image

নতুন সরকারকে প্রথম দিন থেকেই সংস্কার শুরু করতে হবে: পিআরআই

অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক

নির্বাচিত নতুন সরকারকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, শুল্কহার কমানো, মূল্যস্ফীতি হ্রাস এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে জোরালো সংস্কার অব্যাহত রাখার তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা। তারা নতুন সরকারকে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই বর্তমান সরকারের বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব থেকে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে অর্থনৈতিক সংস্থার শুরু করার পরামর্শ দেন। নয়তো জনতা নতুন সরকারকেও টেনে নামাতে পারে বলে সতর্ক করেন তারা।

গতকাল সোমবার ঢাকার গুলশানের একটি হোটেলে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত ‘নির্বাচিত সরকারের জন্য অর্থনৈতিক সংস্কারের এজেন্ডা’ শীর্ষক সেমিনারে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ-তাগিদ দেন। পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তারের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ।

দেশের অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ১৯৯১ সালের মতো একটি অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করে পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার বলেন, ‘সংস্কার করা গেলে আমাদের প্রবৃদ্ধি ৭-৮ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হবে। তাই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংস্কার অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ, এনবিআর নানাভাবে অর্থনৈতিক উন্নতির প্রতিবন্ধক হয়ে উঠছে।’ দ্রুত ইউরোপের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (এফটিএ) করতে হবে। তবে শুল্কহার না কমালে ২৬ দেশের সঙ্গে আলোচনা হলেও একটি দেশের সঙ্গেও অর্থনৈতিক চুক্তি সম্ভব হবে না বলে সতর্ক করেন তিনি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সরকারের সব ক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাব অনুভব করেছি। এখানে সবাই সংস্কার করতে চান না। তারা আগের অবস্থা বজায় রাখতে চান। তবে আমরা সংস্কারের যে কাজটা শুরু করেছি, সেটা অব্যাহত রাখতে হবে। নয়তো জনগণ আবার বিগত সরকারের মতো নতুন সরকারকেও টেনে নামাতে পারে।’ টেলিভিশনে জনপ্রিয় টক শো করে নীতি গ্রহণ করা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সংস্কার একটি অজনপ্রিয় পদক্ষেপ উল্লেখ করে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘দীর্ঘ সময় সংস্কার করা হয়নি বলে হঠাৎ সব খাতের দুর্বলতাগুলো সামনে এসে পড়ে।’

কর্মসংস্থানের দাবি থেকে জুলাই আন্দোলন হয়েছিল। তাই আবার কর্মসংস্থান ছাড়া প্রবৃদ্ধি হলে কিছুই অর্জিত হবে না। বরং বৈষম্য বাড়বে। তাই কর্মসংস্থান বাড়াতে শ্রমবাজারের সংস্কার করতে হবে।

সংস্কার সুপারিশ বাস্তবায়নের ব্যবস্থাপনা নেই জানিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক কে এ এস মুর্শিদ বলেন, ‘সংস্কারের জন্য শত শত সুপারিশ এসেছে। কিন্তু কীভাবে এসব বাস্তবায়িত হবে? প্রাতিষ্ঠানিক অনেক গ্যাপ রয়েছে। আর অইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক থেকে বাধ্য করা না হলে আমরা নিজেরা কোনো সংস্কার করি না। সংস্কার করতে গেলেও বাধা আসে। এমনকি ট্রাফিক লাইট লাগাতে গেলেও। বন্দরের দিকে তাকিয়ে দেখুন।’

মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, ‘শিল্পকারখানায় আমরা সঠিক কর্মী পাচ্ছি না। আবার অনেকে কর্মহীন এবং প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব রয়েছে। তাই আমাদের পাঠ্যক্রম পরিবর্তন করতে হবে। দক্ষতা না থাকায় ভারত ও শ্রীলঙ্কার প্রবাসীরা আমাদের থেকে বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন।’

সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও সুদৃঢ় করার পরামর্শ দিয়ে আরেক বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি ৬-৭ শতাংশ নামাতে না পারলে সামগ্রিক চাহিদা বাড়বে না। আবার নতুন সরকার এলে আমদানি বাড়বে। তখন বিনিময় হারের ওপর চাপ পড়তে পারে। তাই রিজার্ভ বাড়াতে হবে।’

সেমিনারে মূল প্রবন্ধে পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেন, ‘ভবিষ্যতে অলিগার্ক শ্রেণি তৈরি না করতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। আর সংস্কারের ফল দেরিতে আসে। তাই নির্বাচিত সরকার প্রথম দুই বছরের মধ্যে সংস্কার করতে না পারলে সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। তাই দায়িত্ব গ্রহণের দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় দিন নয়, বরং প্রথম দিন থেকেই সংস্কারের কাজ শুরু করতে হবে।’ সেমিনারে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী এবং অর্থনীতিবিদেরা তাদের মতামত তুলে ধরেন।

‘অর্থ-বাণিজ্য’ : আরও খবর

সম্প্রতি