image

অন্যান্য দেশে বন্দর চলে কীভাবে

রেজাউল করিম

বিদেশি কোম্পানির কাছে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তে শ্রমিক সংগঠন ও সরকারের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। তারা দাবি করেছে, বন্দর বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দিলে দেশের ক্ষতি হবে। আর এটা তারা করতে দেবে না। অন্যদিকে সরকার বলছে, একটি টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে পরিচালনার দায়িত্ব দিলে বরং বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে। বিশ্বের বহু দেশে এমন উদাহরণ আছে, বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক দক্ষ কোম্পানি পরিচালনা করছে। এটা দেশের জন্য ভালো।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অনেক দেশে নিজেদের বন্দর নিজ দেশের কোম্পানি পরিচালনা করছে। আবার এমনও দেখা গেছে, অনেক দেশ বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি কোম্পানিকে দিয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, যেসব দেশ প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সেসব দেশের বন্দর পরিচালনা করছে নিজ দেশের কোম্পানি। যেমন, চীনের বড় বন্দরগুলো নিজ দেশের কোম্পানি পরিচালনা করছে। আবার যেসব দেশ প্রযুক্তিতে পিছিয়ে তারা পুরো বন্দর অথবা এক বা একাধিক টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দিয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ দেখা যায়, শাংহাই বন্দর চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বন্দর। এটি পরিচালনা করে শাংহাই ইন্টারন্যাশনাল পোর্ট গ্রুপ (এসআইপিজি)। এটি সম্পূর্ণভাবে চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ বন্দরের পুরো ব্যবস্থাপনাই চীন নিজে পরিচালনা করে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর জেবেল আলি বন্দর। এর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। এটি আরব আমিরাত ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। তাই সেটি দেশের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের দিক থেকে দেশি অপারেটর হিসেবে বিবেচিত। তবে তারা বিশ্বজুড়ে বহু দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান সমুদ্রবন্দর বুসান। এটি পরিচালনা করে বুসান পোর্ট অথরিটি (বিপিএ)। এটিও একটি সরকারি সংস্থা। অর্থাৎ বন্দরটির পুরো ব্যবস্থাপনাই দেশীয় কর্তৃপক্ষের হাতে।

জাওহরলাল নেহরু বন্দর (জেএনপিটি) ভারতের বৃহত্তম বন্দর। এটি মূলত জাওহরলাল নেহরু পোর্ট অথরিটি (জেএনপিএ) পরিচালনা করে। তবে একাধিক টার্মিনালে ডিপি ওয়ার্ল্ড ও এপিএম টার্মিনালস-এর মতো বিদেশি অপারেটর যুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ ভারত নিজেদের বন্দর দেশি ও বিদেশি মিশ্র ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করে।

একইভাবে মালয়েশিয়ার তানজুং পেলেপাস বন্দর দেশি ও বিদেশি কোম্পানি দিয়ে পরিচালিত হয়। ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় বন্দর সান্তোস দেশি ও বিদেশি কোম্পানি দিয়ে পরিচালিত হয়। পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ড-এর মতো আন্তর্জাতিক অপারেটরের হাতে রয়েছে।

থাইল্যান্ডের প্রধান গভীর সমুদ্র বন্দর লেইম চাবাং বন্দর পুরোপুরি দেশি কোম্পানির হাতে রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান বন্দর পরিচালিত হয় ট্রান্সনেট ন্যাশনাল পোর্টস অথরিটির মাধ্যমে। এটা দক্ষিণ আফ্রিকার দেশিও প্রতিষ্ঠান।

বর্তমানে গ্রিসের পাইরিয়াস বন্দর পরিচালিত হচ্ছে কসকো শিপিং পোর্টস এর মাধ্যমে। কসকো একটি চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি। অর্থাৎ এটি পুরোপুরি বিদেশি কোম্পানির হাতে রয়েছে।

অর্থাৎ অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, উন্নত দেশগুলো নিজেদের বন্দর নিজেরা পরিচালনা করলেও উন্নয়নশীল বা স্বল্পন্নত দেশগুলো বন্দর বা টার্মিনাল পরিচালনার জন্য দক্ষ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করছে।

ফের অনির্দিষ্টকালের জন্য আন্দোলন শুরু

এদিকে বিদেশি কোম্পানির কাছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবং চার দফা দাবিতে চট্টগ্রাম বন্দরে ফের অনির্দিষ্টকালের জন্য শুরু হয়েছে শ্রমিক ধর্মঘট। গতকাল সকাল ৮টা থেকে এ ধর্মঘট শুরু হয়। এতে বন্দরের যাবতীয় অপারেশনাল কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকরা বন্দরে প্রবেশ করতে শুরু করেন।

