image

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের শুল্ক বেশি

রেজাউল করিম

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য রপ্তানিতে ভারত ও পাকিস্তানসহ আরও কয়েকটি প্রতিযোগী দেশের চেয়ে বেশি শুল্ক দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এতে পণ্যের দাম ও গুণগতমানের আগেই শুল্কের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে।

গত রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের কথা ছিল বাংলাদেশের

বিদ্যমান পাল্টা শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে আরও কমতে পারে

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গত রাতে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে বাংলাদেশের। চুক্তি সই হলে আরোপিত বিদ্যমান পাল্টা শুল্ক হার ২০ শতাংশ থেকে আরও কমতে পারে বলে আশা করছে সরকার।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের শুল্ক হার বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপর আগে থেকেই গড়ে ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ বেজ শুল্ক কার্যকর ছিল। সাম্প্রতিক শুল্ক সমঝোতার পর এর সঙ্গে নতুন করে আরও ২০ শতাংশ শুল্ক যোগ হয়েছে। ফলে বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকৃত পণ্যে মোট বা ইফেক্টিভ শুল্ক দাঁড়িয়েছে ৩৬ থেকে ৩৭ শতাংশে। অর্থাৎ নতুন শুল্ক ২০ শতাংশ হলেও বাস্তবে দিতে হচ্ছে প্রায় ৩৭ শতাংশ।

বাংলাদেশের চেয়ে কম শুল্ক দিতে হয় ভারতকে। দেশটির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পোশাক রপ্তানিতে পূর্ব হতেই ১০ থেকে ১২ শতাংশ বেজ শুল্ক কার্যকর ছিল। নতুন করে ভারতের ওপর ১৮ শতাংশ শুল্ক যোগ হয়েছে। ফলে বর্তমানে ভারতের মোট বা ইফেক্টিভ শুল্ক দাঁড়িয়েছে ২৮ থেকে ৩০ শতাংশে। এই হার বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম হওয়ায় দামের প্রতিযোগিতায় ভারত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

একই অবস্থা পাকিস্তানের ক্ষেত্রে। পাকিস্তানের তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে আগে হতে ১১ থেকে ১৩ শতাংশ বেজ শুল্ক ছিল। নতুন করে দেশটির ওপর ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এতে পাকিস্তানের মোট শুল্কহার বর্তমানে ৩০ থেকে ৩২ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করছে। এই হারও বাংলাদেশের চেয়ে কম। অর্থাৎ দেশটি শুল্কের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে।

প্রধান প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশের অবস্থান একই। দেশটির পোশাক রপ্তানিতেও আগে হতে ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ বেজ শুল্ক ছিল। নতুন নীতির আওতায় ভিয়েতনামের ওপরও ২০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে মোট শুল্কহার ৩৬ থেকে ৩৭ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মধ্যে শুল্ক কাঠামোর দিক থেকে সরাসরি সমান প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।

বিশ্বের অন্যতম বড় পোশাক রপ্তানিকারক চীনের ক্ষেত্রে শুল্কহার সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পোশাক পণ্যে আগে হতে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ বেজ শুল্ক কার্যকর ছিল। নতুন নীতির আওতায় চীনের ওপর ৩০ থেকে ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে চীনের মোট বা ইফেক্টিভ শুল্কহার দাঁড়িয়েছে ৪৪ থেকে ৫০ শতাংশে যা প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

কম্বোডিয়ার তৈরি পোশাক রপ্তানিতে আগে হতে ১১ থেকে ১৩ শতাংশ বেজ শুল্ক কার্যকর ছিল। নতুন করে ১৯ শতাংশ শুল্ক যোগ হওয়ায় দেশটির মোট শুল্কহার বর্তমানে ৩০ থেকে ৩২ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এই অবস্থান পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে প্রায় একই পর্যায়ের। আর বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে দেশটি।

শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে আগে হতেই ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ বেজ শুল্ক ছিল। নতুন করে ২০ শতাংশ শুল্ক যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে শ্রীলঙ্কার মোট বা ইফেক্টিভ শুল্ক দাঁড়িয়েছে ৩৬ থেকে ৩৭ শতাংশে। ফলে শ্রীলঙ্কাও বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মতো একই শুল্কচাপে রয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার তৈরি পোশাক রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রে আগে হতে ১১ থেকে ১৩ শতাংশ বেজ শুল্ক কার্যকর ছিল। নতুন নীতির ফলে এর সঙ্গে ১৯ শতাংশ শুল্ক যুক্ত হয়েছে। এতে দেশটির মোট শুল্কহার বর্তমানে ৩০ থেকে ৩২ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করছে।

তথ্য বিশ্লেষণে সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক কাঠামোতে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কা সবচেয়ে বেশি শুল্কচাপে রয়েছে। এসব দেশের মোট শুল্কহার ৩৬ শতাংশের ওপরে। অন্যদিকে ভারত তুলনামূলকভাবে কম শুল্ক সুবিধা পাচ্ছে। আর চীন উচ্চ শুল্ক সত্ত্বেও বাজারে বড় সরবরাহকারী হিসেবে থাকলেও দামের চাপের মুখে পড়ছে। এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল শুল্কের প্রভাব যে পড়তে শুরু করেছে সেটার উদাহরণ দেন। তিনি সংবাদকে বলেন, ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি সময়কালে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই রপ্তানি ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার। মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির ৪৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ গেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে। এই বাজার থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ১১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এখানেও রপ্তানি কমেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি কমেছে ৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ।’

তিনি আরও জানান, অপ্রচলিত বাজারগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে। এসব বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা মোট রপ্তানির ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। এই বাজারগুলোতে রপ্তানি আয় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি সময়কালে ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ কমেছে।

তবে ইতিবাচক দিক হলো, বাংলাদেশ সরকার শুল্ক কমানোর বিষয়ে আশাবাদী। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছিলাম যে আরও কত কমানো যায়। আশা করছি, ৯ তারিখে (সোমবার) যে চুক্তি হবে, তাতে তা (শুল্কহার) কমবে। তবে কতটুকু কমবে, তা এই মুহূর্তে আমি বলতে চাচ্ছি না বা পারছি না। আমরা আলোচনার ভিত্তিতে তা দেখব।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চুক্তিতে স্বাক্ষর থাকবে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) জেমিয়েসন গ্রিয়ারের। ঢাকায় এ চুক্তির এক পাশে বাণিজ্য উপদেষ্টা সই করেছেন। তার সই করা কপিটি বাংলাদেশের দলটি ওয়াশিংটনে নিয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল ১০০টি দেশের ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। শুরুতে বাংলাদেশের জন্য হারটি ছিল ৩৭ শতাংশ। পরে শুল্ক আরোপ তিন মাসের জন্য পিছিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ঠিক তিন মাসের মাথায় ২০২৫ সালের ৭ জুলাই বাংলাদেশের ওপর আরোপিত শুল্ক ৩৭ থেকে ৩৫ শতাংশে নামানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প। আরও দর-কষাকষির পর গত বছরের ২ আগস্ট এ হার ২০ শতাংশে নেমে আসে। এ হার কার্যকর হয় গত বছরের ৭ আগস্ট। আগে থেকেই বাংলাদেশি পণ্যে শুল্ক ছিল ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ। সবমিলিয়ে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে শুল্ক দাঁড়ায় ৩৭ শতাংশে।

‘অর্থ-বাণিজ্য’ : আরও খবর

সম্প্রতি