ডাক দিয়েছে। যদিও নৌপরিবহন উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনার পর ৪৮ ঘণ্টার জন্য ধর্মঘট স্থগিত করা হয়েছিল, তবে লিজ বাতিল, বন্দর চেয়ারম্যানের অপসারণ আর শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবি পূরণ না হওয়ায় পুণরায় আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, গত কয়েক দিনে একাধিক আলোচনা ও সমন্বয় সভা হলেও কার্যকর সমাধান আসেনি। বরং আন্দোলনরত শ্রমিকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও তদন্ত শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এর ফলে জাহাজ জট, পণ্য খালাসে বিলম্ব আর আমদানিকারকদের বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এসব ঝুঁকি সরাসরি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ ফেলতে পারে।

ইউরোচেম বাংলাদেশ তাদের বিবৃতিতে বলেছে, রপ্তানি কার্যক্রম সুরক্ষিত রাখা, বিদেশি চাহিদার সঙ্গে যুক্ত লাখো কর্মসংস্থান রক্ষা করা আর বাংলাদেশের সরবরাহ শৃঙ্খলের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে নিরবচ্ছিন্ন ও দক্ষ বন্দর পরিচালনা এখন অপরিহার্য। সংগঠনটি গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে সংকট নিরসন ও দীর্ঘমেয়াদে বন্দর আধুনিকায়নের গতি বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে।

নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশের এমন সংবেদনশীল অর্থনৈতিক মুহূর্তে ব্যবসায়ী সমাজের অভিন্ন বার্তা, চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে তৈরি হওয়া এই ৮ হাজার ৫০ কোটি টাকার রপ্তানি ঝুঁকি কেবল শ্রমিক-কর্তৃপক্ষের বিরোধ নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। ফলে সংকটে প্রধান উপদেষ্টার সরাসরি হস্তক্ষেপই দ্রুত সমাধানের শেষ ভরসা হয়ে উঠছে।

‘অর্থ-বাণিজ্য’ : আরও খবর

» উন্নয়ন বলতে রাস্তাঘাট ও সেতু নির্মাণই বোঝেন অধিকাংশ ভোটার: সিপিডি

সম্প্রতি