image

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তিতে দুটি বড় অর্জন এসেছে, দাবি সরকারের

রেজাউল করিম

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তিতে বাংলাদেশ দুটি বড় অর্জন পেয়েছে বলে দাবি করেছে সরকার। একটি হলো, নতুন শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামানো। আরেকটি, যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামালে তৈরি পণ্য রপ্তানিতে বাড়তি শুল্ক এক টাকাও দিতে হবে না। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রকৃতপক্ষে কী কী বিষয়ে চুক্তি হয়েছে সেটা না জেনে বলা যাচ্ছে না সেটা ভালো নাকি খারাপ। তবে কিছু সুবিধা বাংলাদেশ পাচ্ছে সেটা ইতোমধ্যেই সরকার বলেছে।’

নতুন শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামানো হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামালে

তৈরি পণ্য বাড়তি শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে

নতুন শুল্ক ও বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ। বিবৃতিতে দুই দেশ বলেছে, এই চুক্তির মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর ও কাঠামোগত রূপ দেয়া হবে এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগে বিদ্যমান বাধাগুলো ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হবে। এতে উভয় দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজারে প্রবেশ সহজ হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সহযোগিতা শক্তিশালী হবে।

যৌথ বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, নতুন এ চুক্তি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফোরাম অ্যাগ্রিমেন্টের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। দুই দেশ মনে করছে, বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষায় একটি স্পষ্ট বাণিজ্য কাঠামো এখন সময়ের দাবি। এই চুক্তির ফলে সেই পথ আরও সহজ হলো।

বিবৃতিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের জন্য বাজারে প্রবেশ আরও সহজ করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। এর আওতায় শিল্পপণ্য, কৃষিপণ্য, প্রযুক্তিপণ্য ও জ্বালানি খাতে আমেরিকান পণ্যের ওপর শুল্ক ও অশুল্ক বাধা ধাপে ধাপে কমানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, এতে দেশের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত মানের পণ্য সহজে পাওয়া যাবে।

মঙ্গলবার,(১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানান, বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য, জ্বালানি পণ্য এবং ঐতিহ্যবাহী মেটাল স্ক্র্যাপ আমদানির বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮৫-৮৬ শতাংশ পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শূন্য শুল্কে প্রবেশের সুযোগ পাবে। বাকি ১৪-১৫ শতাংশ রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে ১৯ শতাংশ শুল্ক প্রযোজ্য হবে।

বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘চুক্তিতে একটি শর্ত সংযুক্ত রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রয়োজনে উপযুক্ত নোটিশ দিয়ে বাংলাদেশ এই চুক্তি থেকে বের হয়ে আসতে পারবে। ফলে ভবিষ্যতে কোনো সরকার যদি মনে করে এই চুক্তি দেশের স্বার্থের অনুকূল নয়, তাহলে তারা সে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।’

বিশ্লেষকদের মতে, শুল্ক কমার সুফল পুরোপুরি পেতে হলে বাংলাদেশকে কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বন্দর ও লজিস্টিক ব্যবস্থার দুর্বলতা, উৎপাদন সময়ের দীর্ঘতা এবং মান নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত জটিলতা থাকলে শুল্ক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত অর্ডার পাওয়া কঠিন হতে পারে। পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কাঁচামাল ব্যবহারের শর্ত উৎপাদন ব্যয় বাড়াতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।

চুক্তির বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সংবাদকে বলেন, ‘চুক্তিতে কী কী শর্ত আছে, তা আমরা জানি না। আমি মনে করি, এই ধরনের চুক্তি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে করা মোটেই উচিত হয়নি। আমরা কিছু নতুন সুবিধা পেয়েছি, সেটিকে আমরা অর্জন হিসেবে মনে করতে পারি। কিন্তু তার বদলে কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে বা বাংলাদেশকে কী কী করতে হবে, তা আমরা জানি না। ফলে এই চুক্তিতে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হলো, তা এককথায় বলা মুশকিল।’

এই চুক্তির দায় পরবর্তী সরকারের ওপর পড়বে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই চুক্তির দায় এসে পড়বে পরবর্তী সরকারের ওপর। সেই সরকার চুক্তি শর্তগুলো পূরণে কতটুকু প্রস্তুত এবং তাদের এসব বিষয়ে বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে কিনা, তা-ও বড় প্রশ্ন। তাই সবকিছু না জেনে বিয়ষটা ভালো নাকি খারাপ তা বলা যাচ্ছে না।’

বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশ হলো ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও চীন। ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও তুলনামূলক কম শুল্ক সুবিধা ভোগ করছে। ভারতও কিছু পণ্যে কম শুল্ক সুবিধা পাচ্ছে এবং উৎপাদন বৈচিত্র্যে এগিয়ে রয়েছে। এই বাস্তবতায় নতুন চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ আংশিকভাবে প্রতিযোগিতার ব্যবধান কমাতে পারলেও পুরোপুরি এগিয়ে যেতে হলে উৎপাদন দক্ষতা ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে, বাংলাদেশের পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কম শুল্ক কিংবা শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়া হবে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে এবং মার্কিন বাজারে ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দাম সহনীয় থাকবে।

যৌথ বিবৃতিতে অশুল্ক বাধা কমানোর বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। দুই দেশই বাণিজ্যে মান, নিরাপত্তা ও নিয়মকানুনসংক্রান্ত জটিলতা সহজ করার বিষয়ে একমত হয়েছে। এর অংশ হিসেবে খাদ্য ও ওষুধের মান, যানবাহন নিরাপত্তা এবং শিল্পপণ্যের মানসংক্রান্ত পারস্পরিক স্বীকৃতি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হবে, যাতে পণ্য আমদানি ও রপ্তানি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা যায়।

বিবৃতিতে মেধাস্বত্ব সুরক্ষার বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী মেধাস্বত্ব আইন প্রয়োগ আরও শক্তিশালী করা হবে এবং নকল বা অবৈধ পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এটি বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে সহায়ক হবে এবং নতুন প্রযুক্তি ও ব্র্যান্ডের বাজার সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে।

এছাড়া যৌথ বিবৃতিতে শক্তি ও কৃষি খাতে বড় আকারের বাণিজ্যিক সহযোগিতার কথাও বলা হয়েছে। বাংলাদেশ আগামী কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি ও কৃষিপণ্য আমদানি বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে যা দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হবে। একই সঙ্গে সরবরাহ চেইনকে আরও স্থিতিশীল ও নিরাপদ করতে পারস্পরিক সহযোগিতার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

বাণিজ্য নিরাপত্তা ও অনিয়ম প্রতিরোধের বিষয়েও দুই দেশ একমত হয়েছে। শুল্ক ফাঁকি, অবৈধ রপ্তানি বা অন্যায্য বাণিজ্য আচরণ ঠেকাতে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে বৈধ ব্যবসা সুরক্ষিত হবে এবং আস্থা বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।

‘অর্থ-বাণিজ্য’ : আরও খবর

সম্প্রতি