image

চট্টগ্রাম বন্দর সচল, একদিনে ৫ হাজার কনটেইনার উঠানামা

চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রাম বন্দরে টানা শ্রমিক ধর্মঘট চলার পর সোমবার, (০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) থেকে সচল হলে একদিনে প্রায় ৫ হাজার কনটেইনার বন্দরে উঠানামা করেছে বলে বন্দর সূত্রে জানায়। জানা গেছে, এনসিটি (নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল) পরিচালনা বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বিএনপিপন্থি শ্রমিক সংগঠনের ডাকা ধর্মঘটে চট্টগ্রাম বন্দর টানা ৭ দিন কার্যত অচল ছিল। এতে দেশের অর্থনীতিতে দৈনিক প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। টানা আন্দোলনে দেশের অর্থনীতির ৬০-৭০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করে। টানা আন্দোলনে প্রায় ৪০-৪৫ হাজার কনটেইনার বন্দরে আটকে যায় পাশাপাশি কনটেইনার খালাস না হয় জাহাজ জট সৃষ্টি হয়। গত ৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আন্দোলনকারীরা ধর্মঘট ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করে।

আন্দোলনরত শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, উপদেষ্ঠা বিগ্রেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন ও বিডার চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী বর্তমান সরকারের আমলে এনসিটি চুক্তি না করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। এতে আন্দোলনকারীরা সাময়িকভাবে সন্তুষ্ট। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের পণ্য খালাসের স্বার্থে কর্মসূচি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

তবে গ্রেপ্তারকৃত শ্রমিক ও বদলি, বরখাস্তসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার না হলে আগামি ১৬ ফেব্রুয়ারি নতুন কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন শ্রমিক নেতারা। তারা বলেন, আন্দোলনকারীরা বন্দর ‘হাইজ্যাক’ করেছে এমন অভিযোগ। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া বানচাল করার চেষ্টা, যা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, কর্মকর্তারা কাজে ফেরার আশ্বাস দিয়েছেন।

এদিকে ১৫ জন শ্রমিক নেতাকে আন্দোলনের মূল উসকানিদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তাদের মধ্যে কয়েকজনকে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলির আদেশ দেয়া হয়েছিল এ থেকেই সংঘাত তীব্র হয়েছে বলে ইঙ্গিত।

দেশের ৯৯% কনটেইনার বাণিজ্য চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। রপ্তানি ব্যাহত হলে পোশাকসহ প্রধান খাত অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে।

রমজানে কৃত্রিম সংকট ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কা, সঙ্গে প্রতিদিন বড় অঙ্কের ডেমারেজ চার্জ। বন্দর অচলের নেপথ্যে ১৫ জন জড়িত থাকার অভিযোগে এবং সাধারণ শ্রমিকদের উস্কে দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর অচল করার নেপথ্যে মোট ১৫ শ্রমিক নেতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যারা চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রমিক দলের, কেউ বন্দর শ্রমিক দলের সঙ্গে যুক্ত। তালিকায় রয়েছেনÑ মোংলা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগের অডিট সহকারী মো. হুমায়ুন কবীর এবং পায়রা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া নৌ বিভাগের ইঞ্জিন ড্রাইভার মো. ইব্রাহিম খোকন। দুজনই চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক।

এছাড়া রয়েছেন পায়রা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া প্রকৌশল বিভাগের এসএস খালাসি মো. ফরিদুর রহমান, পরিবহন বিভাগের উচ্চ বহিঃসহকারী মো. শফি উদ্দিন ও রাশেদুল ইসলাম, পরিকল্পনা বিভাগের স্টেনোটাইপিস্ট মো. জহিরুল ইসলাম, বিদ্যুৎ বিভাগের এসএস পেইন্টার মো. হুমায়ুন কবীর, যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার মো. লিয়াকত আলী ও খালাসি মো. রাব্বানী। মোংলা বন্দরে বদলির আদেশ পাওয়া পরিবহন বিভাগের এফসিএল শাখার উচ্চ বহিঃসহকারী আব্দুল্লাহ আল মামুন, প্রশাসন বিভাগের উচ্চমান সহকারী মো. শাকিল রায়হান, যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার মানিক মিঝি, প্রকৌশল বিভাগের মেসন মো. শামশু মিয়া এবং যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার আমিনুর রসুল বুলবুল।

এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরকে জিম্মি করে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে নাপসা চেয়ারম্যান আলমগীর নূর, তিনি জানান, বাংলাদেশ নাগরিক অধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন (নাপসা)-এর চেয়ারম্যান, সাংবাদিক ও সংগঠক আলমগীর নূর এক বিবৃতিতে চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে চলমান গভীর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এই বন্দরকে রক্ষায় সরকার ও দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

আলমগীর নূর বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর কেবল একটি স্থাপনা নয়, এটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতির মেরুদ-। অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, গত এক বছর ধরে একটি চিহ্নিত কুচক্রী মহল সুপরিকল্পিতভাবে বন্দরে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। কথিত আন্দোলনের নামে তারা মূলত রাষ্ট্র ও দেশের সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে চায়।

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যবস্থাপনা স্বচ্ছ করার লক্ষ্যে যে সব সময়োপযোগী ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী তার বিরোধিতা করছে। সংস্কারবিরোধী এই সাজানো আন্দোলন মূলত দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার একটি গভীর নীল-নকশা। আমরা স্পষ্ট বলতে চাই, কোনো কুচক্রী ও গুপ্ত মহলের কথিত আন্দোলনের কাছে দেশের অর্থনীতির এই প্রাণকেন্দ্রকে জিম্মি হতে দেয়া যাবে না। বন্দর এবং দেশের অর্থনীতি নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নিলে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা দেন।

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশিদের ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আন্দোলনকারী মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করা ১৫ কর্মচারীর নামে চট্টগ্রাম বন্দরের বাসা বরাদ্দ বাতিল করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

গতকাল রোববার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক স্বাক্ষরিত এক পত্রের মাধ্যমে বাসা বরাদ্দের আদেশ বাতিল করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক। বন্দর সচল হওয়ার প্রথম দিনে সোমবার প্রায় ৫ হাজার কনটেইনার উঠানামা করেছে বলে জানান, বন্দর পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক।

‘অর্থ-বাণিজ্য’ : আরও খবর

সম্প্রতি