বন্দরের চার নম্বর গেট এলাকায় কথা হয় বেশ কয়েকজন বার্থ অপারেটর শ্রমিকের সঙ্গে। তারা বলেন, ‘আমরা কাজ করতে চাই। কিন্তু বাঁধার মুখে কাজ করতে পারি না। কাজ না করলে আমাদের বেতন হয় না, যারা আন্দোলন করছে তারা কাজ না করলেও বেতন পান। এখন আমরা কাজে যোগদানের জন্য বন্দরে প্রবেশ করছি।’

চট্টগ্রাম বন্দরে ধর্মঘট চলতে দেওয়া যায় না উল্লেখ করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ‘এ বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে যাবে।’ রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে উপদেষ্টা এ কথা জানান।

সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘কতিপয় লোক পুরো বন্দরকে জিম্মি করার চেষ্টা করছে। আর কয়েকদিন পরে রোজা। আমরা প্রতিনিয়ত নদীতে অভিযান চালাচ্ছি। বহির্নোঙরে পড়ে আছে ছোলা, ডাল ও তেল। ১৮ কোটি মানুষকে তারা (ধর্মঘটকারীরা) জিম্মি করেছে। এটা চলতে দেওয়া যায় না। সরকার কঠোর অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকজনকে ধরা হয়েছে, বাকিদেরও ধরা হবে।’

এদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম মনিরুজ্জামান দাবি করেছেন, সেখানকার অবস্থা স্বাভাবিক। শ্রমিক-কর্মচারীরা কাজে যোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইনি ব্যবস্থা নেবে।

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে বন্দর ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে তিনি সকাল ১০টা থেকে কর্মকর্তা ও শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে দুই ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন।

বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, ‘আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আমি আজ (রোববার) সকালে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে বৈঠকে গিয়েছি। সবাইকে বলেছি ভোট দিতে হবে। একটি পক্ষ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য বন্দরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। কোনো অবস্থায়ই নির্বাচন বিঘ্নিত করা যাবে না।’

নৌপরিবহন উপদেষ্টা বলেন, ‘আর কয়েকদিন পরে নির্বাচন, ওই আসনে (চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায়) তারা একটা গণ্ডগোল সৃষ্টি করতে চাচ্ছেন। আমি প্রধান নির্বাচন কমিশনার মহোদয়কে অনুরোধ করেছি, কারণ সেখানে যদি নির্বাচন ঠিকমতো না হয়, সারাদেশের নির্বাচন নিয়ে কথা উঠবে। এই সরকার অত্যন্ত স্পষ্ট আমরা কোনো ধরনের নির্বাচন মনিটরিং বা এরকম কোনো কিছু করছি না। নির্বাচন অবশ্যই অবাধ এবং সুষ্ঠু হতে হবে।’

সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘যদি কেউ বন্দর চালু রাখার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে ও পরোক্ষভাবে কোনো কিছু করে, তাহলে তাকে ধরা হবে। আমরা কঠোর অবস্থান নিয়েছি।’

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের চার দাবি

এই পরিস্থিতিতে চারটি দাবি তুলে ধরেছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘উপদেষ্টা মহোদয়ের সঙ্গে বৈঠকে আমরা চারটি দাবি জানিয়েছি। এই চারটি হলো নিউমুরিং টার্মিনাল ডিপিওয়ার্ল্ডকে দেওয়া যাবে না। কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলো প্রত্যাহার করতে হবে। বন্দর চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানের পদত্যাগও দাবি করেছি।’

ইব্রাহীম খোকন বলেন, ‘নিউমুরিং টার্মিনাল নিয়ে তিনি (উপদেষ্টা) উচ্চপর্যায়ে আলাপ করার কথা বলেছেন। বাকি দাবিগুলোর বিষয়ে আশ্বস্ত করেছিলেন। এ জন্য আমরা শনিবার পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত করেছিলাম। আবার আন্দোলন শুরু হলো।’

‘অর্থ-বাণিজ্য’ : আরও খবর

» উন্নয়ন বলতে রাস্তাঘাট ও সেতু নির্মাণই বোঝেন অধিকাংশ ভোটার: সিপিডি

সম্প্রতি